রাজধানীর অভিযাত এলাকা হিসেবে খ্যাত গুলশান, বনানী, উত্তরায় ক্লাব রেস্ট হাউসের আড়ালে নিষিদ্ধ ব্যবসায় যুক্ত রয়েছেন প্রায় ৫ শতাধিক সুন্দরী তরুণী। এই তরুণীদের দিয়ে জমজমাট চলছে নিষিদ্ধ ব্যবসা। রেস্ট হাউসগুলো নিরাপদ ভেবে এখানে যাতায়াত রয়েছে কলেজপড়ুয়া ছাত্র থেকে শুরু করে সব বয়সী পুরুষ। প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব অপকর্ম চললেও তারাও যেন নির্বিকার। লোক দেখানো দু-একটি অভিযান চললেও পরে আবারো একই অবস্থা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দিনের বেলায় যেমন তেমন রাত নামলেই অভিজাত এলাকার পরিবেশ হয়ে যায় অন্যরকম। সব রাস্তায় দ্রুত বেগের গাড়ির ছুটে চলা। দেখে যে কারই মনে হতে পারে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য ছুটে চলা। কিন্তু আদৌ তা নয়। সব গাড়ি মিশছে কোনো ক্লাব বা রেস্ট হাউসে। আর সেখানেই চলছে যত অপকর্ম। ভদ্রতার মুখোশের আড়ালটা কুরুচিপূর্ণের বহিপ্রকাশ। মদ, জুয়া সেই সঙ্গে উর্বশী নারীদের সঙ্গে বেহায়পনা সবই চলছে এখানে। দেখে মনে হবে প্রশাসনের যেন কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই এখানে। অথচ অনুমোদনহীন এসব এলাকার ক্লাব, রেস্টুরেন্ট এবং রেস্ট হাউসে প্রকাশ্যই সব ধরনের মাদক সেবন চলছে। এমনকি উচ্চ আদালত এ বিষয়ে নিষোধাজ্ঞা জারি করলেও কে শোনে কার কথা। প্রশাসনের একশ্রেণির কর্মকর্তাদের ম্যানেজের বিনিময়ে সব চলছে এখানে।
মিনি পতিতালয় : গুলশানের অন্তত অর্ধশতাধিক রেস্ট হাউস রয়েছে। এ সকল রেস্ট হাউসের আড়ালে চলছে নানা ধরনের অপকর্ম। হলিডে ইন, লিভার ডোর, কোয়ালিটি ইন, গার্ডেন ইন, বোনভিটা ইন, ইস্টার্ন রেসিডেন্স, ডি ক্যাসল, স্কাই পার্ক, ম্যারিনো, লোরেল, ফুজি ইন, পিনাকল। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কি হচ্ছে। রেস্ট হাউস ভেবে কেউ যদি সেখানে যান তবে তাকে পড়তে হয় চরম বিড়ম্বনায়। টিএনজ তরুণী দিয়ে গেস্ট নামের খদ্দেরদের মনোরঞ্জনের জন্য ব্যবস্থা এখানে। আসলে এখানে রেস্ট হাউসের কোনো বিষয় নয়। মিনি পতিতালয়। একেকটি গেস্ট হাউসে ৪০/৫০ জন তরুণী রয়েছে। স্বল্প সময়ের জন্য আসছেন খদ্দেরও। তাদের মনোরঞ্জন শেষে তারা চলেও যাচ্ছেন। এই রেস্ট হাউসগুলো যে এই কাজ তা নয়, এখানে মদ বিয়ারসহ রাতের বেলায় আরো জমজমাট আসর জমে। বিশেষ করে পিনাকল রেস্টুরেন্টে প্রকাশ্যই সবকিছু হচ্ছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। বেশ কয়েকবার থানায় তারা এ বিষয়ে অভিযোগও দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব রেস্ট হাউসে কমপক্ষে ৫ শতাধিক তরুণীর সঙ্গে রয়েছে যোগাযোগ। তরুণীরা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে চলে আসে রেস্ট হাউসে। আর রেস্ট হাউস কর্তৃপক্ষ তাদের খদ্দেরদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হয়। এই তরুণীদের মধ্যে বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।
এদিকে শুধু রেস্ট হাউস-ই নয় অনুমোদনহীন বিভিন্ন ক্লাবের আড়ালে চলছে বিদেশি মদ বিক্রি। এক প্রকার মদের বিশাল মজুত করে তারা বিক্রি করে চলেছেন।
