অপরাধীদের অভয়ারণ্য

কাঁটাতারের বেড়াবিহীন সীমান্ত

ছবি: বাংলাদেশের খবর

জাতীয়

কাঁটাতারের বেড়াবিহীন সীমান্ত

অপরাধীদের অভয়ারণ্য

  • এসকে সাহেদ, লালমনিরহাট
  • প্রকাশিত ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

শীতের ঘন কুয়াশায় লালমনিরহাটের কাঁটাতারের বেড়াবিহীন জেলার অরক্ষিত সীমান্তপথ এবং সীমান্ত এলাকাগুলো হয়ে উঠেছে মাদক, গরু পারাপার ও চোরাচালানিদের অভয়ারণ্য। সীমান্তেঁঘষা নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় দু’দেশের মানুষ অবাধে করছে যাতায়াত। এতে অন্যান্য সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে সীমান্ত অপরাধপ্রবণতা।

সীমান্তবর্তী এ জেলার ২৮৪ কিলোমিটার সীমান্তপথের ৫৪ কিলোমিটার অংশে কাঁটাতারের বেড়া নেই। সীমান্ত অপরাধ ঠেকাতে মোট সীমান্তে বিজিবির তিনটি ব্যাটালিয়ন তথা ১৫, ৫১ ও ৬১ ব্যাটালিয়ন কাজ করছে। এরপরও ঠেকানো যাচ্ছে না চোরাচালান। ফলে চলতি মাসেই সীমান্তের দুটি পয়েন্টে তিনজন বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছেন। বছরজুড়ে কাঁটাতারের বেড়াবিহীন সীমান্ত পথে সীমান্তরক্ষীদের নজরদারীকে ফাঁকি দিয়ে চোরাকারবারি হলেও শীতের মৌসুমে তা বেড়ে গেছে বহুগুণে। সীমান্তে লাইটের পর্যাপ্ত থাকলেও ঘন কুয়াশায় তা মিশে যায়। কাছাকাছি কেউ থাকলেও সহজে বোঝা যায় না। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়েছেন চোরাকারবারির সিন্ডিকেট। অনুসন্ধানে জানা যায়, সীমান্তের অন্তত ৩০টিরও বেশি পয়েন্ট দিয়ে প্রতি রাতে গরু পারাপার করে শতাধিক চোরাকারবারি সিন্ডিকেট। আর গরুর সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে দেশে আসে মাদকের বড় বড় চালান। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতার মদদে বিজিবির কতিপয় অসাধু সদস্যদের ম্যানেজ করে এক শ্রেণির ব্যক্তির মাধ্যমে চোরাকারবারিরা সংগঠিত হয়েছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের খামারভাতী গ্রামের ফজলু মেম্বারের ছেলে ফয়জার আলী, মৃত ছকমালের ছেলে মশিয়ার রহমান, আজিজার রহমানের ছেলে ইব্রাহিম, বিএসএফ-এর গুলিতে নিহত জয়নালের ছেলে আনারুল, চন্দ্রপুর এলাকার আবদুল মজিদ কাকড়ার ছেলে লায়লা, মৃত মহসিন আলীর ছেলে মফিজুল ইসলাম, মৃত তছলিম উদ্দিনের ছেলে আলো মেম্বার, মৃত অভয়ের ছেলে বাদশা মিয়ার নেতৃত্বে প্রতিরাতে গরু ও মাদক পারাপার হচ্ছে পার্শ্ববর্তী সীমান্তপথ দিয়ে। এসব গরু স্থানীয় চাপারহাট বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। গরুর করিডোর না হওয়ায় সরকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর মাদকের ভয়াবহতাও বাড়ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ কাজের জন্য থানা পুলিশ সিন্ডিকেটের কাছ থেকে মাসোহারা নিয়ে থাকেন এবং বিজিবির স্থানীয় বিওপি ক্যাম্প গরুর জোড়া প্রতি ৮শ টাকা ও ডিবি পুলিশ দুইশ টাকা নেয়। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, রাতে এসব গরু পারাপারের ফলে সীমান্ত এলাকার ফলসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু চোরাকারবারিরা এতটাই প্রভাবশালী যে তাদের ভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মুখ খুলতে চান না।

কালীগঞ্জ থানার ওসি আরজু সাজ্জাদ হোসেন বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছেন। আর ডিবি পুলিশের অফিসার ইনচার্জ মকবুল হোসেন বলেন, গোয়ান্দা পুলিশের কোনো সদস্য ওই এলাকায় যান না। তবে এমন অভিযোগ পেলে তারা অভিযান পরিচালনা করবেন বলে দাবি তাদের।

লোহাকুঁঁচি এলাকার বাসিন্দা আলী আকবর বলেন, সীমান্তপাড়ের মানুষের কৃষি কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজের ব্যবস্থা নেই। তাছাড়া বিএসএফের আতঙ্কে অনেক সময় কৃষি কাজও ভালোভাবে করতে পারেন না। এছাড়া কর্মের তেমন কোনো সুযোগ না থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা চোরাকারবারির সঙ্গে যুক্ত হন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুলালী সীমান্তের এক শিক্ষিত যুবক বলেন, উচ্চশিক্ষা অর্জন করে দীর্ঘ সময় চাকরির বাজার ঘুরে চাকরি না পেয়ে এখন তিনি চোরাকারবারির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তবে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হলে আলোর পথে ফিরবেন বলে দাবি তার।

এদিকে বেশ কয়েকটি সীমান্ত ঘুরে দেখা যায়, দিনের বেলায় কৃষিকাজের নাম করে ভারতীয়রা যেমন বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন তেমন বাংলাদেশিরাও ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছেন। এসব লোকের অনেকের রয়েছে দু’দেশের জাতীয় পরিচয়পত্র। প্রকাশ্যে গাঁজা, ফেন্সিডিলসহ বিভিন্ন প্রকার মাদকদ্রব্য অবাধে পারাপার করছে। আবার কেউ কেউ গরুর ঘাস সংগ্রহের নামে ঘাসের বস্তার ভিতরে এসব নেশাজাতীয় দ্রব্য পারাপার করছে। আর রাতে তো কাঁটাতারের বেড়ার ওপর দিয়ে বাঁশের চরকি দিয়ে গরু পারাপারের ঘটনা অনেক পুরোনো। তবে কোথাও আবার কাঁটাতারের নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ করাও রয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীরা দুই দেশের জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত হয়ে এসব চোরাই পথ দিয়ে ভারতে গিয়ে অবস্থান করছেন।

সীমান্ত অপরাধ নিয়ে কাজ করেন এমন কয়েকটি সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সীমান্ত অপরাধ কমাতে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত, জনসচেতনতা সৃষ্টি ও অরক্ষিত সীমান্ত এলাকাগুলোতে বিজিবির নজরদারি বাড়ানোর সুপারিশ তাদের।

এ ব্যাপারে বিজিবির রংপুর রিজিওনের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু জাহিদ সিদ্দিকী বলেন, সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিজিবির কঠোর নজরদারি ও জোর তৎপরতা রয়েছে। তবে সব চাইতে জরুরি জনসচেতনতা বৃদ্ধি করে সমন্বিতভাবে কাজ করা। এজন্য তিনি জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ ও স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিদের এগিয়ে আসারও আহ্বান জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads