স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে কৃষিক্ষেত্রে সাফল্য এলেও দীর্ঘমেয়াদে শক্ত ভিত্তি এখনো তৈরি হয়নি। এমন মত বিশেষজ্ঞদের। খোদ সরকারের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেছেন, ‘সরকার কৃষিতে ভর্তুকির পাশাপাশি বিভিন্ন সহায়তা দিলেও এখনো অর্জন হয়নি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। যদিও ২০৩১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য মাথাপিছু আয় হতে হবে ৫৪০০ মার্কিন ডলার, চরম দারিদ্রকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। কিন্তু এজন্য কৃষির একটি বিরাট ভূমিকা রয়েছে। এসডিজির এক নম্বর শর্ত হলো দারিদ্র্য কমানো এবং দুই নম্বর শর্ত হলো ক্ষুধা নির্মূল করা। এই শর্তই কৃষির সঙ্গে ওতোপ্রতভাবে জড়িত। তাই কৃষির ক্রমাগত অগ্রগতি ছাড়া সামগ্রিকভাবে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব না। তাই কৃষির প্রতি আরো মনোযোগ দিতে হবে।’
গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে বণিক বার্তা ও বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম (বিএজেএফ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের ৫০ বছর কৃষির রূপান্তর ও অর্জন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। যদিও একই অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক দাবি করেন, বাংলাদেশ আজকে খাদ্যে অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ সময় উর্বর ভূমি ও পানি দেশের জন্য আশীর্বাদ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে, সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কৃষি ও অর্থনীতি বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সিসহ অনেকেই। তিনি পেঁয়াজ নিয়ে গত বছর কৃষি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যের অসঙ্গতির কথা তুলে ধরে বলেন, ‘গত বছর (২০২০ সাল) কৃষি মন্ত্রণালয় আমাদের হিসাব দিলো, দেশে প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ টনের মতো আলু উৎপাদন হয়েছে। আমরা খুব আনন্দিত হলাম। পাশাপাশি আমাদের কাছে আরেকটি রিপোর্ট এলো যে, দেশে ৭০-৭৫ লাখ টন আলুর চাহিদা রয়েছে। সুতরাং, ২৫-৩০ লাখ টন আলু অতিরিক্ত থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলো সংকটের কারণে আলুর দাম ৪০ টাকা পর্যন্ত ঠেকেছিল। আলু রপ্তানিও করা হয়নি। তাই হিসাবটার মধ্যে বিশাল একটা গড়মিল রয়েছে। সঠিক তথ্যটা পাওয়া যায়নি। হয় আমাদের উৎপাদনটা ঠিকমতো হয়নি, নতুবা চাহিদা বেশি। তাই, সঠিক পরিসংখ্যানটা খুবই জরুরি। এবছর আবার ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা আলুর দাম ঠিকভাবে পাচ্ছেন না। তাই বাজারব্যবস্থা ঠিক রাখতে সঠিক পরিসংখ্যানটা আমাদের দরকার।’
এ প্রসঙ্গে, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ব্যবসায়ী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে কৃষিতে প্রাথমিক পণ্যের আমদানির ব্যয় ছিল ২ হাজার মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তা ৮ হাজার মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। স্বাধীনতার আগে পূর্ব পাকিস্তানে ১৫ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করা হতো। স্বাধীনতার পর সেটি ৩০ লাখ টন ছাড়িয়ে যায়। গত ৩ বছর আগে কৃষি পণ্যের আমদানির পর ৯৭ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। গতবছর ৬৭ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে। গত ১০ বছরে গড়ে প্রতিবছর প্রায় ৫০ লাখ টনেরও বেশি খাদ্য আমদানি করা হয়েছে। পশুসম্পদ খাতে সবচেয়ে বেশি আমদানি করা হয় গুঁড়া দুধ। ১২ বছর আগে প্রতিবছর গুঁড়া দুধ আমদানির পরিমাণ ছিল ১০৬ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে গুঁড়া দুধ আমদানির পরিমাণ ৩৬৬ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে এখনো প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় প্রায় প্রতিবছরই আমদানি করতে হচ্ছে। তাই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এখনো অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখেই রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা কৃষিতে আরো বেশি ভর্তুকির পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানি এবং গবেষণা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। নইলে আগামীতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরো হুমকির মুখে পড়বে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।





