ধর্ম

অনিন্দ্যসুন্দর মসজিদের দেশ বাংলাদেশ

  • প্রকাশিত ৭ মার্চ, ২০২১

মো. কায়ছার আলী

 

 

 

‘আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। আল্লাহরাব্বুল আলামীনের বড়ত্ব-একত্ব ঘোষণা করে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহর রাসুল সাক্ষ্য দিয়ে, কল্যাণময় নামাজের দিকে আহ্বানের মাধ্যমে আবারো বড়ত্বের সাথে একত্ববাদের স্বীকৃতি দিয়ে যাদের সুরেলা কণ্ঠ, লালিত্যময়, জলদগম্ভীর অনিন্দ্য দ্যোতনায় মুসুল্লিদের অন্তরের অন্তস্থলকে জান্নাতির মহিমায় অন্তরঙ্গ স্পর্শে দোলায়িত করে সর্বদা আবিষ্ট করে রাখেন তারা হলেন মুয়াজ্জিন। নিয়মানুবর্তিতা, সময়ানুবর্তিতা, কর্তব্যনিষ্ঠার সাথে ঝড়-ঝঞ্ঝা, শীতগ্রীষ্ম আরো নানা দুর্যোগ অসুবিধা অতিক্রম করে দিনে রাতে ৫ বার ছুটিবিহীন তারা মসজিদ থেকে আজান দিয়ে থাকেন। আমাদের প্রায় সবার হাতে ঘড়ি থাকার পরেও পবিত্র রমজান মাসে ইফতারের সময় আমরা আজানের প্রতীক্ষায় থাকি। প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীদের নিজ নিজ উপসনালায় আছে। মুসলমানদের মসজিদ, হিন্দুদের মন্দির, খ্রিস্টানদের গির্জা, বৌদ্ধদের প্যাগোডা, শিখদের গুরুদুয়ারা এবং ইহুদিদের সিনাগগ ইত্যাদি। ধরণীর উত্তম জায়গা মসজিদ। মুসলমানদের দলবদ্ধভাবে শ্রদ্ধা আর বিনয়ের সাথে মাথা নত করা, সিজদা বা নামাজ কায়েম করার নির্মিত স্থাপনা তথা ধর্মীয় কার্যাবলির প্রাণকেন্দ্র। সিজদার মাধ্যমে মুসলমানরা আল্লাহতায়ালার সবচেয়ে বেশি নৈকট্য লাভ করে। সিজদা না করার জন্য বা আল্লাহপাকের আদেশ না মানার কারণে অহংকারী ইবলিশ আজ অভিশপ্ত। তবে মুসলমানদের জন্য মসজিদ ব্যতীত অন্যস্থানে নামাজ কায়েমের অনুমতি আছে। একাকী নামাজ পড়ার চেয়ে মসজিদে জামাতের সাথে নামাজ আদায়ের মর্যাদা অনেক বেশি। মুসলমানদের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক মসজিদ একসময়ে সমাজ পরিচালনায়ও ব্যবহূত হতো। মক্কার মসজিদুল হারাম, মদিনার মসজিদে নববী ও জেরুজালেমের মসজিদুল আকসার পর ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ ও মর্যাদাসম্পন্ন মসজিদ হলো মসজিদে কুবা। কুবা একটি প্রাচীন কূপের নাম। কুবা বা মসজিদে কিবলাতাইন (দুই সিজদার মসজিদ) সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত।

কিবলা হলো নামাজ আদায়ের দিক নির্দেশনা। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের দ্বিতীয় বছরে শাবান বা রজব মাসের জোহর বা আসরের নামাজ পড়ার সময় কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ বা ওহি আসে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের নিয়ে নামাজ পড়া অবস্থায় জেরুজালেম থেকে মক্কা বা কাবার দিকে ফিরে যায়। অতীতে এই মসজিদে দুটো মিহরাব ছিল। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনে আল্লাহরাব্বুল আলামীন কিবলা পরিবর্তন করে দেন।

পূর্বের মসজিদগুলো ছিল  অতি সাদাসিধে। সময়ের আবর্তনে হাজার বছরে মসজিদগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিত্যনতুন কৃষ্টি ও স্থাপত্যশৈলীর ধারক ও বাহক। মুসলিম ঐতিহ্য, স্থাপত্যকৌশল, বিজয়স্মারক এবং শিক্ষা ও প্রশাসনিক বহুবিধ উজ্জ্বলতায় মসজিদের অনন্য অসাধারণ ভূমিকা রয়েছে। অত্যন্ত গৌরব এবং সম্মানের সাথে লিখছি আমাদের ঢাকাকে সারা দুনিয়ার মানুষ চিনে মসজিদের নগরী নামে। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে ঢাকাসহ সারা দেশে অসংখ্য ইসলামিক নিদর্শন, স্থাপনা এবং জীবন্ত কিংবদন্তী বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন এর নান্দনিক মসজিদ  রয়েছে। সময়ের ধারায় সেগুলো আজ প্রত্নতত্ত্ব সম্পদে সমৃদ্ধ। আজকের আধুনিক যুগে বা ভবিষ্যতে মসজিদগুলোর নান্দনিকতার ধারা আরো অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহপাকের ঘর মসজিদ নির্মাণের সাওয়াব অত্যন্ত বেশি। বর্তমান সরকার সারা দেশে প্রতিটি জেলা উপজেলায়  ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ করছে। জেলা ও উপজেলায় ৪০ শতাংশ জায়গার ওপর  ৪ তলা ও ৩ তলা, যাতে ১২০০ ও ৯০০ মুসুল্লি একসাথে নামাজ আদায় করতে পারে। এছাড়া ইমাম-মুয়াজ্জিন, পর্যটকদের আবাস, নারী-পুরুষের আলাদা অজুর ব্যবস্থা, ইসলামিক পাঠাগার, গবেষণা, হেফজ বিভাগ, অতিথিশালা, মৃতদেহ গোসলের ব্যবস্থা, ইমাম, হজ্বযাত্রীদের প্রশিক্ষণ, ইসলামি সংস্কৃতি জ্ঞানচর্চা, গাড়ি পার্কিংসহ নানাবিধ সুবিধা বিদ্যমান আছে। মসজিদগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বেড়ে যাচ্ছে।

আমরা হয়তো ৫০ বা ১০০ বছর পর যারা এখন বেঁচে আছি তারা আর কেউ বেঁচে থাকব না কিন্তু আপন মহিমায় চিরভাস্বর হয়ে অমলিনতার সাথে মসজিদগুলো দাঁড়িয়ে থাকবে ততদিন পর্যন্ত। যতদিন পূর্ব আকাশে সূর্য উদিত হয়ে পশ্চিম আকাশে অস্ত যাবে, লোনা জলরাশিতে সিক্ত থাকবে সাগর মহাসাগর, নীল আকাশের বিস্তীর্ণ জমিনে জ্বলজ্বল করতে থাকবে লক্ষ কোটি তারা, থাকবে মৌসুমি হাওয়ায় ধবল কৃষ্ণ মেঘের আনাগোনা, ঝরো ঝরো বৃষ্টিতে নদীতে নাচবে জলতরঙ্গ এবং হজরত ইস্রাফিল (আ.) শিংগায় ফুঁক দেওয়া দিবস তথা কিয়ামত পর্যন্ত।

 

লেখক : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট। সদস্য, দিনাজপুর কলামিস্ট অ্যাসোসিয়েশন

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads