বাংলাদেশের ইতিহাসে লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের বিরল ঘটনায় এরই মধ্যে ৪১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। দগ্ধ অনেকে হাসপাতালে আছেন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। নিখোঁজদের সন্ধানে সুগন্ধার তীরে স্বজনদের আহাজারিও থামেনি। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজ ৫১ জনের একটি তালিকা তৈরি করেছে। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। দুর্ঘটনা এলাকার বাতাসে এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে পোড়া দেহের গন্ধ।
এরই মধ্যে ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ড ও ব্যাপক সংখ্যক হতাহতের ঘটনায় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। কীভাবে আগুন লাগলো, আগুন এত দ্রুত কীভাবে ছড়ালো, কৌতূহলী এসব প্রশ্নে পাওয়া যাচ্ছে নানান মত। তবে পরিবহন দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দুর্ঘটনার কারণ কী সেটা অনুসন্ধানে জানা যাবে। তবে লঞ্চের ইঞ্জিন রুমে থাকা খাবারের ক্যান্টিন নকশাবহির্ভূত ও ঝুঁকিপূর্ণ। নৌপথে যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বরাবরই অবহেলিত বলে মন্তব্য তাদের।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, আগুনের সূত্রপাত লঞ্চের ক্যান্টিনে থাকা এলপি গ্যাস সিলিন্ডার থেকে। লঞ্চটির এক কেবিন বয়ও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তবে ফায়ার সার্ভিস সংশ্লিষ্টরা এই ধারণার সাথে দ্বিমত করেছেন। আবার দুর্ঘটনা কবলিত লঞ্চ যাত্রীরা অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছেন লঞ্চের যান্ত্রিক ত্রুটির দিকে। কিন্তু যাত্রীদের এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন লঞ্চটির মালিকপক্ষ। তাদের দাবি, লঞ্চের দোতলায় কোনো কিছুর বিস্ফোরণ থেকেই আগুনের সূত্রপাত।
আগুনে পুড়ে যাওয়া অভিযান-১০ নামে তিন তলা লঞ্চটি এখন ঝালকাঠির দিয়াকুল এলাকায় সুগন্ধা নদীর তীরে ভেড়ানো রয়েছে।
ভয়ঙ্কর এই অগ্নিকাণ্ডকে ‘রহস্যজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, এভাবে আগুনটা ছড়িয়ে যাবে, আমার কাছে বিষয়টি অ্যাবনরমাল মনে হয়েছে। এভাবে আগে কখনো আগুন ধরেনি। আমাদের কাছে বিষয়টা ‘কনফিউজিং’।
কীভাবে ওই লঞ্চে আগুন লেগেছিল, সেই প্রশ্নের উত্তরে ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করা ঝালকাঠি ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার শফিকুল ইসলাম বলেছেন, লঞ্চের ইঞ্জিনরুমের অংশটি বেশি পুড়েছে। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা। যাত্রীদের অনেকেই আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগে বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়ার কথা বলেছেন। আব্দুর রহিম নামের এক যাত্রী বলেছেন, রাতে ডেক থেকে তিনি হঠাৎ বিকট শব্দ পান। তারপর দ্রুত আগুন গ্রাস করে ফেলে পুরো লঞ্চ। আতঙ্কিত হয়ে তিনি ডেক থেকে নদীতে লাফিয়ে পড়েন।
লঞ্চের মালিক হামজালাল শেখও বলেছেন, লঞ্চের কেরানী আনোয়ার ভোরে আগুন লাগার খবর দেওয়ার সময় ইঞ্জিনের একজস্ট পাইপের কাছে বিস্ফোরণের কথা তাকে জানিয়েছিলেন।
বেঁচে ফেরা যাত্রীদের মধ্যে যারা নিচের ডেকে ইঞ্জিন কক্ষের কাছাকাছি ছিলেন তাদের কয়েকজন বলেছেন, ঢাকা থেকে রওনা হওয়ার পরপরই ইঞ্জিনে গোলযোগ দেখা দেয়। সে কারণে কয়েকজন টেকনিশিয়ান কয়েক দফা সেটা সারানোর চেষ্টা করছিলেন। দুটি ইঞ্জিন চালিয়ে দ্রুত গতিতে ছোটানো হচ্ছিল লঞ্চ।
মো. আবদুল্লাহ নামের এক যাত্রী বলেছে, প্রচণ্ড গরম হয়ে উঠেছিল ইঞ্জিন কক্ষের আশপাশের এলাকা। তার ধারণা, তাপ বেড়ে গিয়েই ইঞ্জিনে আগুন লেগে থাকতে পারে। আগুন লাগার পর লঞ্চের কর্মীরা সেখান থেকে সরে পড়েন। তবে ইঞ্জিনে কোনো ত্রুটি ছিল না দাবি করে লঞ্চ মালিক হামজালাল শেখ বলেছেন, নতুন ইঞ্জিন লাগিয়ে চলতি মাসেই সার্ভিসে নামে তার লঞ্চ। দুটি রিকন্ডিশন্ড ডাইহাটসু ইঞ্জিন লঞ্চটিতে লাগানো হয়েছিল। ইঞ্জিনরুম বেশি পুড়েছে কারণ সেখানে ছিল ছয় হাজার লিটার তেল।
নিচের ডেকের ইঞ্জিন কক্ষের পাশেই ছিল লঞ্চের ক্যান্টিন। সেখানে গ্যাস সিলিন্ডার ‘বিস্ফোরিত হয়ে’ আগুন লেগেছে বলে এক কেবিন বয়। ওই কেবিন বয় বলেছেন, বিকট শব্দে সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুন ধরে যায় এবং তা দ্রুত ইঞ্জিনরুমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে রাখা ১৩ ব্যারেল ডিজেল আগুন বাড়িয়ে দেয়।
তবে সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হওয়ার ধারণা সঠিক নয় বলে মনে করছেন ফায়ার সার্ভিসের বরিশাল বিভাগীয় প্রধান মো.কামাল হোসেন। তিনি বলেন, এই তথ্য সত্য নয়। আমি নিজেই ইঞ্জিন কক্ষের কাছে দুটি গ্যাস সিলিন্ডার অক্ষত অবস্থায় দেখেছি। সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কোনো চিহ্ন আমরা সেখানে দেখিনি।
তাহলে আগুন কেন এবং কীভাবে লাগল- সেই প্রশ্নে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসেইন বলেন, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ জানা যাবে। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণ করা হচ্ছে ইঞ্জিন কক্ষ থেকেই আগুনের সূত্রপাত।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের কথায় বিস্ফোরণের বিষয়টি এসেছে। এখন সেটা আগুন লাগার পর হয়েছে না আগে-তদন্ত না করে তা বলা সম্ভব না।
ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ ৪৭ জনের চিকিৎসা চলছে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তাদের চিকিৎসায় ঢাকা থেকে সাত সদস্যের টিম এবং বরিশালের অর্ধশতাধিক চিকিৎসক কাজ করছেন। গতকাল শনিবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, বরিশাল নদীবন্দর পার হওয়ার আগেই লঞ্চের দ্বিতীয় তলার ডেক গরম হয়ে যায়। এর ওপর বসা যাচ্ছিল না। বিষয়টি লঞ্চ স্টাফদের একাধিকবার জানানোর পর তারা কম্বল পেতে দেয়। এতেও কাজ হচ্ছিল না। বিষয়টিকে গুরুত্বই দেয়নি তারা। লঞ্চটি বরিশাল নৌবন্দরে নোঙর করলে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটতো না। যান্ত্রিক ত্রুট নিয়ে এভাবে কোনো লঞ্চ চলাচল করতে না পারে। লঞ্চ স্টাফদের কঠোর শাস্তির দাবি জানান চিকিৎসাধীন দগ্ধরা।
ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে যাত্রীবোঝাই লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। ঝালকাঠি সদর থানার ওসি খলিলুর রহমান জানান, শনিবার সকালে পোনাবালিয়া ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ জাহাঙ্গীর হোসেন এ মামলা দায়ের করেন।
এদিকে ঝালকাঠি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি লঞ্চের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজ ৫১ জনের একটি তালিকা তৈরি করেছে বলে জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আপাতত একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। চূড়ান্ত তালিকা বরগুনা জেলা প্রশাসন তৈরি করবে।
দেশে লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের বিরল এই ঘটনার তদন্তে শুক্রবার তদন্ত কমিটি করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এতে আহ্বায়ক করা হয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বন্দর) মো. তোফায়েল ইসলামকে। গতকাল শনিবার সকালে লঞ্চটি পরিদর্শনে যায় তদন্ত কমিটির সদস্যরা। তদন্ত কমিটির সদস্য ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. নাজমুল আলম বলেন, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আমরা পরিদর্শনে যাই। ইঞ্জিনরুমসহ পুরো লঞ্চটি দেখেছি আমরা। প্রত্যক্ষদর্শীসহ সংশ্লিষ্টদের সাথেও কথা বলেছি।
দেশের নৌপরিবহনে যাত্রীর নিরাপত্তার বিষয়টি ‘অত্যন্ত নাজুক’ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ। তার কথায়, আগুনের সূত্রপাত যে কোনোভাবে হতে পারে। তবে আগুন নির্বাপকসহ যাত্রীদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা লঞ্চগুলোয় থাকে কি না, সেটাই দেখার বিষয়। নৌপথে যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বরাবরই অবহেলিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন, যে কোনোভাবে আগুন লাগতে পারে। অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা থাকলে হয়তো আগুন নেভানো যেতো। অথচ আমাদের দেশের লঞ্চগুলোতে অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা একেবারেই অবহেলিত। আগুন লাগার পরে নেভানো বা এলার্ম দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল। কিন্তু নৌপরিবহনে যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত নাজুক। নিয়মিত লঞ্চে চেকিং, নিরাপত্তা ফিচারের কার্যকারিতা বা লাইফ গার্ড আছে কি না, সেগুলো মনিটরিং হয় না।
তিনি বলেন, লঞ্চে হাতেগোনা কয়েকটি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। তবে এত বড় আগুন লাগার ঘটনা এটাই প্রথম। কেন আগুন লাগলো সেটা ইনভেস্টিগেশনের ব্যাপার। তবে জানা গেছে, ইঞ্জিন রুমের সঙ্গে থাকা রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। প্রতিটি লঞ্চেই ইঞ্জিন রুমের সঙ্গে রান্নাঘর থাকে, টি স্টল থাকে। লোকজন সেখানে চা-সিগারেট খায়। অথচ সেই ইঞ্জিন রুমেই ডিজেল থাকে, দাহ্য পদার্থ থাকে। এতে ঝুঁকির ব্যাপারটা উপেক্ষিতই ছিল। সে কারণেই হয়তো এত বড় একটা দুর্ঘটনা দেখতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ইঞ্জিন রুমের সঙ্গে ক্যান্টিন বা দাহ্য জিনিস রাখা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। মানে ডিজাইনে ত্রুটি। যেসব লঞ্চে এসব আছে, সেখানে অবশ্যই ডিজাইনে ত্রুটি আছে। সেগুলো দ্রুততম সময়ে ঠিক করতে হবে। কাজী সাইফুন নেওয়াজ মনে করেন, সুগন্ধায় এ দুর্ঘটনা আমাদের অনেক বড় মেসেজ দিয়ে গেলো। আগুন লাগলে কীভাবে বের হতে হবে, ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে কি না বা অগ্নিনিরাপত্তা আছে কি না, এ বিষয়গুলো এখনই কঠোর নজরদারিতে আনা দরকার।
ঢাকা থেকে বরগুনার বেতাগী রওনা হওয়া লঞ্চটিতে গত শুক্রবার ভোরে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে থাকা অবস্থায় আগুন লাগে। এতে অন্তত ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে ৩৩ জনের লাশ বরগুনায় দাফন করা হয়েছে।





