ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় শীতের মধ্যে অসময়ের টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে চলতি মৌসুমের বোরো ধানের বীজতলা, ঝড়ে পড়েছে আমনের পাকা ধান, হুমকির মুখে পড়েছে শীতকালীন সবজি ও ফসল। অনাকঙ্খিত এ ক্ষতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্যমতে টানা বৃষ্টিতে পৌর শহরসহ উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে ৪শ ৩০ হেক্টর জমি বীজতলাসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরমধ্যে রয়েছে সরিষা ২০০ হেক্টর, বোরো বীজতলা ১৭০ হেক্টর, আমন পাকা ধান ৪০ হেক্টর ও শীতকালীন সবজি ক্ষেত রয়েছে ২০ হেক্টর। বুধবার এ তথ্য জানান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানা বেগম।
তবে কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তার সঠিক পরিমাণ নিরুপন করতে দু’একদিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অগ্রহায়ণ মাসে সাধারণত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কৃষকরা বোরো মৌসুমের জন্য বীজতলা অপেক্ষাকৃত নিচু জমিতে করে থাকেন। হঠাৎ টানা বৃষ্টিতে তাদের প্রায় আশিভাগ বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে যায় ।
এ অবস্থার ফলে বোরো আবাদ নিয়ে স্থানীয় কৃষকরা এক প্রকার শঙ্কায় পড়েছেন। স্থানীয় কৃষকরা জানায় বোরো ধান আবাদে তাদের কয়েকগুন খরচ বেড়ে বৃদ্ধি পাবে। আর দেরিতে আবাদের কারণে আশানুরোপ ফলনও হবে না বলে জানায়। ফলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বে স্থানীয় কৃষকরা। পাশাপাশি এই বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে নিচু এলাকার সবজি, সরিষাসহ অন্যান্য ফলনের।
উপজেলার ধাতুরপহেলা গ্রামের কৃষক মো. কাউয়ুম মিয়া বলেন, এ মৌসুমে ৮ বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করা হয়। ইতিমধ্যে অর্ধেক ধান তার কাটা শেষ হয়েছে বলে জানায়। তাছাড়া চলতি বোরো ধান আবাদের লক্ষে গত ৩ দিন আগে বীজতলা তৈরী করে বীজ ফালানো হয়। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে তার বোরো ধানের বীজতলা সম্পূর্ণ তলিয়ে নষ্ট হয়ে যায়।
তিনি আরো বলেন, খুব কষ্টে জায়গা ও বীজ যোগার করা হয়েছিল । তাছাড়া বৃষ্টির কারণে বাকী পাকা ধান মাটিতে হেলে পড়ে আছে। কি ভাবে আবার জমি চাষ করবো পানিতে তলিয়ে থাকা ধান কাটবো এ চিন্তায় তার মাথায় হাত পড়েছে।
কৃষক মো. শহিদ ভূইয়া বলেন, চলতি মৌসুমে ১০ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষে বীজতলা করা হয়। গত কয়েক দিনের অতিবৃষ্টিতে তা পানিতে তলিয়ে আছে। আজ কালের মধ্যে পানি না সরলে সম্পন্ন পচে নষ্ট হয়ে যাবে।
পৌর শহরের কৃষক আবু কাউছার কলেন, বোরো ধান আবাদ করতে অনেক কষ্টে নতুন জাতের বীজ ধান আনা হয়। গত ৬ দিন আগে বীজতলা তৈরী করে বীজ ফালানো হয়। এরইমধ্যে বীজতলায় ধানের চারা আসতে শুরু করে। হঠাৎ বৃষ্টিতে পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। এখন কোথায় বীজ পাব কি করব বুঝতেছি না।
কৃষক মো. ফজলু মিয়া বলেন ৭ বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করা হয়। এর মধ্যে তার ৫ বিঘা জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে। বাকী জমির ধান শ্রমিকের অভাবে কাটা হয়নি। ধান গাছগুলো বাতাস ও বৃষ্টিতে জমিতে পড়ে গেছে। এখন অর্ধেক ধানও পাবে কি-না তা নিয়ে তিনি সংশয় আছেন তিনি।
কৃষক মো. আজাদ মিয়া বাংলাদেপশের খবরকে বলেন, চলতি মৌসুমে বোরো ধান আবাদ করতে ১০ বিঘা জমির বীজতলা করা হয়। বীজতলায় কেবলমাত্র ধানের চারা এসেছিল। টানা বৃষ্টিতে আমাদের বোরো ধানের চারাগুলো পচে গেছে। এখন আবার ধান বীজ কিনতে হবে, প্রক্রিয়াজাত করে পুনরায় বুনতে হবে। ধান আবাদে অনেকদিন পিছিয়ে বড় ধরনের লোকশানে পড়লাম।
উপজেলার কৃষ্ণনগর এলাকার কৃষক মো. আব্বাস মিয়া বাংলাদেপশের খবরকে বলেন, কিছুদিন আগে আগাম জাতের করা নানা প্রকারের সবজি বিক্রি তিনি শেষ করেছেন। এরপর নতুন করে শীতকালীন সবজি লাল শাক, বেগুন, মূলাসহ নানা প্রকার সবজি আবাদ করা হয়। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে এসব সবজির শেকড় পচে গেছে। রোদ পেলে বেশিরভাগ সবজি ঢলে পড়বে। এই বৃষ্টিতে তার বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে বলে জানায়।
কৃষক আল-আমিন বলেন, গত ৫ দিন আগে জায়গা প্রস্তুত করে প্রায় ১ বিঘা জমিতে শীতকালীন লাল শাখ, পুইশাখ, টমেটো, মরিচ, বেগুনসহ নানা প্রকার সবজি লাগানো হয়। বৃষ্টিতে তার সব কিছু নষ্ট হয়ে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেলো।
মোগড়া এলাকার কৃষক মো. ফোরকান মিয়া বলেন, সরকারের সহায়তায় সরিষা বীজ নিয়ে ১ বিঘা জমিতে তিনি গত ৫ দিন আগে সরিষা আবাদ করেন। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে তার পুরো জমি নষ্ট হয়ে গেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানা বেগম বাংলাদেপশের খবরকে বলেন টান বর্ষণে পাকা ধান, ধানের বীজতলা, শীতকালীণ সবজি ও বেশকিছু রবি শস্যের ক্ষেত আক্রন্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এ উপজেলায় প্রায় ৭৫ ভাগ রোপা আমন ধান কাটা হয়েছে। বাকি ২৫ ভাগের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই বাতাসে হেলে পড়ে পানিতে নিমজ্জিত হয়ে ক্ষতি হয়।
তিনি আরো বলেন, আর যদি বৃষ্টি না হয় জমি থেকে পানি দ্রুত কমে গেলে বেশীভাগ বীজতলাসহ অন্যান্য ফসল রক্ষা পাবে। টানা বৃষ্টিতে পৌর শহরসহ উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে ৪শ ৩০ হেক্টর জমি বীজতলাসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত থেকে বাঁচতে আমরা সব সময় কৃষকদেরকে সার্বিক ভাবে পরামর্শ দিয়ে আসছেন বলে জানায়।





