জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে (এনএইচআরসি) আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে ২০১২ সাল থেকে দায়ের করা বিভিন্ন অভিযোগ পড়ে আছে অমীমাংসিত অবস্থায়। অভিযোগ উঠেছে, বিচারপ্রার্থীরা বছরের পর বছর কমিশনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো সমাধান পাচ্ছে না। ফলে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে গুম, হত্যা ও নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগের সমাধান পেতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর আস্থা কমছে জনগণের।
এদিকে কমিশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, অমীমাংসিত অভিযোগগুলো নিষ্পত্তির জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন নাসিমা বেগম সময় দিতে পারছে না স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এজন্য কমিশন গত কয়েক মাস ধরে চেষ্টা করেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে বৈঠক করতে পারেনি। এ কারণে সরকারি সংস্থাগুলোর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কয়েক ডজন অভিযোগ বছরের পর বছর ধরে কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা ছাড়াই ঝুলে আছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় পর্যায়ে মানবাধিকার রক্ষায় কমিশন কাজ করতে আগ্রহী, এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কমিটি গঠনের মতো এমন ইতিবাচক প্রচেষ্টায় সরাসরি তাদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকে সবচেয়ে বেশি। সরকারি চাকুরে বা নির্বাহীরা এ কমিটির প্রধান বা সদস্য হিসেবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকার বিধানের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখবেন। তাই নিজেদের বা সহকর্মীদের দায় মুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করার সম্ভাবনা থেকে যায়। এ ধরনের উদ্যোগ আদৌ কমিশনের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করবে কি না তা বিবেচনার ক্ষেত্রে কমিশন দূরদর্শীতার পরিচয় দিতে পারেনি বলে অনেক মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
অন্যদিকে আবারো আলোচনায় উঠে এসেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশ। গত ২৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন রাষ্ট্রপতির কাছে ২০২০ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি তখন বলেছেন, মানুষের স্বার্থ সুরক্ষা ও সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিতে কমিশনকে আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে। কিন্তু বাস্তবে কোনোভাবেই ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না তারা।
যদিও রাষ্ট্রপতির নির্দেশনার পর কমিশনের পক্ষ থেকে দেশের ৬৪টি জেলার ডেপুটি কমিশনারকে মানবাধিকার সংক্রান্ত জেলাভিত্তিক কমিটি গঠনের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। এই কমিটি জেলা পর্যায়ে মানবাধিকার সংরক্ষণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত অভিযোগগুলো নিয়ে কাজ করবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ১৪ সদস্যের এ কমিটিগুলোর নেতৃত্ব দেবেন ডেপুটি কমিশনার, যেখানে সহসভাপতি হিসেবে থাকবেন পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জন। এ ছাড়া সদস্য হিসেবে থাকবেন স্থানীয় প্রেস ক্লাব, জেলা বার কাউন্সিল, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের স্থানীয় সমন্বয়ক। চিঠিতে কমিশনের সঙ্গে মাঠ প্রশাসনের দাপ্তরিক যোগাযোগের সুবিধার্থে সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের দপ্তরে অভিযোগ ও তদন্ত বিষয়ে দায়িত্ব পালন করেন এমন একজন উপযুক্ত কর্মকর্তাকে ‘মানবাধিকার বিষয়ক ফোকাল ডেস্ক’ হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাসিমা বেগম বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে অমীমাংসিত অভিযোগ, মানবপাচার, গুম ও হত্যা, নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতাসহ অন্যান্য বিষয়গুলো নিয়ে একটি যৌথ সভা করার জন্য কমিশন থেকে ফোনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। এমনকি এ জন্য জানুয়ারি থেকে কমপক্ষে দুবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চিঠি পাঠিয়েছি। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে সভা করার কোনো সাড়া পাইনি। এখন, আমার যা করা দরকার আমি তা করব।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের কাছে ‘সুবিধাজনক সময়’ চেয়ে গত ১ আগস্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সর্বশেষ চিঠিতে কমিশন বলেছে যে, তারা সাধারণত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় মামলাগুলির উত্তর দিতে দীর্ঘ সময় নেয়। ফলে অভিযোগের নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা হচ্ছে। আর এসব কারণে জনগণ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর আস্থা হারাচ্ছে।
কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, এ বছরের শুরুর দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক চেয়ে প্রথম চিঠি পাঠানো হয়। সর্বশেষ চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, কমিশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বসতে চায়। চিঠির অনুলিপি আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে, গত ২৩শে সেপ্টেম্বর রাজধানীর মগবাজারে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের এক অনুষ্ঠানে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন নাসিমা বেগম জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিনের উপস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়। তখন কমিশনের চেয়ারম্যান তাদের এ বিষয়গুলো মনে করিয়ে দেন।
এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তিনি জানান, বৈঠকের জন্য কমিশনের করা আবেদনের কোনো সাড়া এখনো পাননি তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমান কমিশন ২০১২ সাল থেকে দায়েরকৃত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে ৯১টি মুলতবি থাকা অভিযোগের পৃথক তালিকা রয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ২০টি জোরপূর্বক গুম সংক্রান্ত, ১১টি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মৃত্যুর সঙ্গে, ১৫টি হেফাজতে মৃত্যু সংক্রান্ত এবং ১৯টি নির্যাতন সংক্রান্ত। বাকি ২৬টি অভিযোগ নারী সহিংসতা, মিথ্যা মামলা এবং অন্যান্য ধরনের অধিকার লঙ্ঘনের সাথে সম্পর্কিত। কমিশন জানায়, সরকার ৯১টি অভিযোগের মধ্যে ৫২টির বিষয়ে পুলিশ প্রধানকে চিঠি দিয়েছে এবং চিঠির অনুলিপি কমিশনে পাঠিয়েছে। পুলিশ প্রধানের কার্যালয়ের প্রতিক্রিয়া কী ছিল তা নিশ্চিত করা যায়নি তবে কমিশন ২৫টি অভিযোগের বিষয়ে আরও প্রতিবেদন চেয়েছে।
অভিযোগ সূত্র জানায়- রাজধানীর সূত্রাপুর শাখা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি সেলিম রেজা পিন্টুর বোন রেহানা বানু মুন্নি ২০১৫ সালে কমিশনের কাছে অভিযোগ করেছিল যে, তার ভাই পিন্টুকে ২০১৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তুলে নেওয়া হয়েছিল। আইন শৃঙ্খলাবাহিনী পিন্টুকে জোর করে তুলে নেওয়ার পর থেকে নিখোঁজ হওয়ার প্রতিকার চেয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে গিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে রেহানা বানু বলেন, আমি বেশ কয়েকবার এনএইচআরসি অফিসে গিয়েছি এবং প্রতিবারই কমিশন আমাকে একই চিঠি পাঠিয়েছে যে তদন্ত এখনো চলছে। তাকে পাঠানো এই ধরনের একটি চিঠিতে, ৪ আগস্ট, ২০১৯-এ এনএইচআরসি বলেছে যে, পিন্টু নিখোঁজের ব্যপারে মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। এভাবে সেলিম রেজা পিন্টুর ব্যাপারে আগস্ট ২০১৯ পর্যন্ত কমিশন তদন্তের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ২১টি চিঠি পাঠিয়েছিল।
রেহানা বানু জানান, এনএইচআরসির উপ-পরিচালক রবিউল ইসলাম ১ জানুয়ারি, ২০২১ তারিখে তাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। ওই চিঠিতে বলা হয় যে, সেলিম রেজা পিন্টু নিখোঁজের পর পরিবার থেকে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল এবং ফৌজদারি তদন্ত বিভাগ ঢাকার একটি আদালতে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে এবং কমিশনের চেয়ারম্যান নাসিমা বেগমের নেতৃত্বে কমিশন অভিযোগটি খারিজ করেছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ব্যর্থ হয়ে জনগণ যখন মানবাধিকার কমিশন থেকেও সুরাহা পায়না, তখন জনগণের কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা থাকে না। প্রশ্ন রেখে রেহানা বানু বলেন, এমন অবস্থা হলে কি-হবে মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) সহকারী সমন্বয়ক, মিডিয়া অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভোকেসি তামান্না হক রীতি বলেন, কেবলমাত্র একটি ‘নখদন্তহীন বাঘ’ হিসেবে কমিশন থেকে গেলে তা প্রকৃতপক্ষে মানবাধিকারের প্রসার ও রক্ষায় খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারবে না। বরং তা দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাষ্ট্র ও সরকারের ইমেজ সংকট তৈরি করবে। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে আইন সংশোধনের মাধ্যমে কমিশনের সদস্য বাছাই প্রক্রিয়া উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক করা, মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কমিশনে প্রাধান্য দেওয়া, আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা প্রদান, কমিশনের অনুরোধের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও যথাযথ সাড়া প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা আবশ্যক। একই সঙ্গে কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য জাতিসংঘের বিভিন্ন মেকানিজম ও দেশীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সুপারিশগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া জরুরি।
মন্তব্য জানতে চাইলে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন যে অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তার সাথে বৈঠকের জন্য এনএইচআরসি থেকে কোনো চিঠির বিষয়ে তিনি অবগত নন। কোনো কিছু থাকলে সংশ্লিষ্ট সচিব জবাব দিতে পারেন। এ ব্যাপারে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামালের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা যায়নি।





