জীবনের শুরুটা হয়েছে অভাব-অনটন আর সংকটের মধ্য দিয়ে। অভাবের সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে না পেরে বিদ্যালয়ের গণ্ডি পাড়ি দেওয়ার আগেই গ্রামের বাড়ি ছেড়ে মাথাগোঁজার ঠাঁই খুঁজে নিতে হয়েছে কংক্রিটের শহরে। তারপর রাজধানীর ঢাকায় শুরু হয় অবহেলিত জীবনের অধ্যায়। কংক্রিটের এই শহর যেন পাঁচশ টাকায় তাকে কিনে নিয়েছিল। অভাব, সংকট, দুশ্চিন্তা আর অস্তিত্বহীনতার পথচলা থামিয়ে দিতে ১২ বছর বয়সে আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধাবোধ করেননি। কিন্তু অপরিচিত এক পথশিশু তার জীবনের মোড় পাল্টে দিয়ে অর্থবহ করে তুলতে উৎসাহ জুগিয়ে মৃত্যুযাত্রা থেকে ফিরিয়ে আনেন। তারপর তিনিই হয়ে উঠলেন অসহায় মানুষের চোখের মণি। জানাচ্ছেন-অরণ্য সৌরভ
অভাবের সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে না পেরে বিদ্যালয়ের গণ্ডি পাড়ি দেওয়ার আগেই গ্রামের বাড়ি ছেড়ে মাথাগোঁজার ঠাঁই খুঁজে নিতে হয়েছে ঢাকায়। জীবনযুদ্ধের যাত্রায় শামিল হলো আরো একটি পা। পড়াশোনা করে জীবনকে রাঙাতে চাওয়ার স্বপ্ন থাকলেও, বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে কে? জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে চাইলেও, জয়ী হবে কীভাবে? এমন প্রশ্নের গোলকধাঁধা যেন পিছু ছাড়ছিল না তাকে। তিনি হলেন জীবনযুদ্ধে হার না মানা এক মানবিক তরুণ ও সহমর্মিতা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পারভেজ হাসান। যিনি ছিন্নমূল, পথশিশু, ভাসমান মানুষ এবং দেশের সংকটময় মুহূর্তে অসহায় মানুষকে জরুরি সেবা দেওয়ার মতো কাজ করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। অভাব, সংকট, দুশ্চিন্তা আর অস্তিত্বহীনতার পথচলা আটকে দেওয়ার জন্য ১২ বছর বয়সে আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধাবোধ করেননি। কিন্তু অপরিচিত এক পথশিশু তার জীবনের মোড় পাল্টে দিয়ে অর্থবহ করে তুলতে উৎসাহ দিয়ে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনেন।
প্রকৃতপক্ষে তার জীবনের শুরুটা হয়েছে অভাব-অনটন আর অস্তিত্বহীনতার মাধ্যমে। শৈশব থেকেই যেন জীবনযুদ্ধটা শুরু হয়েছিল। ৮ কি ১০ বছর বয়সেই সংসারের অভাবের কারণে ছাড়তে হয় নিজগৃহ। তারপর রাজধানীর ঢাকায় শুরু হয় অবহেলিত জীবনের অধ্যায়। মাসিক পাঁচশ টাকা বেতনে কাজ নেন মামার চায়ের দোকানে। প্রতিদিন সকাল ছয়টায় কাজে আসেন, শেষ করে ঘুমাতে যান রাত বারোটায়। সেই দুঃখসময়ে কোনো বন্ধুবান্ধব বা প্রিয়জন পাশে ছিল না। তিনি বলেন, ‘কংক্রিটের এই শহর যেন পাঁচশ টাকায় আমাকে কিনে নিয়েছে।’
একদিন চায়ের দোকানের ওপরের ব্রিজ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সবুজ নামে এক পথের শিশু তাকে টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, তুই কী করছিস? দুঃখ বলার মতো যেন একজন সঙ্গী পেলেন তিনি। তার ভাষ্যমতে, সেদিন তিনি অর্থহীন জীবনের সব কথা বলেন সবুজকে। সবুজ সব শুনে তাদের অনিশ্চিত জীবন সম্পর্কেও অবগত করে পারভেজকে। তারপর তিনি বুঝতে চেষ্টা করলেন, তার মতো অনেক শিশুই রয়েছে যাদের থাকার, খাওয়ার জায়গাও নেই। অতঃপর জীবন অর্থহীন নয় বরং নিজেকেই অর্থবহ করে তুলতে হবে বলে দম নেন।
তার কর্মস্থলের পাশেই ছিল গলফ ও টেনিস ক্লাব। সেখানে বল বয়ের কাজের সুযোগ পেলেন তিনি। চায়ের দোকানের পাশাপাশি তিনি প্রতিদিন পঞ্চাশ থেকে একশ টাকা বাড়তি আয়ের সুযোগ পেলেন। একপর্যায়ে টেনিস ক্লাবে ডেভিস কাপ টুর্নামেন্টে বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়রা আসে। খেলোয়াড়দের দেখাশোনার কাজ করার সুযোগ পান তিনি। টুর্নামেন্ট শেষে চলে যাওয়ার সময় খেলোয়াড়রা তাকে কিছু টাকা উপহার দিয়ে যায়। এছাড়া গলফ ক্লাবে বলবয়দের অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টে বিজয়ী হওয়ার সুবাধে আরো কিছু টাকা হাতে আসে।
তখনই তিনি ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। সেই থেকেই পথচলা শুরু। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রথমে নিজে একটি চায়ের দোকান দেন। তারপর সেখান থেকে চটপটি, ফাস্টফুডের মতো ছোটখাটো ব্যবসার সাথে জড়িয়ে যান। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার পর হয়ে ওঠেন একজন উদ্যোক্তা। নিজের জীবনে আর্থিক সচ্ছলতা আসার পরেই তিনি চিন্তা করলেন, আমি তো বেশ ভালোই আছি, মানুষের জন্য কিছু করছি না কেন? সেই থেকেই মূলত পথশিশু, ছিন্নমূল এবং ভাসমান অসহায় জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে কাজ করার ইচ্ছে জাগে।
একদিন ধানমন্ডিতে এক আইটি প্রতিষ্ঠানে ক্লাস করতে যাওয়ার সময় এক মুমূর্ষু রোগীকে তার দুই শিশুর বাঁচানোর প্রচেষ্টা দেখে তিনি এগিয়ে গেলেন। রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। রোগীর দুঃখ দুর্দশার কথা শুনে একটি ভিডিও ফেসবুকে আপলোড করে সাহায্যের আবেদন করেছিলেন। সেই ভিডিওর সুবাধে তৎকালীন কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন তাদের অসহায়ত্ব দূর করতে এগিয়ে আসেন। ভিক্ষার থালার পরিবর্তে শিশুদের হাতে উঠল বই। তারা ফিরে পেল তাদের সমস্ত মৌলিক অধিকার। এরকম বেশ কিছু মানবিক কাজ প্রতিনিয়ত করার সুবাধে মানুষ তাকে ‘মানবিক পারভেজ’ হিসেবে আখ্যা দিতে আরম্ভ করে। তারপর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠলেন অসহায় মানুষের চোখের মণি।
তিন বছর পূর্বে বিদেশি সংস্থা বাংলাদেশ ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশন অব টেক্সাস (বায়াট)-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। এখান থেকে পাওয়া বেতনের ৭০ শতাংশ ফাউন্ডেশনের ফাইন্যান্সের কাজে ব্যয় করেন। এছাড়া ব্যক্তিগত ব্যবসা ও ফাউন্ডেশনের গভর্নিংবডির সদস্যরা পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রায় এক বছর আগে সহমর্মিতা ফাউন্ডেশন কানাডিয়ান গভর্নমেন্ট রেজিস্টার অর্গানাইজেশন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তারা সবাই মিলে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে। তিনি একজন উদ্যোক্তা। পাশাপাশি একজন সোশ্যাল ফিল্ম মেকার। বিভিন্ন দেশের সাথে কোলাবোরেশানে কাজ করেন।
সহমর্মিতা ফাউন্ডেশন মূলত পথশিশু কিংবা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবন মানোন্নয়ন, খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করে। এছাড়া ব্লাড ডোনেশন, অজ্ঞাতনামা রোগী, দেশের যে-কোনো দুর্যোগ মুহূর্তে অসহায় মানুষের চাহিদা অনুযায়ী নানান রকম সহযোগিতায় পাশে থাকে।
করোনাভাইরাসের আরম্ভ থেকে লকডাউনে কাজহীন নিম্ন-আয়ের মধ্যবিত্ত ১০ হাজার পরিবারকে ডোর টু ডোর নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার পৌঁছে দিয়েছেন। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় আম্পানের শুরু থেকে উপকূলীয় অঞ্চলে পানিবন্দি অসহায় এক লাখ মানুষকে খাদ্য সহয়তা দিয়েছে। তাছাড়া বানবাসী মেয়েদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কয়েক হাজার স্যানেটারি ন্যাপকিন বিতরণ করেছে সহমর্মিতা ফাউন্ডেশন। এর বাইরে ভাসমান হাসি প্রজেক্টের মাধ্যমে উপকূলীয় ৩ হাজার শিশুকে দিয়েছে নতুন পোশাক।
এছাড়া রমজান উপলক্ষে ভাসমান রাস্তায় শুয়ে থাকা মানুষের জন্য সাহরি প্রজেক্ট হাতে নিয়ে কাজ করেছে সহমর্মিতা ফাউন্ডেশন। এই প্রজেক্টের আওতায় ২০ হাজারের মতো মানুষ সেহরি খাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন বলে জানান পারভেজ। তা ছাড়া জাকাত ফান্ড থেকে অসহায় নারী ও কিশোরীকে স্বাবলম্বী করার জন্য স্বাবলম্বীর উপকরণ হিসেবে ফাউন্ডেশনটি হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলসহ সেলাই মেশিন প্রায় ৩০০ জনকে দিয়েছেন। এ ছাড়া হাতিরঝিলে একটি স্কুলে ১২২ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশু পড়াশোনার পাশাপাশি উপার্জক্ষম করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০১৮ সালে পারভেজ প্রতিষ্ঠা করেন সামাজিক ও মানবিক সংগঠন ‘সহমর্মিতা ফাউন্ডেশন’। সংগঠনটি ‘এক টাকার মেডিকেল’ নামে একটি স্বাস্থ্য ক্যাম্প গঠন করে কাজ করছে। এই ক্যাম্পের মাধ্যমে অসহায় পরিবারকে চিকিৎসকদের পরামর্শ ও বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করে থাকে ফাউন্ডেশনটি। বর্তমানে দেশের ৩১টি জেলায় মানবিক ও সামাজিক কাজ করছে সহমর্মিতা ফাউন্ডেশন।
সহমর্মিতা ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর বোর্ড মেম্বার আনিসুল ইসলাম বলেন, তিনি (পারভেজ) সবসময়ই একটা জেদ মনের মাঝে পুষে রাখতেন যে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য কিছু একটা করতেই হবে। করোনার সংকটময় মুহূর্তে দেশের মানুষের জন্য কাজ করা, ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে উপকূলীয় অঞ্চলের অসহায় মানুষের জন্য একশ দিন বন্যাকবলিত মানুষের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়া। মেয়েদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ, হাজার হাজার পরিবারকে ওষুধ ও খাবারের সাপোর্ট দেওয়ার মাধ্যমে পারভেজ হাসান মানবিকতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যাচ্ছে তরুন প্রজন্ম এই থেকে অবশ্যই প্রেরণা নেবে বলে আমি মনে করি।





