জীবন বাঁচাতে বয়স কখনও ধারদ্বারে না। বেঁচে থাকার তাগিদে পরিবারের সদস্যদের মুখে অন্ন জোগাতে জীবিকার জন্য রাত দিন পরিশ্রম করে। এরমধ্যে কেউ করছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, কেউ করছে কঠোর পরিশ্রমের কাজ। ঠিক তেমনি পচিশোর্ধ বয়সী মো. সুজন মিয়া নামে এক যুবক বেঁছে নিয়েছে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে আখের রস বিক্রি। সে তার পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় তৃষ্ণা মিটানো আখের রস বিক্রির আয় দিয়ে চালাচ্ছে তার পরিবারের ভরণপোষণ।
সুজন কিশোরগঞ্জের আমিন উদ্দিনের ছেলে। বর্তমানে সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর শহরের তারাগন এলাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে বসবাস করছেন। তার পরিবারে বাবা মা, ৩ ভাইসহ ৫ জন সদস্য রয়েছে। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে আখের রস বিক্রি করে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করছে।
সুজন প্রতিদিন ব্যাটারি চালিত একটি ভ্যান নিয়ে ছুটে ছুটে বেড়ান শহরসহ গ্রাম গঞ্জের আনাচে-কানাচে। ভ্যানের এক পাশে আখ আর অন্যপাশে আখ মাড়াই করা মেশিন। এই গরমে তৃষ্ণা মেটাতে ছোট বড় সবাই যেন ছুটে আসেন তার ভ্যানের কাছে। ইতিমধ্যে আখের রস বিক্রিতে এলাকার লোকজনের সাথে তার ভালো পরিচিতি তৈরী হয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে আখ সংগ্রহ করে গ্রামে গঞ্জে সে আখের রস বিক্রি করছেন। এক গ্লাস আখের রস বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকায়। প্রতিদিন ১৫শ থেকে ১৬শ টাকা বেচা-বিক্রি হয় বলে জানায়। এতে তার আয় হয় প্রায় ৬-৭ শ টাকার মতো। আর এদিয়ে সে তার পরিবারের যাবতীয় খরচ মেটান।
আখ সম্পর্কে জানা যায়, মিষ্টি রসে ভরা হলো আখ। পানিশূন্যতা দূরীকরণে ও জন্ডিস রোগের মহৌষুধ হিসেবেও কাজ করে বহুবর্ষজীবী এ উদ্ভিদটি। এতে রয়েছে মিনারেল, প্রোটিন, ম্যাগনেসিয়াম,পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও আয়রন যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। আখের রসে দেহের ক্লান্তি দূর করে। আখের রস ক্যান্সার প্রতিরোধ করে, লিভারের সমস্যা দুর করে, কোলেস্টেরলের নিঃসরণ কমাতেও ভূমিকা রাখে, হজমশক্তি বৃদ্ধি করে, কিডনির সমস্যা দূর করে, ত্বকের জন্য খুবই উপকারী, দাঁত ও হাড়ের শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্যসহ নানা প্রকার উপকার করে।
পৌর শহরের তারাগন এলাকার দেখা হয় আখের রস বিক্রেতা সুজনের সঙ্গে। চাকা ঘুরানো মেশিনের শব্দ শুনে নানা বয়সী লোকজন তার ভ্যানের কাছে ভিড় করেছেন। তাদের উদ্দেশ্য এক গ্লাস আখের রস খেয়ে প্রাণ জুড়াবে। একে একে বেশ কয়েকজন লোক আখের রস খেয়ে তৃপ্তি নিয়ে জায়গা ত্যাগ করছেন। কেউ কেউ আবার একের অধিকও খাচ্ছেন। ছোট বড় সবাই যেন তার আখের রস পান করতে ছুটে আসেন।
সুজন বলেন, দৈনিক সকাল ১০টায় আখ নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে তার বাড়ি ফিরতে হয় রাত ৮টায়। এরআগে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পযর্ন্ত ভ্যানে করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে সে সবজি বিক্রি করছেন। ইতিমধ্যে সে স্থানীয় ভাবে সবজি ও আখ বিক্রিতে ভালো পরিচিতি লাভ করছেন। তবে সবজি বিক্রি করে ও তার দৈনিক দেড় থেকে দুশত টাকা আয় হয়। আর সবজি ও আখের রস বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়ে ভালোভাবেই চলছে তার পরিবার। বর্তমানে তার পরিবারে নেই কোন অভাব অনটন। সুজন বলেন, পরিবারে অভাব অনটন থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্বেও পড়াশুনা করতে পারেন নি। তাই পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে আখের রস ও সবজি বিক্রি করছেন।
মো. এরফান মিয়া বলেন সুজনের আখের রসের ভ্যান দেখলেই আমার দুই ছেলে দ্রুত ছুটে আসেন। প্রতিদিন এখন আখের রস খাওয়া যেন তাদের নিয়মে পরিণত হয়েছে। কোন কোন সময় পরিবারের সকলেও পান করা হয়।
গৃহিনী আমেনা বেগম বলেন প্রতিদিন বাড়ির কাছে এসে আখের রস বলে ডাকতে থাকেন। শব্দ শুনা মাত্র তার ছেলে ও মেয়েকে ঘরে রাখা যায় না। তার আখের রসের গুণগত মান অন্যদের তুলনায় ভালো হওয়ায় পান করছেন তারা। মো. ফারুক মিয়া বলেন আখের রস শরীরের উপকার হওয়ায় সময় সুযোগ পেলে তিনি পান করেন । অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের জন্য মিনারেলের বোতলে করে বাড়িতে নিয়ে যান বলে জানায়।
আখাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানা বেগম বলেন, ‘স্বাস্থ্য সম্মতভাবে আখের জুস পান করতে পারলে এটি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী। তাছাড়া আখ দাঁত দিয়ে চিবিয়ে খেলে দাঁতের জন্যও উপকারী। এতে খনিজ উপাদান ছাড়াও ভিটামিন রয়েছে। তবে অনেক সময় রাস্তার পাশে অস্বাস্থ্যকরভাবে তা বিক্রি করা হয়। সেটা আমাদের শরীর-স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকারক।





