ইসলাম একটি বিশ্বজনীন জীবনাদর্শ। যা বিশ্বমানবতার জন্য আল্লাহপ্রদত্ত একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এটি মানবজাতির জন্য সর্বাবস্থায় চির কল্যাণকর। যার মধ্যে সব যুগের সব মানুষের জন্য জীবনের সব দিক-বিভাগের সুস্পষ্ট ও স্থায়ী কল্যাণের পথনির্দেশ রয়েছে। যা সবার জন্য সমানভাবে অনুসরণীয় ও পালনীয়। আল- কোরআনের বর্ণনা ধারা থেকে বুঝা যায়, পৃথিবীর সর্বপ্রথম মানুষ হজরত আদম (আ.) পৃথিবীতে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রব্যবস্থার সূচক ছিলেন। হজরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টির প্রাক্কালে মহান আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘আমি পৃথিবীতে খলিফা সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।’
সংঘবদ্ধ সমাজজীবন ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা মানুষের জন্মগত প্রবৃত্তিরই অংশ। আল্লাহর খলিফা হিসেবে আপন অধীনদের ওপর ঐশী প্রতিনিধিত্বের প্রতিফলন ঘটানো মানুষের জন্মগত দায়িত্ব। আর এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অধীনদের ওপর কর্তৃত্ব গড়ে উঠা এক স্বাভাবিক পরিণতি। এই কর্তৃত্ব যদি পরিবারের পরিসরে গড়ে উঠে তাহলে তাকে বলা হয় পরিবারের অধিপতি। আর যদি তা ক্ষুদ্র সামাজিক পরিসরে গড়ে উঠে, তাহলে তাকে বলা হয় সমাজপতি। কিন্তু যদি এই দায়িত্ব আরো বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে গড়ে উঠে, আর এই কর্তৃত্ব যদি কঠোর আইন-কানুন ও বিধি-নিষেধ এবং বিচার শাস্তির পরিসর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, তাহলে তাকে বলা হয় রাষ্ট্রপতি। হজরত আদম (আ.) আপন পরিবারের সদস্যদের ওপর ঐশী প্রতিনিধিরূপে যে কর্তৃত্ব প্রতিফলিত করেছিলেন এবং ঐশী দিক-নির্দেশনার আলোকে তাদেরকে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের যে প্রক্রিয়া অবলম্বন করেছিলেন সেটাকেই ক্ষুদ্র পরিসরে পৃথিবীর প্রথম রাষ্ট্রব্যবস্থা আখ্যায়িত করা যায়।
আধুনিক যুগে খেলাফতের রাষ্ট্রব্যবস্থা কীরূপ হবে তা কারো কারো নিকট একটি বিরাট প্রশ্ন। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন দলের বিভিন্ন রকম আলোচনার ধূম্রজাল সৃষ্টিতে সহায়ক হয়েছে। খিলাফাত পুনঃপ্রতিষ্ঠা আন্দোলনের প্রক্রিয়ার ব্যাপারে যেমন বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় তেমনি এ ব্যাপারেও মুসলিম সমাজে বিভিন্ন মতাদর্শের সন্ধান পাওয়া যায়। এর অধিকাংশই অবশ্য অন্য মতবাদের অনুসারী রাষ্ট্রকাঠামোর প্রভাবে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে প্রভাবান্বিত। কারো কাছে খালিফা হচ্ছেন একজন ডিক্টেটর বা প্রায় ডিক্টেটর। কারো কারো ধারণা খালিফার অবস্থান হচ্ছে প্রেসিডেন্সিয়্যাল সিস্টেমের একজন প্রেসিডেন্টের ন্যায়। আবার কেউ কেউ কেবিনেট সিস্টেমকেই ইসলামী শাসনপদ্ধতির আদর্শ নমুনা মনে করেন। আরেকদল তথাকথিত উদারভাবে মনে করেন এসব প্রক্রিয়ার যে কোনোটিই ইসলামী শাসন-পদ্ধতিতে গ্রহণযোগ্য। যেহেতু তাদের মতে ইসলামে কোনোটির ব্যাপারেই বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়নি। আবার এককেন্দ্রিক এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের দুটো ব্যবস্থার পক্ষেই ওকালতি দৃষ্ট হয়।
প্রকৃতপক্ষে এইসব কোনো পদ্ধতির সাথেই খিলাফাত ব্যবস্থার কোনো সম্পর্ক নেই। খিলাফার রয়েছে নিজস্ব একটি সুন্নাহভিত্তিক সুস্পষ্ট অনুপম ব্যবস্থা। যা অন্য কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থার কোনো উপাদানকে ধারকর্জ করে নিয়ে আসার অপেক্ষা রাখে না। খিলাফাতের প্রধান দুটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে খালিফাত ও মাজলিশ আশ-শুরা। খিলাফাহর মাজলিশ আশশুরা গঠন, ক্ষমতা ও কার্যাবলির দিক থেকে পৃথিবীর অন্য কোনো আইন পরিষদের সাথেই তুলনীয় নয়। কী আমেরিকান সিনেট, কী ব্রিটিশ হাউস অফ লর্ডস অথবা তাদের নিম্নপরিষদ এমন কী সুইস পার্লামেন্ট থেকে শুরু করে একনায়কদের পুতুল পার্লামেন্ট পর্যন্ত কোনোটার সাথে এর কোনো সাযুজ্য নেই। খালিফাহর অবস্থাও তথৈবচ। তিনি কোনো গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট কিংবা প্রধানমন্ত্রী নন। নন নিরঙ্কুশ কিংবা নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের রাজা। তিনি চ্যান্সেলর, ফুয়েরার, স্বৈরাচার বা একনায়কত্ববাদী কোনো ডিক্টেটরও নন।
চূড়ান্ত বিচারে খিলাফাহ এককেন্দ্রিক কিংবা যুক্তরাষ্ট্রীয় কোনো সরকারব্যবস্থার অনুরূপ নয়। এক্ষেত্রে ইসলামী নীতি চরমভাবাপন্নতার পরিবর্তে নমনীয়তা প্রদর্শন করে। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ হচ্ছে মেহমানের যোগ্যতা বেশি থাকলেও মেজবানের ইমামতিত্বের অধিকার বেশি। রাষ্ট্র ও নাগরিক চাহিদা যুগে যুগে পরিবর্তনশীল। কিন্তু আল্লাহর আনুগত্যের আওতায় তাঁর বান্দাগণকে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা, সুখ ও শান্তি নিশ্চিত করার নীতি অপরিবর্তণীয়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদেরকে আবার খিলাফত রাষ্ট্রের নেয়ামতে ভূষিত করুন। আমীন।
লেখক :মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
সাংবাদিক, গল্পকার





