জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক:
বিশেষ দুর্নীতি কিংবা বড় কোনো দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে উচ্চ পর্যায়ের স্ট্রাইকিং ফোর্স গঠন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অথচ যে উদ্দেশ্যে দুদক স্ট্রাইকিং ফোর্স গঠন করেছে তার বাস্তবিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিশেষজ্ঞমহলে। দুদক বরং ছোট দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ‘চুনোপুঁটি’ নিয়েই ব্যস্ত। দুর্নীতিবাজ রাঘববোয়াল বা প্রভাবশালী ব্যক্তিকে খুঁজে আইনের আওতায় আনায় ভাটা পড়েছে। বর্তমান সময়ে বড় বড় দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান, মামলা, গ্রেপ্তার, অভিযোগপত্র নেই বললেই চলে। অবহেলা, উদাসীনতা ও সরকারের মুখাপেক্ষী হওয়ার কারণে দুদক কার্যক্রমে এখন চলছে ভাটার টান। দুদকের সাম্প্রতিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এ রকম হতাশাজনক তথ্যই মিলেছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্বাধীন ও শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যর্থতা, সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করা, অভিযোগে প্রভাবশালীর নাম থাকলেও মুখ দেখে ছেড়ে দেওয়া, দুর্নীতি করেও বড় বড় আমলাকে ছাড়, প্রশাসন ক্যাডারকে অলিখিত দায়মুক্তিসহ নানা অভিযোগ আছে বর্তমান কমিশনের বিরুদ্ধে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), দুর্নীতিবিরোধী বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময় দুদকের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তোলেন।
বর্তমান কমিশনের সময় বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে অভিযোগপত্রভুক্ত করা হলেও তার নামে করা মামলা আগের কমিশনের আমলের। এর আগের কমিশনগুলো হলমার্ক, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির মতো বড় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে। অভিযোগের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনেছে। একাধিক সূত্র জানায়, বর্তমান কমিশন এসব ক্ষেত্রে বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। কাকে ধরবে, কাকে ছাড়তে হবে- এসব বিষয় নিয়ে সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকছে কমিশন।
দুদকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত আদালতে ৩,০০৪টি মামলা চলমান রয়েছে। তবে কমিশন ও ব্যুরো মিলে মোট মামলা চলছে ৪,১০৪টি এর মধ্যে স্থগিতাদেশ রয়েছে ৪৩২টি, স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হয়েছে মাত্র ১৩টি। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, তিন মাসে মামলা হয়েছে ৯০টি, এসব মামলায় ২১২ জন আসামি রয়েছেন। সরকারি চাকুরে রয়েছেন ১২৯ জন, বেসরকারি ২৭ জন, ব্যবসায়ী ৫ জন, রাজনীতিবিদ একজন, জন প্রতিনিধি একজন এবং অন্যান্য পেশার রয়েছেন ৪৬ জন। মামলাগুলোর মধ্যে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনে ৪৯টি, অর্থ আত্মসাতে ২২টি, মানিলন্ডারিংয়ে ৯টি, ঘুষ লেনদেনে ৪টি, জালজালিয়াতির সাতটি মামলা হয়েছে।
বর্তমান কমিশনের আমলে ২০২৩-এর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২ হাজার ৯২৭। একই সময়ে আদালত স্থগিত করেছেন ৪২৬ মামলা। ১৯৫ মামলায় সাজা হয়েছে। আসামিরা খালাস পেয়েছেন ১১৮ মামলায়। এ হিসাবে সাজার হার ৫৭.১৮ শতাংশে। আগের কমিশনের আমলে সাজার হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। অথচ বর্তমান কমিশনের আমলে তা নিম্নগামী। সাজার হার বাড়ার পেছনে দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণসহ বস্তুনিষ্ঠ অভিযোগপত্র এবং দুদকের আইনজীবীর দক্ষতা ও ভূমিকা মুখ্য বিষয়। বর্তমান কমিশনের আমলে এসব ক্ষেত্রে অবহেলা ও ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে এমপি প্রার্থীর কারো কারো হলফনামায় ১০০ থেকে ২০০ শতাংশ সম্পদ বেড়েছে। অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হয়েছেন অনেকে। এসব খবর গণমাধ্যমেও এসেছে। দুদক চেয়ারম্যান হলফনামার ওই সব বিতর্কিত, অস্বাভাবিক তথ্য অনুসন্ধান করা হবে বলে সাংবাদিকদের জানালেও আজও কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সূত্র জানায়, কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের সময়ে ছয় এমপির নির্বাচনী হলফনামার অস্বাভাবিক সম্পদ অনুসন্ধান করে তিনজনের নামে মামলা হয়। একই সঙ্গে তিনজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ব্যাপারটি নিয়ে তখন সমালোচনাও হয়েছিল। এরমধ্যে সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান, সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান ও কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। একই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক, আসলামুল হক ও এনা গ্রুপের কর্ণধার এনামুল হককে। ওই তিনজনকে ছেড়ে দেওয়ায় দুদকের কার্যক্রম নিয়ে নেতিবাচক সমালোচনাও হয়েছে।
দুদক সূত্র জানায়, দুর্নীতি ঠেকাতে ও রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে উচ্চপর্যায়ের স্ট্রাইকিং ফোর্স গঠন করা হলেও গুরুত্বপূর্ণ কোনো অবদান রাখতে পারছে না। এই ফোর্স কমিশনের রুটিন বা দৈনন্দিন কার্যক্রমের বাইরে থাকবেন। তারা শুধু বিশেষ বা বড় ধরনের দুর্নীতির অনুসন্ধানের তথ্য সংগ্রহের কাজ করবেন বলেও দুদক থেকে জানানো হয়েছিল। এ ছাড়া তাদের নজরদারি থাকবে জনগুরুত্বপূর্ণ, বহুল আলোচিত এবং স্পর্শকাতর দুর্নীতির ঘটনা। সরকারি দপ্তরে এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অনৈতিক লেনদেনের ঘটনা হাতেনাতে ধরতে ছদ্মবেশে কাজ করবেন স্ট্রাইকিং ফোর্সের সদস্যরা। যেটি এবারের স্ট্রাইকিং ফোর্সের ধরন এক-এগারোর সময় গঠন করা টাস্কফোর্সের মতো। এছাড়া রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ধরতে কয়েকটি বিশেষ দল।
দুদক সূত্র জানায়, গোলাম রহমান ও ইকবাল মাহমুদের আমলে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি প্রতিরোধে ওই সব দল গঠনের পাশাপাশি গ্রেপ্তার অভিযানে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়। ওই সময় দুর্নীতিবাজদের বড় ঝাকুনি দিতে সক্ষম হয় সংস্থাটি। গ্রেপ্তার আতঙ্কে অনেকটাই দিশাহারা ছিল দুর্নীতিবাজরা। ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন তাদের পাঁচ বছরের মেয়াদকালে গ্রেপ্তার করেছে সাড়ে সাত শতাধিক অভিযুক্তকে। ১০০টির বেশি ফাঁদ পরিচালনা করে ঘুষের টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে শতাধিক ব্যক্তিকে। ক্যাসিনোবিরোধী শুদ্ধি অভিযানও পরিচালিত হয় ওই মেয়াদে।
২০২১ সালে মোহাম্মদ মঈনউদ্দিন আব্দুল্লার নেতৃত্বাধীন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর ইকবাল মাহমুদ কমিশনের আমলে নেওয়া গ্রেপ্তার অভিযানের গতি একেবারেই থেমে যায়। কমিশন অনেকটা গুছিয়ে উঠলেও সক্রিয় হতে পারেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি ধরতে ও ঠেকাতে কমিশন নীতিগতভাবে একমত। তারই ধারাবাহিকতায় রাঘববোয়ালদের ধরতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিশনের সভায় সিদ্ধান্ত হয়, দুর্নীতিবাজদের তাৎক্ষণিক আইনের আওতায় আনার জন্য কমিশনে সার্বক্ষণিক স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত রাখা দরকার। কমিশনের বিশেষ তদন্ত বিভাগের অধীন দক্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ টিম এ লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ করবে। ওই টিমের কর্মকর্তাদের সাধারণ অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজে নিয়োজিত রাখা হবে না।
বর্তমান কমিশন যে স্ট্রাইকিং ফোর্স গঠন করেছে, তাতে নেওয়া হয়েছে দুদকের চৌকস কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতদের। ফোর্সের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সংস্থার গোয়েন্দা শাখার পরিচালক আব্দুল্লা আল জাহিদ। মানি লন্ডারিং শাখার পরিচালক গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরীকে দেওয়া হয়েছে স্ট্রাইকিং ফোর্সের সমন্বয়কের দায়িত্ব। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন উপপরিচালক ফারুক আহমেদ (বিমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান) উপপরিচালক সেলিনা আখতার মনি (বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-৩), উপপরিচালক নাজমুল হোসাইন (মানি লন্ডারিং), উপপরিচালক মো. তানজির হাসিব সরকার, সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নেয়ামূল আহসান গাজী (বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত শাখা-২) এবং সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নূর আলম সিদ্দিকী (মানি লন্ডারিং)। দুদক জানিয়েছে, প্রয়োজনে স্ট্রাইকিং ফোর্স আরো কর্মকর্তাকে নিজেদের দলে যুক্ত করতে পারবে।
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ এবং এনবিআর কর্মকর্তা ড. মতিউর রহমানকে নিয়ে দুদক কিছুটা সরব হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সংসদে থাকা এমপিদের নিয়ে কোনো অগ্রগতি নেই।
হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হতেই চাঞ্চল্য দেখা দেয় দেশজুড়ে। কারো মতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে এমন অভিযান, আবার কেউ বলছেন আইএমএফের চাপে। তবে নির্বাচনি ইশতেহার তথা নিজের নীতি অনুযায়ীই সরকারের এই প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।
তথ্য বলছে, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ সরকার। এ নিয়ে বরাবরের মতোই হার্ডলাইনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার নির্দেশে দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করছে দুদক-এনবিআরসহ বিভিন্ন সংস্থা। ফলে নিস্তার পাচ্ছেন না সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠজনরাও। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানের অংশ হিসেবেই ২০১৯ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘বালিশকাণ্ড’ বেরিয়ে আসে। এছাড়া অর্থপাচারের দায়ে সাজা পেয়েছেন যুবলীগ নেতা জিকে শামীম। অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে জেল খেটেছেন যুবলীগের আরেক নেতা সম্রাটও। দুর্নীতির মামলায় পিকে হালদারও ২২ বছরের দণ্ডে দণ্ডিত। এসব ঘটনা আলোচনায় এলেও বিভিন্ন ইস্যুর কারণে মানুষ তেমন আমলে নেননি। এর পরও সাবেক আইজিপি-সেনাপ্রধান, প্রধানমন্ত্রীর দুই এপিএসসহ দায়িত্বরত সরকারি বড় বড় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসতেই দেশব্যাপী হইচই পড়ে যায়। তাদের ঘিরে নানা ধরনের কথাবার্তাও উঠতে থাকে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
কিন্তু সংস্থাটির অনুসন্ধান ও তদন্ত পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালে অনুসন্ধানের জন্য আমলে নেওয়া ৫২ ভাগ অভিযোগই নথিভুক্তি বা পরিসমাপ্তির (অভিযোগ অব্যাহতি) মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। অর্থাৎ অনুসন্ধান শুরু করেও ৫৮১টি অভিযোগ থেকে সংশ্লিষ্টদের অব্যাহতি বা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ২৩ সালে ৯৩টি মামলার আসামিদের এফআরটি (মামলা থেকে অব্যাহতি) দেওয়ার মাধ্যমে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। শতাংশ হিসাবে যা ২৮ ভাগ। দায়মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের একটি বড় অংশই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। যদিও ওই আসামিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায়নি। তবে, অন্য একটি সূত্র বলছে, গত এক বছরে নথিভুক্তি ও এফআরটি মিলিয়ে ১৫০ জনের বেশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতির দায় থেকে অব্যাহতি বা মুক্তি পেয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিসমাপ্তি ও এফআরটি নিয়ে হরহামেশাই নানা বিতর্ক উত্থাপিত হয়। অনেকের ধারণা, আর্থিক লেনদেন কিংবা ক্ষমতা দেখিয়ে অবৈধ উপায়ে দুর্নীতির দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। যে কারণে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদককে অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। মাঝে মাঝে উচ্চ আদালত থেকে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করে ব্যাখ্যা চাওয়ারও নজির রয়েছে। অনুসন্ধানের পরিসমাপ্তি হয় আর মামলার হয় এফআরটি। আমাদের মামলার ৬০-৭০ শতাংশ চার্জশিট দাখিলের মাধ্যমে বিচার হয়। বাকি ৩০ শতাংশ নিয়ে বিতর্ক। এটা যে অর্থের বা অন্য কারণে হয়ে থাকে, তা সঠিক নয়।
দুদক থেকে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২২ সালে চার হাজার ৬৩৩টি অনুসন্ধান চলমান। এর মধ্যে কমিশনের অনুমতি নিয়ে এক হাজার ১১৯টি অনুসন্ধান নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬টি মামলা দায়ের হয়েছে। যেখানে ১৭২টি মামলা সম্পদ বিষয়ক। ৫৮১টি অনুসন্ধান পরিসমাপ্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বাকি ১৬৩টি অনুসন্ধান বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে দুদক।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দিন আব্দুল্লাহ বলেন, আমরা কোনো অভিযোগ যখন অনুসন্ধানের জন্য নেই, অভিযোগে এমন অনেক তথ্য-উপাত্ত থাকে যে, তা দেখে মনে হয় তিনি বড় অপরাধী। এমনও দেখা গেছে, অভিযোগে ১০টি বাড়ির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ বাড়ির অস্তিত্ব নেই। এ ধরনের মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে যখন অনুসন্ধান শুরু হয়, সেটা তো পরিসমাপ্তি হবেই। সেক্ষেত্রে বিষয়টি অন্য কোনোভাবে সংজ্ঞায়িত করা যাবে না।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রশাসনের বর্তমান ও সাবেক একাধিক কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধানের মধ্যে আমলা ও রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেছেন। তার মতে, দুর্নীতি শুধু আমলারাই করেন, আর রাজনীতিবিদরা করেন না, এটা বলা ঠিক না। তাই কারো ওপর অভিযোগ তোলার আগে আয়নায় নিজের চেহারা দেখার পরামর্শ দেন সেতুমন্ত্রী। তিনি বলেন, করাপশন ইজ অ্যা ওয়ে অব লাইফ অ্যাক্রস দ্য ওয়ার্ল্ড। এটা বাংলাদেশে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। এখানে দুর্নীতি নেই, এমন দাবি তো আমরা করছি না। আর দুর্নীতি সরকারি কর্মকর্তারা করে, রাজনীতিবিদরা করে না; এটা তো বলা ঠিক নয়। কারণ, আমরা যখন কথা বলি, আমি সবার কথাই বলছি। দুদককে প্রধানমন্ত্রী একেবারে জিরো টলারেন্সের নীতিতে অটল থাকতে বলেছেন। দুদক স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতি যেই করুক সরকারের জিরো টলারেন্স, প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স, দুর্নীতির তদন্ত করার অধিকার দুদকের আছে। এ স্বাধীনতায় সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করেনি এবং করবও না। কেউ দুর্নীতি করে ছাড় পাবে না।
মামলা থেকে অব্যাহতি ও হাইকোর্টের তলব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, আদালত যদি মনে করেন কাউকে অব্যাহতি দেওয়া ঠিক হয়নি তখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে তলব করে জানতে চান। তদন্ত কর্মকর্তা তার আইনজীবীর মাধ্যমে যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে পারলে ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করেন আদালত। যদি তদন্ত কর্মকর্তার ব্যাখ্যায় আদালত সন্তুষ্ট না হন তাহলে অব্যাহতিপ্রাপ্ত আসামিকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত এবং তদন্ত কর্মকর্তাকে সতর্ক করতে পারেন আদালত। একজন তদন্ত কর্মকর্তার একক কোনো ক্ষমতা নেই। তিনি চাইলেই কাউকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন না। দুদকের একটি শক্তিশালী কমিশন রয়েছে। যথাযথ যাচাই-বাছাই করেই কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। কারও একক ইচ্ছায় কাউকে অব্যাহতি দেওয়া সম্ভব নয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যারা আসলে উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত; বিশেষ করে যারা রাজনৈতিকভাবে ও প্রশাসনিকভাবে ক্ষমতাবান ব্যক্তি, যাদের রুই-কাতলা বলা হয়। তাদের ক্ষেত্রে দুদককে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। তারা মূলত যারা চুনোপুঁটি তাদের নিয়ে টানা-হেঁচড়া করছে। দুদক এখন রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, প্রভাবিত হয়। যারা প্রভাবশালী তাদের ধরতে সাহস দেখায় না। দুদক কী ক্রমাগতভাবে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। মূলত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটা যতখানি না কমিশনের হাতে, তার থেকে বেশি প্রশাসনের হাতে। দেশের দুর্নীতি দমনে দুদককে সমস্ত প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে কাজ করতে হবে।





