অফারের ফাঁদে গ্রাহকরা

প্রতীকী ছবি

তথ্যপ্রযুক্তি

অফারের ফাঁদে গ্রাহকরা

  • মোহসিন কবির
  • প্রকাশিত ২৫ জুন, ২০২১

দেশে ই-কমার্স ব্যবসার জন্য এখনো সরকারিভাবে কোনো আইনি কাঠামো তৈরি হয়নি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এই ব্যবসা। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) তথ্য অনুযায়ী, তাদের অধীনে ১ হাজার ৬শ অনলাইনভিত্তিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর বাইরে আরো ২ শতাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে জানিয়েছে ই-ক্যাব সংশ্লিষ্টরা। তবে ফেসবুকভিত্তিক আরো কয়েক হাজার উদ্যোক্তা অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনা করছেন, যাদের জন্য কোনো আইনি কাঠামো নেই। এ কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনেক অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও তাদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। 

অভিযোগ উঠেছে, বেশ কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান চটকদার অফারের ফাঁদে ফেলে গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নিলেও সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দেয় না। অনেক ক্ষেত্রে পণ্য ডেলিভারির জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। এছাড়া এক পণ্য দেখিয়ে অন্য পণ্য সরবরাহ, নকল পণ্য দেওয়া বা মান ভালো না হওয়া, প্রলোভন দেখিয়ে হয়রানি ও প্রতারিত করছে। বিষয়টি স্বীকার করে ই-ক্যাবের প্রেসিডেন্ট শমী কায়সার বলেন, ‘বড় কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আছে তার মধ্যে অনলাইনে যেই ধরনের পণ্য দেখাচ্ছে ভোক্তা ঠিক সেই পণ্যটি পাচ্ছে না। ভিন্ন পণ্য দেওয়া হচ্ছে বা আকার-আকৃতি ঠিক থাকছে না, এমন অনেক অভিযোগ আমাদের কাছে আসছে।’

ই-ক্যাবের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০২০ সালে করোনাকালীন লেনদেন হয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বিপুল আর্থিক লেনদেনের ক্রমবর্ধমান এই ব্যবসা পরিচালনার জন্য এখনো সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি না হওয়াকে এসব অনিয়মের জন্য দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ই-ক্যাবের ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম শোভন জানান, শুধু এমএলএম এবং রিক্রুটিং এজেন্সি বাদে অনলাইনে যে-কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকেই তারা সদস্যপদ দিয়ে থাকেন। তাদের প্ল্যাটফরমে যুক্ত হতে হলে একজন উদ্যোক্তাকে সাধারণ কয়েকটি শর্ত পূরণ করলে হয়। সেগুলো ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন সনদ এবং অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনা করা। এর বাইরে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব নিয়মেই চলছে।

তিনি বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘ই-কমার্স ব্যবসা পরিচালনার জন্য আলাদা কোনো আইনি কাঠামো নেই। আমরা সরকারকে ২০১৬ সাল থেকে আইনের জন্য বলে আসছি। সরকার আইনের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে চলতি মাসে একটি খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।’

তিনি জানান, সরকার নীতিমালার জন্য তাদের কাছ থেকে যেসব পরামর্শ চেয়েছে তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার ও ডাক বিভাগসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের কাছ থেকে আইনের বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে। জাহাঙ্গীর আলম শোভন বলেন, ‘অনলাইন ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য কিছু বিধিমালা রয়েছে। কিন্তু বিধিমালা প্রতিপালন করা না হলে কি হবে সে ধরনের কিছু নেই। এখন যে খসড়া নীতিমালা হচ্ছে তা সেটা আইনে পরিণত হবে। কিন্তু তা কবে নাগাদ হবে সে বিষয়ে আমরা কিছু জানি না।’   

সম্প্রতি দেশে সাড়া জাগানো অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ই-ভ্যালিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার ধরন এবং ক্রেতাদের কৌশলে ঠকানো নিয়ে দেশে তোলপাড় চলছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর এক গবেষণাতে দেখা গেছে, সত্তর ভাগ অনলাইন কেনাকাটাতেই টাকা পরিশোধ হয় ক্যাশ অন ডেলিভারি বা পণ্য ক্রেতার হাতে পৌঁছানোর পরে। কিন্তু ই-ভ্যালি, আলেশা মার্ট, ধামাকা, ই-অরেঞ্জ, সিরাজগঞ্জ শপ ও আলাদিনের প্রদীপসহ অনেক প্রতিষ্ঠান আকর্ষণীয় সব অফারের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে নিলেও সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দেওয়া নিয়ে গড়িমসি করে। অনেক সময় একটি পণ্যের ডেলিভারির জন্য একজন গ্রাহককে তিন থেকে চার মাস অপেক্ষার পাশাপাশি নানা জটিলতায় পড়তে হয়।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৪ মার্চ, ২০২১ পর্যন্ত পণ্যমূল্য বাবদ গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম ২১৩.৯৪ কোটি টাকা নিয়ে পণ্য সরবরাহ করেনি ইভ্যালি। অন্যদিকে ইভ্যালি যেসব কোম্পানির কাছ থেকে পণ্য কেনে, ওইসব মার্চেন্টের কাছে কোম্পানিটির বকেয়া ১৮৯.৮৫ কোটি টাকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গ্রাহক ও মার্চেন্টদের কাছে ইভ্যালির দেনার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০৩.৮০ কোটি টাকা। অথচ প্রতিষ্ঠানটির চলতি সম্পদের পরিমাণ মাত্র ৬৫.১৭ কোটি টাকা। কোম্পানিটির দায় পরিশোধের কোনো সক্ষমতা নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থাৎ ইভ্যালির সকল চলতি সম্পদ দিয়ে গ্রাহক ও মার্চেন্টদের বকেয়া অর্থের মাত্র ১৬.১৪% পরিশোধ করা সম্ভব হবে এবং আরো ৩৩৮.৬২ কোটি টাকার সমপরিমাণ দায় অপরিশোধিত থেকে যাবে। ইভ্যালির চলতি সম্পদের স্থিতি দিয়ে শুধু গ্রাহক দায়ের এক-তৃতীয়াংশেরও কম পরিশোধ করা সম্ভব হবে।

‘ইভ্যালির চলতি দায় ও লোকসান দুটিই ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এবং কোম্পানিটি চলতি দায় ও লোকসানের দুষ্টচক্রে বাঁধা পড়েছে’ উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ‘ক্রমাগতভাবে সৃষ্ট দায় নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব টিকে না থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।’

এ অবস্থায় বিপুলসংখ্যক গ্রাহক, যারা ইভ্যালির কাছ থেকে অগ্রিম পেমেন্টের মাধ্যমে অফারের পণ্য কিনেছেন তাদের মধ্যে পণ্য কিংবা অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যদিও ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ রাসেল জানিয়েছেন, তারা কোনো ধরনের ঝুঁকির মধ্যে নেই। তিনি বলেন, লোকসানে পণ্য বিক্রি করায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার এই গ্যাপ তৈরি হয়েছে। আমরা এই লোকসান কমাতে প্রায়োরিটি স্টোরস সেলস শুরু করেছি, যেখান থেকে প্রফিট হচ্ছে। গত মাসে ১০ কোটি টাকা সেল করেছি, যেখানে আমরা ভালো প্রফিট পেয়েছি। ধীরে ধীরে ডিসকাউন্ট কমানো হবে, এতে লস কমবে। তিনি জানান, ‘আমাদের প্রোজেকশন হলো, এভাবে ধীরে ধীরে লোকসান কমতে কমতে ২০২২ সাল গিয়ে আমাদের আর কোনো লস হবে না এবং প্রফিট দিয়ে এতদিনকার লস আমরা ২০২৪ সালের মধ্যে জিরোতে নিয়ে আসব।’

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশের ব্যাংকগুলো নড়েচড়ে বসেছে। তারা ইভ্যালিসহ ১০টি অনলাইন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের নিজস্ব কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন স্থগিত করেছে। নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-ইভ্যালি, আলেশা মার্ট, আদিয়ান মার্ট, ধামাকা, ই-অরেঞ্জ, সিরাজগঞ্জ শপ, আলাদিনের প্রদীপ, কিউকম, নিডস এবং বুম বুম।

দেশে অনলাইন তথা ই-কমার্স বাণিজ্যের যাত্রা খুব বেশিদিনের না। এমনকি উন্নত বিশ্বেও ই-কমার্স ব্যবসার যাত্রাটাও ২৫-৩০ বছরের বেশি না। বাংলাদেশে অনলাইনভিত্তিক এই ব্যবসার যাত্রাটা মূলত শুরু ২০১১ সালে সেলবাজার ডটকম (বর্তমান নাম এখনিডটকম) এবং আজকের ডিলডটকম-এর হাত ধরে। কিন্তু তখনো অনলাইন ব্যবসার তেমন প্রসার কিংবা জনপ্রিয়তা লাভ করেনি দেশে। তবে ২০১৪ সাল ছিল ই-কমার্সের জন্য ইতিহাসের বছর। এই বছরের শেষের দিকে জন্ম নেয় ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads