ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তুষার। করোনা দুর্যোগে অনলাইন ক্লাস শুরু হলে বিপাকে পড়ে যান তিনি। গ্রামে থাকায় ঠিকমতো নেটওয়ার্ক সংযুক্ত এবং স্বল্পমূল্যে ইন্টারনেট না পাওয়ায় অনলাইন ক্লাসে নিয়মিত হতে পারেননি।
তুষার বলেন, ‘এটা আমাকে প্রচণ্ড মানসিক চাপে ফেলে দিয়েছে। নিয়মিত ক্লাস করতে না পারায় অন্যান্য শিক্ষার্থীদের থেকে পিছিয়ে পরেছি। সরাসরি ক্লাস শুরু হলেও সেই ক্লাসগুলো আর পাব কি না তা নিয়েও দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছি।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শামীম মাহমুদ বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের দিনগুলোতে বেশিরভাগ সময়ই কাটত মোবাইল ব্যবহারে। লকডাউনের দিনগুলোতে বাসায় বসে থাকায় ফেসবুকে চ্যাট করে বা গেমস খেলে সময় কাটাতাম। নিজেকে অনেকটা অবসাদগ্রস্ত মনে হচ্ছে।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌমিতা শিমু বলেন, ‘গ্রামে এসে পড়াশোনায় মন বসত না। একটা পর্যায়ে মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ি। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকতাম, ঘুম হতো না। প্রায় সময়ই মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকত। রাগের মাথায় দুবার অঘটনও ঘটিয়ে ফেলতে চেয়েছি।’
তুষার, শামীম বা মৌমিতা শুধু নন, মহামারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের এই সময়ে আরো অনেক শিক্ষার্থীই বিভিন্ন মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন।
জরিপের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
করোনাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের অবস্থান, গ্রামে এবং শহরে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থার তারতম্য, লাইকার্ট স্কেলে আনলাইন পড়াশোনা নিয়ে সন্তুষ্টি, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ, ক্লাস এবং পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে মনোভাব, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ডিজিটাল স্ক্রিন আসক্তি, নারী পুরুষ হিসেবে করোনা পেন্ডামিকে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতির পরিমাণ বিশ্লেষণ ইত্যাদি লক্ষ্য রেখে জরিপটি পরিচালনা করেন আঁচল ফাউন্ডেশন। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যা সৃষ্টির বিভিন্ন কারণ অনুসন্ধান ও কারণগুলোর প্রভাব পর্যালোচনা করা জরিপটির মূল উদ্দেশ্য ছিল বলে জানান আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা তানসেন রোজ।
জরিপের পেছনের কারণ
ফাউন্ডেশনটি ২০২০ সালের ৮ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ৮ মার্চ পর্যন্ত এক বছরের আরেকটি জরিপে আত্মহত্যার সংখ্যা প্রকাশ করেছেন। মহামারীর এই সময়ে ১৪,৪৩৬ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে জরিপ থেকে জানা যায়। পরে ৩২২টি কেসস্টাডি করে দেখেন, আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে ৪৯% তরুণ-তরুণী। যাদের বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছর।
প্রায় দেড় বছর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন পরীক্ষায় বসার ঘোষণা আসে। তাই স্বাভাবিক সকল কার্যক্রমে পদার্পনের আগে মহামারীর প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপর কতটুক পরেছে সেটির বিশ্লেষণ তুলে ধরার জন্যই এবারের জরিপ করেছেন বলে জানান তানসেন রোজ।
ফাউন্ডেশনটি এবারের সার্ভেতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের টার্গেট পপুলেশন রেখে বিশেষ কিছু পয়েন্ট সামনে তুলে আনার চেষ্টা করেছে বলে জানান আঁচল ফাউন্ডেশনের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস ইউনিটের কো-লিডার রিফাত হাসান তরফদার। শিক্ষার্থীদের বর্তমান অবস্থা, পরিচর্যার সঠিক উপায় এবং শিক্ষাব্যবস্থায় কী কী পরিবর্তন আনা যায় সেসব বিষয়ে সরকার এবং কর্তাব্যক্তিদের একটি সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক উন্নয়নের দিক বিবেচনা করে এবারের সার্ভেটি করেছেন বলেও তিনি জানান।
জরিপের ফলাফল
তরুণদের মাধ্যমে পরিচালিত সামাজিক সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের ‘করোনায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মানসিক বিপর্যয় : একটি প্রায়োগিক জরিপ’ শীর্ষক এক জরিপ বলছে, করোনার সময়ে ৮৪.৬ শতাংশ শিক্ষার্থী মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। এ জরিপে দুই হাজার ৫৫২ জন অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর মধ্যে এক হাজার ৫৫২ জন নারী শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন। গ্রামে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ৪০.২ শতাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ২৮.৭ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৩১.১ শতাংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও মেডিকেল কলেজের। এ ছাড়া জরিপে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের ৮৪.৬ শতাংশ জানিয়েছেন, করোনার সময় তারা বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যায় পড়েছেন। জরিপে অংশ নেওয়া নারী শিক্ষার্থীদের ৮৭.৪৪ এবং ছেলে শিক্ষার্থীদের ৮০.৩৮ শতাংশ মানসিক সমস্যার শিকার হওয়ার কথা বলেছেন। শিক্ষার্থীদের বয়স ছিল ১৮ থেকে ২৮ বছর।
গ্রামে অবনতির কারণ
জরিপে দেখা যায়, মহামারিতে গ্রামে অবস্থান করা ৮৬.২ শতাংশ শিক্ষার্থী মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন, যা শহরে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের হারের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, একাকিত্ব, সেশনজট, সঠিক সময়ে না ঘুমানো, ডিজিটাল স্ক্রিন আসক্তি, আর্থিক অসচ্ছলতা, হীনম্মন্যতা, পারিবারিক কলহ, ক্লাস করার পর্যাপ্ত ডিভাইস না থাকা, পরিবার থেকে বিয়ের চাপ ইত্যাদিসহ নানাবিধ মানসিক সমস্যার কারণের কথা শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন বলে জানান রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস ইউনিটের কো-লিডার রিফাত হাসান তরফদার।
উত্তরণে শিক্ষার্থীদের করণীয়
মহামারির সময়ে মানসিকভাবে যে পরিবর্তনগুলো লক্ষ করা যায়, তার মধ্যে-অস্থিরতা, ভয়, নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব, পরিবার ও সহপাঠীদের থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা, উদ্বেগ, বিষণ্নতাসহ নানা রকমের মানসিক জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে জানান মনের বন্ধুর সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলর ইকবাল হোসেন আরমান।
মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শিক্ষার্থীদের করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, কোনো বিষয়ে চিন্তিত হলে তা নিয়ে কথা বলা, নিয়মিত রুটিন মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তোলা, ছোট ছোট লক্ষ্য স্থির করা, কৃতজ্ঞতা অনুশীলন ও জার্নালিং করা, পর্যাপ্ত ঘুমানো, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া ও শরীর চর্চা করা, সোশ্যাল সাইট ও ডিভাইস ব্যবহারে সচেতন হওয়াসহ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
‘মনের সুরক্ষা’ অ্যাপস ও জাতীয় হটলাইন সেবা চালু করা জরুরি
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক জটিলতা শেয়ার করার মনোভাব সৃষ্টি করা, শিক্ষার্থীদের গঠনমূলক কাজে উৎসাহ প্রদান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইন্টারনেটের অযাচিত ব্যবহারে নিরুৎসাহ প্রদান, দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন ট্রেনিং, কর্মশালার আয়োজন করা, সরকারি হাসপাতালগুলোতে মেন্টাল ক্রাইসিস সেন্টার তৈরি করা, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (জেলা, উপজেলা বা থানাভিত্তিক) কাউন্সেলর নিয়োগ দেওয়া, মানসিক সেবা গ্রহণ সহজলভ্য করা, সুস্থ বিনোদন, শহরাঞ্চলে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নিশ্চিত করা ইত্যাদি উপায়ের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করা যেতে পারে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমাধানে আঁচল ফাউন্ডেশনের কয়েকটি প্রস্তাবনা রয়েছে। যেমন, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া, সরকার কর্তৃক ‘মনের সুরক্ষা’ নামে একটি অ্যাপস চালু করা, একটি জাতীয় হটলাইন সেবা চালু করা, ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে যুগপৎভাবে বিভিন্ন ক্যাম্পেইন করাসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কর্মশালার আয়োজন করা।
রিফাত হাসান তরফদার
কো-লিডার (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস ইউনিট), আঁচল ফাউন্ডেশন
মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মশালা ও প্রতিষ্ঠানে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে
শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে ভালো থাকার অনেকাংশে নির্ভর করে পরিবারের ওপর। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বাবা-মায়ের সম্পর্ক, অন্যান্য সদস্যের আচরণ, সামাজিক সম্পর্ক একজন শিক্ষার্থীর মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের অনুভূতিগুলো বোঝা, ভুল হলে বার বার দোষারোপ না করা, সন্তান কী কী বিষয়ে ভালো করছে তা নিয়ে বলা, মাঝে মাঝে পুরস্কৃত করা, সন্তানের যে-কোনো অনিশ্চয়তায় পাশে থাকার অভয়, ভালো অভ্যাসগুলো পরিবারের সকলে মিলে চর্চা করা, অহেতুক সন্দেহ না করা, পারিবারিক কোনো জটিলতায় ফ্যামিলি কাউন্সেলিং করার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে সহজে এ থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুস্থ প্রতিযোগিতার চর্চা, পাঠদানে সমতা সৃষ্টিতে পদক্ষেপ, বুদ্ধিগত দক্ষতায় সহায়তা নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক দক্ষতাজনিত ও বুদ্ধিজনিত জটিলতাগুলো স্থবির করে দিতে সেই বিষয়ে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা, মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ নিশ্চিত করাসহ সর্বোপরি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারলে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে।
ইকবাল হোসেন আরমান
সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলর, মনের বন্ধু