অনুমোদন ছাড়া বার : মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকায় আরো যেসব হোটেল-রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ বিদেশি মদ-বিয়ার বিক্রির অভিযোগ করা হয়েছে সেগুলো হলো- গুলশান ২ নম্বর সার্কেলের তিন নম্বর প্লটের স্প্যাঘেটি জাজ, ৫৩ নম্বর রোডের ৮ নম্বর বাড়ির স্টিক হাউস, ৫৫ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাড়ির খাজানা, ৩৭ নম্বর রোডের অলিভ গার্ডেন, ১০৯ নম্বর রোডের ১০ নম্বর বাড়ির হেরিটেজ রেস্টুরেন্ট, ১১৮ নম্বর রোডের ১৫/বি নম্বর বাড়ির সাকুরা গোল্ডেন রাইস রেস্টুরেন্ট, ৭১ নম্বর রোডের কফি ম্যাঙ্গো, এক্সিট লাউঞ্জ, ৩৫ নম্বর রোডের ২৭ নম্বর বাড়ির সামদাদ লি., ৭১ নম্বর রোডের ক্যাফে অ্যারাবিয়ান, ৫০ নম্বর রোডের ৬ নম্বর বাড়ির ফ্লেমবি, ৫০ নম্বর রোডের ডি জ্যাং জিম রেস্টুরেন্ট, দি ক্যাসেল রেস্টুরেন্ট, অফ ট্র্যাক, গুলশান নর্থ এভিনিউর ৮ নম্বর বাড়ির স্প্রিট ফায়ার, ৭১ নম্বর রোডের থাই রেস্তোরাঁ সই-৭১, ৬৮ নম্বর রোডের কফি ওয়েগা, ৭১ নম্বর রোডের ১২ নম্বর বাড়ির ক্যাপিটাল ক্লাব, ৮৩ নম্বর রোডের ইন্টারন্যাশনাল ক্লাব, গুলশানের হোটেল ওয়াশিংটন, হোটেল রোজহুড, জায়ীকা রেস্টুরেন্ট, ১৩ গুলশান এভিনিউর ইফিজ, ৩৩ গুলশান এভিনিউর ফুড ভিলেজ, গুলশান ১৩৪-এর তোপ কাফি, গুলশান-১ এর ৬০/বি নম্বরের খুশবু রেস্টুরেন্ট, গুলশান-১ এর ৪৩ নম্বর বাড়ির এক্স লাউঞ্জ, বনানী ২৩ নম্বর রোডের মি লাউঞ্জ, বনানীর ফ্লোর সিক্স, সাংহাই, আলগিরা, হুক্কা লাউঞ্জ, বনানী ১১ নম্বর রোডের মিন্ট রেস্টুরেন্ট, রক রেস্টুরেন্ট, ডু মি ওকে রেস্টুরেন্ট, পেং ইয়াং রেস্টুরেন্ট, গুলশান-২ এর ৪৩ নম্বর রোডের সুরা রেস্টুরেন্ট, ৭১ নম্বর রোডের সুরা অন, নিউ কিংস কিচেন, জাকারিয়া, ডিম্পল, পিম্পল, ও কোরিয়ানা রেস্টুরেন্ট।
সূত্র জানিয়েছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তরফ থেকে অবৈধ মদ-বিয়ার বিক্রির সঙ্গে যুক্ত এসব হোটেল ও রেস্টুরেন্ট মালিককে ডেকে অবিলম্বে মদ-বিয়ার বিক্রি বন্ধ করতে বলা হয়। একই সঙ্গে রেস্টুরেন্টের প্রকাশ্য স্থানে ‘মদ-বিয়ার বিক্রি করা হয় না’ মর্মে নোটিশ টাঙিয়ে দিতে বলা হয়। মদ-বিয়ার বিক্রির অভিযোগে বেশ কিছু হোটেল-রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়। কিন্তু তালিকাভুক্ত এসব হোটেল-রেস্তোরাঁ ঘুরে ‘মদ-বিয়ার বিক্রি হয় না মর্মে’ কোথাও কোনো নোটিশ দেখা যায়নি।
গুলশান থানার ইন্সপেক্টর তদন্ত আমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের নিকটও এ ধরনের অভিযোগ আসছে। আমরা দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবো।
এদিকে গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার আসাদুজ্জামান বলেন, মাদক প্রতিরোধে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা মঝে মধ্যেই অভিযান পরিচালনা করে থাকি। নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ- পরিচালক মেহেদি হাসান বলেন, আমরা নতুন এক তালিকা তৈরি করেছি। এই তালিকা ধরে অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। শিগগিরই যেসব বার, ক্লাব, রেস্টুরেন্ট এমনকি রেস্ট হাউসের নামে মদ-বিয়ারসহ মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।





