বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নানান সমস্যার সমাধান ও তাদের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির নিমিত্তে জাতিসংঘ ১৯৯৪ সাল থেকে ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করে আসছে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বসবাসরত আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং ভিন্ন সামাজিক ব্যবস্থা আছে। উচ্চশিক্ষায় আদিবাসী শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়া, সরকারি সহযোগিতা, সংকটসহ নানান বিষয়ে দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মতামত তুলে ধরেছেন- আর এস মাহমুদ হাসান
ভ্রান্ত ধারণার অবসান জরুরি
বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় আদিবাসী শিক্ষার্থীরা মোটামুটি ভালো অবস্থানে যাচ্ছে। স্কলারশিপ নিয়ে বাইরের দেশেও পড়তে যাচ্ছে। তবুও উচ্চশিক্ষা অর্জনে আদিবাসী শিক্ষার্থীরা নানারকম অসুবিধার সম্মুখীন হয়। যেমন চেহারার গড়ন, কথাবার্তা, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদির কারণে সব জায়গায় হেনস্তার শিকার হতে হয়। এমনকি নিজ বন্ধু, বান্ধবীরাই এসব নিয়ে হাসি-ঠাট্টা, ব্যঙ্গ করে। এসব থেকে উত্তরণের জন্য আদিবাসী সম্পর্কে যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে সেগুলো দূর করা জরুরি। উচ্চশিক্ষা গ্রহণে অন্যতম একটি সমস্যা গাইডলাইনের অভাব। পাহাড়ি এমন অনেক এলাকা আছে যেখানে উচ্চশিক্ষা নিয়ে বলার মতো মানুষ নেই। আবার এমনও এলাকা আছে যেখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনার্স, মাস্টার্স করার সুযোগ থাকলেও পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবে উচ্চশিক্ষার মতো অতীব জরুরি বিষয় থেকে আদিবাসী শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে। তবে আশার বিষয় হলো, প্রতি বছর বিভিন্ন মাধ্যম থেকে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সহায়ক হিসেবে উপবৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। কমবেশি সকল আদিবাসী শিক্ষার্থীই চায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ পেতে। এক্ষেত্রে তাদের যে ভিত্তি সেগুলো যদি আরো শক্ত করা যায় সেক্ষেত্রে তারা অনেক বেশি সফলতা লাভ করতে পারবে।
সজীব তনচংগ্যা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
মাতৃভাষায় লেখাপড়া করার সুযোগ নেই
প্রান্তিক অঞ্চলে বসবাস করাসহ নানাবিধ কারণে আদিবাসী জনগোষ্ঠী এখনো বিভিন্ন মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। এর মধ্যে অন্যতম তাদের মাতৃভাষায় লেখাপড়া করার সুযোগ নেই। শিক্ষার প্রধানতম মাধ্যম হলো ভাষা। শিক্ষাজীবনের শুরুতে শিক্ষার্থীদের দুর্বোধ্য ভাষায় পড়াশোনা করতে হওয়ায় তা সহজে বোধগম্য হয় না। এতে করে তাদের মানসিক বিকাশে বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি স্কুলের প্রতি এক ধরনের অনীহা তৈরি হয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভাষাগত সমস্যার কারণে আদিবাসী শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার হার ৬০ শতাংশের ঊর্ধ্বে। আদিবাসীদের সম্পর্কে বিদ্যমান সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও তাদের শিক্ষালাভের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন তাদের নিচু জাতের মানুষ মনে করা, তাদের সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস নিয়ে কটাক্ষ করা ইত্যাদি। আবার নিরাপত্তাহীনতাও আদিবাসী শিক্ষার্থীদের একটি অন্যতম অনুষঙ্গ। শিক্ষা অবকাঠামোগুলো আদিবাসীদের বসতবাড়ি থেকে দূরে হওয়ায় শিক্ষার্থীরা (বিশেষ করে শিশু ও উঠতি বয়সের মেয়েরা) নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। ইউনেস্কো ২০০৩-এর এক প্রতিবেদনে বলেছে, যাদের মাতৃভাষা জাতীয় বা স্থানীয় ভাষা থেকে ভিন্ন তারা শিক্ষা ব্যাবস্থায় অনেকটা সুবিধাবঞ্চিত থাকে। বাংলাদেশের আদিবাসীদের ক্ষেত্রে এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই।
বিদুষী চাকমা, গণবিশ্ববিদ্যালয়
অনেকেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না
উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পূর্বে সর্বপ্রথমে তার আগের ধাপগুলোর দিকে নজর দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। পার্বত্য অঞ্চলের সকল স্তরের শিক্ষাব্যবস্থার মান বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষ মেধাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ ও আধুনিক যুগোপযোগী বইসমৃদ্ধ পাঠাগার গড়ে তোলা দরকার। দেশের অন্যান্য এলাকার শিক্ষার্থীদের তুলনায় এই অঞ্চলের আদিবাসী শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি জটিল সমস্যার সম্মুখীন হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারে না। তবে ভর্তি ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সরকার কর্তৃক একটা আলাদা সুবিধা দেওয়ার ফলে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে এখন বেশ কিছু শিক্ষার্থী লক্ষ্য করা যায় তবে তা যথেষ্ট পরিমাণে নয়। সর্বোপরি, পিছিয়ে পড়া শিক্ষাব্যবস্থার শিকার, সঠিক সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাব ও নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থার ফলে ইচ্ছা এবং মেধা থাকা সত্ত্বেও এই অঞ্চলের অনেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে না। পিছিয়ে পড়া অনুন্নত শিক্ষাব্যবস্থা ও জীবনযাত্রার কথা মাথায় রেখে দেশের নীতি নির্ধারকদের উচিত মূল সহযোগী হিসেবে ভুমিকা পালন করা। এতে দেশের উন্নয়নে সকলের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পাবে।
জুনি চাকমা, বশেমুরবিপ্রবি
মানসম্মত স্কুল-কলেজের সংখ্যা নগণ্য
শিক্ষার ভিত্তি গড়ে উঠে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকেই। সেক্ষেত্রে পার্বত্য চট্রগ্রামে শিক্ষা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল, যার কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণের আগেই ঝড়ে পড়ে। যারা একটু আর্থিকভাবে স্বচ্ছল তারা ঢাকা বা চট্টগ্রামে এসে পড়াশোনা করে। তারাই পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়। সরকার অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য যে কোটার ব্যবস্থা করেছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হওয়ায় সবাই সে সুযোগ নিতে পারে না। এই অবস্থা থেকে মুক্ত হতে হলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে মানসম্মত স্কুল কলেজের সংখ্যা খুবই নগণ্য, যা আদিবাসী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। এছাড়া এ অঞ্চলের মানুষের আর্থিক অবস্থা নাজুক হওয়ায় অনেকে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত। সরকারের কোটা ব্যবস্থা আদিবাসীদের উপকারে আসে যার কারণে আদিবাসীরা উপকৃত হচ্ছে এবং সরকার এ কাজের জন্য সাধুবাদের দাবিদার। আদিবাসী শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সরকারি সহযোগিতা পেয়ে থাকে। যেমন শিক্ষাবৃত্তি, সাইকেল বিতরণ ইত্যাদি। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহ বাড়ে এবং তারা ভালো ফলাফলের মাধ্যমে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়।
প্রসেনজিত চাকমা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়





