মুক্তমত

অবৈধভাবে বালু উত্তোলন পরিবেশগত সংঘাত সৃষ্টি করছে

  • প্রকাশিত ২২ মার্চ, ২০২১

একবিংশ শতাব্দীতে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বিঘ্নিত করছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতে, ‘প্রাকৃতিক সম্পদের মজুত একটি বিশেষ পর্যায়ে একইসাথে ভীতিকর এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক যা উৎপাদন বাড়াতে এবং ব্যয় প্রশমনে সাহায্য করে।’ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পরিবেশ বিপর্যয়, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অসম ক্ষমতা হিংসাত্মক সংঘাতে রূপ নেয়, যা পরিবেশগত সংঘাতের সাথে সম্পর্কিত। ভূমিদস্যুতা, বৃহৎ খনি খনন, অনবায়নযোগ্য জ্বালানি, পারমাণবিক আতঙ্ক, রাসায়নিক সারের জনপ্রিয়তা, জলবায়ু পরিবর্তন পরিবেশগত সংঘাতের অন্যতম উদাহরণ। পরিবেশগত সংঘাত সৃষ্টির শুরু থেকেই প্রাকৃতিক সম্পদের অধিগমন ও বিতরণ মানুষে মানুষে ও দেশগুলোর মধ্যে বিবাদের অন্যতম ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করে আসছে।

প্রাকৃতিক সম্পদবিজড়িত সকল বিবাদকেই পরিবেশগত সংঘাত বলা হয়। পরিবেশগত সংঘাত এমন একটি সংঘাত, যার সৃষ্টি হয় সম্পদের ঘাটতি এবং মনুষ্য সৃষ্ট সম্পদের অসম বণ্টনের ফলে। পরিবেশগত ঘাটতি বাস্তুসংস্থানের প্রশমিত হওয়ার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে, যা পরিবেশ দূষণ (লিবিসিউস্কি, ১৯৯৭)। উভয়ই মানুষ এবং পরিবেশ ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পরিবেশগত বিবাদ স্পষ্টতই, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, জাতিগত, ধর্মীয় কিংবা রাষ্ট্রীয় সংঘাত অথবা প্রাকৃতিক সম্পদঘটিত কিংবা জাতীয় স্বার্থবিজড়িত সংঘাত (ম্যানগ্লারিস, ২০১২)। সাধারণত দুটি কারণে পরিবেশগত সংঘাতের সৃষ্টি হয় : এক. সম্পদের ঘাটতি এবং দুই. সম্পদের প্রতি লোভ।

পরিবেশগত সংঘাত এমন একটি সামাজিক সংঘাত (হিংসাত্মক এবং অহিংসাত্মক) যা একইসাথে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের প্রতিযোগিতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহারের সাথে সম্পর্কযুক্ত। অবৈধ বালু ব্যবসাও এর সাথে সম্পৃক্ত অর্থাৎ বাংলাদেশের নগরায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রাচীনকাল থেকেই বালুর ব্যবহার প্রচলিত। পানির পরে বালুই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নির্মাণসামগ্রী হিসেবে ব্যবহূত হয়। মরুভূমিতে অনেক বালু থাকলেও তা নির্মাণসামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। তাই নদীর তলদেশের বালু উচ্চমানের নির্মাণসামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৫০ বিলিয়ন টন বালুর চাহিদা থাকে যার বাজারমূল্য প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার। শুধু ভারতেই ১৫০ বিলিয়ন রুপির বালুর বাজার রয়েছে। বালুর অপর্যাপ্ততা এবং লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় পৃথিবীতে বিপজ্জনক এক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, যা সংঘবদ্ধ অপরাধে রূপ নিচ্ছে। বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে শুধু ভারতেই ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১৯৩ জন খুন হয়েছেন (হিন্দুস্থান টাইমস)। যাকে সাংবাদিক ভিন্স বেইসার ‘স্যান্ড মাফিয়া’ বলে উল্লেখ করেছেন। বালু সন্ত্রাস এবং অবৈধ বালুমহাল বাংলাদেশের জন্যও এক নতুন সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

সাতশ নদীবিধৌত বাংলাদেশের প্রায় ২৪ হাজার ১৪০ কিলোমিটার নদী রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র, তুরাগ, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, করতোয়া, তিস্তা, ফেনী নদসহ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি নদীতেই সংঘবদ্ধ চক্র বালুমহাল নীতিমালার তোয়াক্কা না করেই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনৈতিক ক্ষমতাশালী, এমনকি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের যোগসাজেশে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। বালুমহাল ইজারা দেওয়ায়ও মানা হচ্ছে না কোনো নীতিমালা। নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, সুনামগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, কুষ্টিয়া এখন বালু উত্তোলনের প্রধান স্পট হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশে অবৈধ বালুমহাল টেন্ডার সন্ত্রাসকে হার মানিয়েছে। ২০২১ সালেই অবৈধ বালু উত্তোলনের জন্য প্রায় ২৫ জনকে জরিমানা করা হয়েছে, ৫০ জনের মতো লোকজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে অনেকগুলো ড্রেজার মেশিন ধ্বংস করা হয়েছে। বালু উত্তোলন প্রায়ই দাঙ্গা-হাঙ্গামায় রূপ নিচ্ছে। যার কারণে অনেক সময় প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটছে। ২০১৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মেঘনা চর দখল ও বালুমহালকে কেন্দ্র করেই ৯ জন নিহত ও প্রায় ৪০০ জনের মতো আহত হয়েছেন। সম্প্রতি ফেনী নদে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে প্রায় ১০০ পরিবার বাস্তুহারা হয়েছে। এছাড়া বেপরোয়া বালুর ট্রাকের চাপায় রাজশাহীতে প্রায় ৩৯ জন নিহত হয়েছেন। নদীতে অবাধে বালু উত্তোলনের কারণে নদী হারাচ্ছে তার গতিপথ এবং নদীভাঙনের দরুন হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।

অবৈধ বালু উত্তোলন একইসাথে পরিবেশগত, সামাজিক এবং বাস্তুসংস্থানগত সমস্যার সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশে অবাধে বালু উত্তোলন নদীর তলদেশ ও নদীর পাড়ের কার্যক্ষমতাকে কমিয়ে দিচ্ছে এবং নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহকে কমিয়ে দিচ্ছে। যখন নদীতে অবৈধ এবং ধারণ ক্ষমতার বেশি বালু উত্তোলন করা হয় তখন নদীর প্রবাহ কমতে থাকে, ফলে প্লাবনভূমি আরো নিচে নামতে শুরু করে; যার কারণে বন্যার সম্ভাবনা তৈরি হয়। একটি গবেষণায় দেখা যায়, খননের কারণে এশিয়ার নদীগুলোতে প্রায় ৯০ শতাংশ পলিমাটি কমেছে। নদীর প্যাটার্ন পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদকুল এবং জীবকুল বিপন্নপ্রায়। নদীভাঙনের দরুন অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে বালু উত্তোলন নিয়ে নৈরাজ্য পরিবেশগত সংঘাতের সাথে সম্পর্কিত। তাই অবৈধ বালু উত্তোলন একটি পরিবেশগত সংঘাত।

জাতিসংঘের মতে, এই অবৈধ বালু উত্তোলন পরিবেশ এবং জনজীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ। অতিরিক্ত মাত্রায় বালু উত্তোলন নদীর জলপ্রবাহ কমিয়ে নদীর ক্ষয় বাড়িয়ে তুলছে, যার কারণে নদীর পাড় ভাঙা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের কারণে বিভিন্ন নদীর আশপাশের অবকাঠামো, বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট, সেতু, ফসলি জমিকে হুমকির সম্মুখীন করে তুলছে। এর কারণে নদীপাড়ের লোকজনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং তারা ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের দিকে ঝুঁকছে। এমনকি উপকূলীয় অঞ্চলের পানির লবণাক্ততা বাড়িয়ে তুলছে। বালু উত্তোলনের কারণে নদীর চ্যানেলের পলিমাটির স্তর কমে তলদেশের গাছপালার সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে, যা নদীর তলদেশের বাস্তুতন্ত্রে সমস্যার সৃষ্টি করছে। বালু উত্তোলনের কারণে নদীভাঙন ও বন্যার ফলে অনেক লোকজন বসতভিটা হারিয়ে অভ্যন্তরীণ শরণার্থী হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছে। এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায় রাজধানী ঢাকার ৭০ ভাগ বস্তিবাসী জলবায়ু শরণার্থী। প্রতিদিন ঢাকাতেই প্রায় ২ হাজার জলবায়ু শরণার্থী আশ্রয় নিচ্ছেন। অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়তই নানারকম অপরাধী চক্র সংগঠিত হচ্ছে এবং সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে।

পরিবেশগত সংঘাত শুধু বিবাদে রূপ নিচ্ছে না, এটি বাস্তুতন্ত্রে প্রভাব ফেলছে এবং পরিবেশের ক্ষতি করছে। অবৈধ বালু উত্তোলন রোধে জনগণ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, আন্তর্জাতিক সংস্থা, গণমাধ্যম সবাইকেই দায়িত্বশীল এবং কার্যকর ভূমিকা পালন করা উচিত। আমাদের বর্তমান কাজের দ্বারাই ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়। তাই পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সবাইকেই সচেতন হতে হবে। সর্বোপরি ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০’ সঠিকভাবে বাস্তবায়নই হবে অবৈধ বালু উত্তোলন রোধের উত্তম হাতিয়ার।

লেখক :সউদ আহমেদ খান

শিক্ষার্থী, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads