জাতীয়

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

অবৈধ পদোন্নতির অভিযোগ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১

২০১৩ সালের আগস্টে পটুয়াখালী সিভিল সার্জন অফিসের প্রধান সহকারী নজরুল ইসলাম স্বাস্থ্য সহকারী থেকে ক্যাশিয়ার ও পরে প্রধান সহকারী হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্তে তার এই পদোন্নতি অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর পদোন্নতি বাতিল করে নজরুল ইসলামকে মূল পদ স্বাস্থ্য সহকারী পদে রাখার আদেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি তার পদোন্নতির জন্য যদি সরকারের কোনো আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকে তা সিভিল সার্জনকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ইস্যুকৃত আদেশে আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়।

নজরুল ইসলামের মতো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নন-মেডিকেল কর্মচারী ও স্বাস্থ্য সহকারীদের এমন অনেককেই অবৈধভাবে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অবৈধভাবে পদোন্নতি নেওয়া এসব কর্মচারী অবৈধভাবে বেতন বৃদ্ধির চাপও দিয়েছেন। ২০১১ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে এ বিষয়ে হিসাব নিয়ন্ত্রকের অফিস থেকে চিঠিও দেওয়া হয়। পরে অধিদপ্তরের তৎকালীন পরিচালক (অর্থ) ডা. মো. সাইদুর রহমান ভূঁইয়া তার প্রশাসনকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দেন। এ বিষয়ে তদন্তও করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, বিধি ও নিয়ম মেনেই পদোন্নতি হয়েছে।

যদিও ১৯৮৫ ও ২০১৮ সালের স্বাস্থ্য বিভাগীয় নন-মেডিকেল কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী স্বাস্থ্য সহকারী পদ থেকে পদোন্নতি পেয়ে পরিসংখ্যানবিদ, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর, উচ্চমান সহকারী ও হিসাবরক্ষক হওয়ার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্য সহকারী থেকে শুধু সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক, সিনিয়র স্বাস্থ্য পরিদর্শক, এমটি ইপিআই হওয়া যায়। কিন্তু স্বাস্থ্য সহকারী থেকে অনেকেই নিয়ম বহির্ভূতভাবে পদোন্নতি নিয়েছেন। জানাজানির পর তদন্তও করেছে অধিদপ্তর। তারপরও ফাঁকফোকর দিয়ে পদোন্নতি হয়েছে ঠিকই।

অবৈধভাবে পদোন্নতি নেওয়া এসব ব্যক্তির বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি তালিকায় দেখা গেছে, সাইদুর রহমান নামের এক স্বাস্থ্য সহকারীকে হিসাবরক্ষক পদে পদোন্নতি দিয়ে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০২০ সালের ১১ নভেম্বর পদায়ন করা হয়েছে। একইভাবে আব্দুল কুদ্দুস নামের এক স্বাস্থ্য সহকারীকে জালিয়াতি করে হিসাবরক্ষক পদে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। ২০২১ সালের ২৫ জানুয়ারি তাকে পুনরায় প্রধান সহকারী পদে পিরোজপুর সিভিল সার্জনে বদলি করা হয়। একই আদেশে স্টোর কিপার আক্তারুজ্জামানকে হিসাবরক্ষক করা হয়। নিয়ম থাকলেও তাদের পদোন্নতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগের পরিচালকের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি।

এ ছাড়া ২০২১ সালের ৫ মে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওয়ার্ড বয়কে হিসাবরক্ষক, ভাণ্ডারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হিসাবরক্ষক আল আমিনকে প্রধান সহকারী, বরগুনার আমতলীর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হিসাবরক্ষক শহিদুল ইসলাম মন্টুকে প্রধান সহকারী, পটুয়াখালীর দশমিনা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অফিস সহকারী আশরাফুলকে হিসাবরক্ষক, বরিশালের বিভাগীয় পরিচালক ভাণ্ডারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লতিফা আক্তারকে অফিস সহকারী পদে গত ১৮ মে পদায়ন করা হয়। কিন্তু ঢাকার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় বরিশাল পরিচালকের আদেশটি বাতিল করে। জান্নাতুল ফেরদৌস নামের অপর এক নারীকে ওই পদে পদায়ন করা হয়। এসব পদোন্নতিতেও বরিশাল বিভাগীয় পরিচালকের মতামত নেওয়া হয়নি। অথচ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বদলি, পেনশন ও পদোন্নতি বিধি অনুযায় বিভাগীয় পরিচালক সম্পন্ন করার কথা। স্থানীয় প্রশাসনকে না জানিয়ে অবৈধভাবে প্রধান কার্যালয় থেকে এগুলো করা হয়েছে। অবৈধ এসব পদোন্নতির সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন বিভাগের একটি জালিয়াতি চক্র জড়িত বলে জানা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. শেখ মো. হাসান ইমামের ব্যক্তিগত অফিস সহকারী আহসান সাইদ এরশাদ এসব পদোন্নতিতে ‘সহায়তা’ করেন। এই কর্মচারী নিজেও ছিলেন স্বাস্থ্য সহকারী। অবৈধভাবে পদোন্নতি নিয়ে হয়েছেন ব্যক্তিগত অফিস সহকারী।

এরশাদের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। অবৈধ পদোন্নতি, বদলি এবং ভুয়া ভাউচার দিয়ে বিল আদায় এমনকি গর্ভবতী মায়েদের চিকিৎসা ভাতা আত্মসাতের অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। কিন্তু এতকিছুর পরও বহাল তবিয়তে রয়েছেন এরশাদ। জানা গেছে, ওপর মহলের অনেকেই এরশাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত। তাদেরকে ম্যানেজ করেই এরশাদ এসব করতেন। ২০০৪ সালের জুলাইয়ে এরশাদ স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগ দেন। ২০০৮ সালে বেতন আগের পদের থাকবে এমন শর্তে পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে পদোন্নতি নেন। একইভাবে ২০১৪ সালে অফিস সহকারী হিসেবে পদোন্নতি নেন। পরে হন উচ্চমান সহকারী। ২০২০ সালে পুনরায় পদোন্নতি নিয়ে হিসাবরক্ষক বনে যান। এরপর ২০২০ সালের অক্টোবরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. শেখ মো. হাসান ইমামের ব্যক্তিগত অফিস সহকারী হিসেবে প্রেষণে আসেন এরশাদ। অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে এসে নিজেই এখন বাকিদের অবৈধ পদোন্নতির বন্দোবস্ত করে দিচ্ছেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনে করা এক অভিযোগে দেখা গেছে, এরশাদ এসব পদোন্নতির বিনিময়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে থাকেন। পরিচালকের (প্রশাসন) ব্যক্তিগত সহকারী হওয়াতে সারা দেশে তার শক্ত সিন্ডিকেট আছে। যদিও আহসান সাইদ এরশাদ সিন্ডিকেটের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছেন, ‘আমার কোনো সিন্ডিকেট নেই। আমি নিজে এখানে এসেছি কয়েক মাস হলো। আমাকে নিয়োগ বোর্ড পদোন্নতি দিয়েছে। আমি একা নই। সারা দেশে এমন অন্তত দুই হাজার কর্মচারী রয়েছে, যারা আগের বেতনের শর্তে পদোন্নতি পেয়েছে।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads