ইসরাইল-ফিলিস্তিন, যে সংঘাতের শেষ নেই

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

ইসরাইল-ফিলিস্তিন, যে সংঘাতের শেষ নেই

  • প্রকাশিত ২২ মে, ২০২১

মুশফিকুর রহমান ইমন

ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত বর্তমান সময়ের চলমান দীর্ঘতম সংঘাত। বিগত কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনসহ মধ্যপ্রাচ্যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আবারও তার পুনরাবৃত্তি ঘটল সমপ্রতি পূর্ব জেরুজালেমে আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে নিরীহ ও নিরস্ত্র প্রার্থনারত ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের পুলিশের বর্বরোচিত হামলার মাধ্যমে। হত্যা, রক্তপাত ও ধ্বংসযজ্ঞ প্রতিদিন রুটিন কর্মসূচি হিসেবে ইসরাইলিরা ঘটিয়ে চলেছে এবং আন্তর্জাতিক মহলের এ ব্যাপারে তেমন কোনো কার্যকরি পদক্ষেপ চোখে পড়ার মতো নয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হতেই পারে ফিলিস্তিনিদের বাঁচার অধিকার আজ ইসরাইলি আগ্রাসনের বাক্সে বন্দি! বিগত ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনি নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষের উপর নিপীড়ন ও গণহত্যার রক্তাক্ত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি প্রশ্নই ঘুরেফিরে বিশ্বের সকল শান্তিকামী মানুষের মধ্যে উদয় হয়— মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান কোথায়?

ইসরাইলিদের ফিলিস্তিনে ভূমি দখল এখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ইসরাইল আর ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘ আট দশকের এই সংঘাতের অবসান না হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে পশ্চিমা মোড়লদের নানা কূটকৌশল ও রাজনীতির দীর্ঘ কালো অধ্যায়। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের যে প্রস্তাব অনুসারে ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, সেই একই প্রস্তাব অনুসারে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রেরও প্রতিষ্ঠা পাওয়ার কথা ছিল। দীর্ঘ আট দশক পরে ইসরাইল এখন বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর দেশ। কিন্তু ফিলিস্তিনবাসীর জন্য স্বাধীনতার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করে একটি ইহুদি রাষ্ট্র ও অন্যটি আরব রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। অসম ও অন্যায্য এই যুক্তিতে আরবেরা সে সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। কিন্তু ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র ঘোষিত হলে এবং যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিশ্বের অনেক দেশ বিতর্কিত এই দেশকে স্বীকৃতি দিলে প্রতিবেশী চারটি আরব দেশ মিসর, সিরিয়া, জর্ডান ও ইরাক একযোগে ইসরাইলকে আক্রমণ করে। সেই যুদ্ধে আরবরা পরাজিত হয় এবং ইসরাইল জাতিসংঘ পরিকল্পনায় তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের ৫৬ শতাংশের জায়গায় মোট ৭৭ শতাংশ দখল করে নেয়। এরপর যে এক চিলতে জমি পড়ে ছিল, সেখানে স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠা করা যেত। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে মিসর ও জর্ডান তা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম গেল জর্ডানের কবলে, গাজার দখল নিল মিসর।

এরপর গত ৭০ বছরে আরব সাগর দিয়ে অনেক পানি বয়ে গেছে, তার চেয়েও বেশি গেছে ফিলিস্তিনিদের অশ্রু ও রক্ত। সুদীর্ঘ এই সময় থেকে আজ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে যে সংঘাত চলে আসছে, তার অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে মানা হয় যুক্তরাষ্ট্রকে। ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যান্ড বরাবরই ইসরাইল ঘেঁষা। এই দুই দেশ কৌশলগত মৈত্রীতে আবদ্ধ। এই দুই দেশে সরকার বদল হয়, নতুন নেতা আসেন; কিন্তু তাদের কৌশলগত আঁতাতের কোনো পরিবর্তন হয় না। যুক্তরাষ্ট্র বরাবর নিজেকে মধ্যপ্রাচ্য সমস্যার নিরপেক্ষ ‘সমঝোতাকারী’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করে থাকলেও স্বার্থের দ্বন্দ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কখনোই ইসরাইলের বিপক্ষে যায়নি। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই একপেশে নীতি তার নিজের জাতীয় স্বার্থবিরোধী। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী বব গেইটস সরাসরিই বলেছেন, বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের মধ্যে মার্কিনবিরোধী যে মনোভাব, তার পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি। কয়েক বছর আগে ট্রাম্প মুখে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল-ফিলিস্তিনের মধ্যে মহান শান্তি চুক্তি করাতে চায়। অথচ কাজটা ঠিক উল্টো। জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি সেই বিপরীত মনোভাবই স্পষ্ট করে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও ইতোমধ্যে পরোক্ষভাবে ইসরাইলের হামলার সমর্থন জুগিয়েছেন এবং ইসরাইলের এই আগ্রাসনকে তাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় বলে সাফাইও গেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইসরাইলকে প্রতি বছর তিন বিলিয়ন ডলার সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে থাকে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে যেকোনো মুভমেন্ট ঠেকাতেও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সহায়তা করেছে এমন অভিযোগ পুরনো।

অন্যদিকে ফিলিস্তিনের পক্ষে খোলাখুলি সমর্থন জোগানোর মতো একটি বৃহৎ শক্তিও নেই। ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস একসময় মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। কিন্তু মিশরের সেনাবাহিনী ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর সেখান থেকে হামাস আর কোনো সমর্থন পায় না। হামাসের প্রধান পৃষ্ঠপোষক এখন সিরিয়া, ইরান এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ গোষ্ঠী। ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতিশীল বিশ্বের আরো অনেক দেশ। কিন্তু এই সহানুভূতি কাজে পরিণত হয় কম। ফলে দশকের পর দশক ধরে চলতে থাকা এই সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফিলিস্তিনের নিরীহ বেসামরিক মানুষ, যাদের মধ্যে বড় সংখ্যক শিশু ও নারী। বিশ্বমানবতার ধোঁয়া তোলা রাষ্ট্রগুলোর কাছে এগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘন কি-না তা আজ পুরো বিশ্বই জানতে চায়।

দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এই দ্বন্দ্বের নেপথ্যে বেশকিছু সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে যেগুলো প্রত্যক্ষভাবেই এই সংঘাতের অবসানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তা হলো— একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিলম্ব, পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি নির্মাণ অব্যাহত রাখা এবং ফিলিস্তিনি ও ইহুদি এলাকার মধ্যে নিরাপত্তা প্রাচীর তৈরি করা। এই সংঘাতের অবসানের পথ খুঁজে পেতে ফিলিস্তিনি এবং ইসরাইলিদের মধ্য বিরোধের মূল বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। প্রথমত, ইসরাইল দাবি করে জেরুজালেমের ওপর তাদের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে তারা পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নিয়েছিল। এরপর থেকে তারা জেরুজালেমকে তাদের রাজধানী বলে গণ্য করে। কিন্তু এর কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা পূর্ব জেরুজালেমকে তাদের রাজধানী হিসেবে চায়। দ্বিতীয়ত, ফিলিস্তিনিরা চায় ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের আগে যে সীমান্ত ছিল, সেই সীমানার ভিত্তিতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠিত হবে। ইসরাইল এটা মানতে নারাজ। তৃতীয়ত, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরাইল যেসব ফিলিস্তিনি এলাকা দখল করে নিয়েছিল, সেখানে তারা অনেক ইহুদি বসতি গড়ে তুলেছে। বস্তুতপক্ষে এগুলো সবই ছিল জবরদখল ও ফিলিস্তিনিদের অবৈধভাবে উচ্ছেদ করার মাধ্যমে দখল করা এলাকা। আন্তর্জাতিক আইনে এসব বসতি অবৈধ। কেবল পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমেই এখন বসতি গেড়েছে পাঁচ লাখের বেশি ইহুদি। ফলে দখল করা এই এলাকা তারা ছেড়ে দিতে নারাজ।

এছাড়া ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখান থেকে উচ্ছেদ করা লাখ লাখ ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল। এরা ইসরাইলের ভেতর তাদের বাড়িঘরে ফিরে যাওয়ার অধিকার দাবি করে আসছে। পিএলও’র হিসেবে এসব ফিলিস্তিনি এবং তাদের বংশধরদের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ছয় লাখ। কিন্তু ইসরাইল এই অধিকারের স্বীকৃতি দিতে চায় না। তাদের আশঙ্কা, এত বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি যদি ইসরাইলে ফিরে আসে, তাদের রাষ্ট্রের ইহুদি চরিত্র আর ধরে রাখা যাবে না। এছাড়াও ধর্মীয় ভাবপ্রবণতা থেকেও সংঘাতের প্রবণতা রয়ে গেছে। জেরুজালেম শহর ঘিরে আছে খ্রিস্টান, ইহুদি আর মুসলিম-তিন ধর্মাবলম্বীদেরই তীর্থস্থান। এই পবিত্র ভূমি নিয়ে সংঘাতের পেছনের কারণ— কারা এর আসল মালিক? হিব্রু বাইবেল অনুযায়ী ইহুদিদের দাবি সেই প্রাচীনকালেই তারা এখানে ছিল, মাঝে অন্যত্র নির্বাসিত হলেও এ জায়গার আসল অধিকার তাদেরই। কিন্তু তাদের সেই ধর্মগ্রন্থমতেই ফিলিস্তিনিরা আগে থেকেই এ অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দা। তাই ইহুদিদের এখানে উড়ে এসে জুড়ে বসা ব্যাপারটা এই অঞ্চলের মুসলিমরা মেনে নিতে রাজি নয়।

ফিলিস্তিনিদের ওপর অবিরাম চলতে থাকা হামলাগুলো বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়ে যায়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক হওয়া আল-আকসা মসজিদে হামলাগুলো। তাই এখনই সময় কীভাবে দুপক্ষের মধ্যে টেকসই শান্তি বজায় রাখা যায় এটা নিয়ে বিশ্বনেতাদের ভাবার। এজন্যে প্রথমেই ইসরাইলকে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকার করে নিতে হবে। গাজার ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিতে হবে। পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের চলাফেরার ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নিতে হবে। অন্যদিকে ইসরাইলের দাবি হচ্ছে, এজন্য আগে সব ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীকে সহিংসতার পথ ত্যাগ করতে হবে এবং রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে হবে। এসব প্রশ্নেও দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার দরকার হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অনেক কিছু্ই বদলে গেছে। বিশেষ করে আরব এবং ইসরাইলিদের মধ্যে অনেক যুদ্ধের পর বিরোধপূর্ণ অঞ্চলগুলোর চেহারাই পাল্টে গেছে। সুতরাং বর্তমান বাস্তবতার ভিত্তিতেই এই সংকটের সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে বিশ্বনেতাদের। তবে সবচেয়ে জটিল বিষয় মনে হয় জেরুজালেম নগরীর প্রতীকী গুরুত্ব। এই বিরোধের নিরসন ছাড়া হয়তো একটা চূড়ান্ত সমাধান কোনোদিনই সম্ভব হবে না। ফলে অদূর ভবিষ্যতে এ দ্বৈরথ মিটে যাওয়ার কোনো ক্ষীণ আশা আদৌ দেখা যাবে কি-না তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads