উপকূলীয় জনজীবনের দুর্ভোগ কমাতে হবে

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

উপকূলীয় জনজীবনের দুর্ভোগ কমাতে হবে

  • প্রকাশিত ২ জুন, ২০২১

সিরাজুল ইসলাম সোহাগ

বাংলাদেশের মোট আয়তন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ৪৭ হাজার ২১১ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে উপকূলীয় অঞ্চল। সংখ্যাতাত্ত্বিক দিক থেকে যা দেশের এক-তৃতীয়াংশ। বাংলাদেশের জল জীবন ও জলাভূমির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে পুরো দেশের সামগ্রিক অংশ সমভাবে গুরুত্ব বহন করলেও উপকূলীয় অঞ্চল অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে গোটা বাংলাদেশ দুর্যোগের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করলেও ভূতাত্ত্বিক অবস্থান হেতু এসব দুর্ভোগ-দুর্যোগ সবার আগে মোকাবিলা করে উপকূলীয় অঞ্চলের জনজীবন। দেশের অন্যান্য অংশের মতো নদীভাঙন, বন্যা, খরা ভোগ করলেও অতিরিক্ত বিপর্যয়কারী হিসেবে নেমে আসে জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো তাণ্ডব সৃষ্টিকারী দুর্যোগ। একটির ঝক্কি-ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই চলে আসে আরেকটি ঝড়-ঝঞ্ঝা। জোয়ারে প্লাবন আসবে, ভাটায় নেমে যাবে। ভারী বর্ষণে উজান থেকে তীব্রবেগে ছুটে আসবে গ্যালন গ্যালন পানি, ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সর্বস্ব। অতঃপর কিছুদিন বাদে নদী অববাহিকা মিশিয়ে সাগরে শান্তভাবে মিশে যাবে। আর বন্যাপরবর্তী লবণাক্ততার দরুন কৃষিজমির ক্ষতি তো লেগেই আছে। কয়েক মাস আগে ঘটা আম্পানের আগেও তারা মুখোমুখি হয়েছে সিডর, আইলা, রোয়ানু, মহাসেনের মতো প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের। প্রতিবার আসে ধ্বংস করে দিয়ে যায় বসতভিটা, ঘরবাড়ি এবং সর্বোপরি সাজানো-গোছানো সংসার।

গতবছর ঠিক এই সময়েই উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হেনেছিল ঘূর্ণিঝড় আম্পান। আম্পানের প্রভাব ছিল ভয়াবহ। উপকূলবাসী আজো ভয়ে আঁতকে ওঠে সেসব দুর্বিষহ দিনের স্মৃতিচারণ করে। এখনো বুকফাটা কান্না পায় সেসব নিদারুণ কষ্টের দিনের কথা ভেবে। জলোচ্ছ্বাসে ডুবে যাওয়া বসতভিটা ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিলেও খাবারের কষ্টে দিনযাপন করতে হয়েছে। বসতভিটাসহ গবাদি পশু ও আবাদি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথে বসতে হয়েছে বহু পরিবারকে। জীবন বাঁচিয়ে রাখতে জল, জীবন ও জলাভূমির সঙ্গে যেন রীতিমতো যুদ্ধ। যে যুদ্ধে বরাবরই তারা নিঃস্ব কিন্তু হেরে যাওয়ার নয়। হার মানতে রাজি নয় এসব সহজাত প্রকৃতি-যোদ্ধা। কারণ তারা বুঝে গেছে এসব দুর্যোগ-দুর্ভোগ-দুর্বিপাক সঙ্গে নিয়েই তাদের জীবন। সমস্যার কথা জানতে চাইলে আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা উল্লেখ করলেও প্রায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চাওয়া— রিলিফ চাই না, চাই টেকসই বাঁধ। বহুবার পত্র-পত্রিকা মারফত জানতে পেরেছি, এসব জলবায়ু-যোদ্ধা বার বার রাস্তায় নেমেছে বাঁধের দাবিতে। জানিয়েছে উপকূল রক্ষাকারী বাঁধের দাবি। অনেকের হূদয় ছুঁয়ে গেছে এসব মানুষের আকুতি। কিন্তু ছুঁতে পারেনি আমাদের নীতিনির্ধারকদের কৃত্রিম হাওয়ায় জুড়িয়ে থাকা হূদয়। প্রতিবছর ঝড়-ঝঞ্ঝা ও জলোচ্ছ্বাসের পর বিপর্যস্ত থমকে যাওয়া জনজীবনে গতি ফিরিয়ে আনতে কাজ করে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, তাদের কাজ শুধু সামাজিক নিরাপত্তা সুরক্ষা কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। উচ্চগতির পানি প্রবাহ রোধে যেসব বাঁধ কার্যকর তা নির্মাণ করা হচ্ছে না। হলেও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল ও যথাযথ সংস্কারের অভাবে কার্যকারিতা হারিয়ে এখন জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলছে।

ষাটের দশকে একাধিক বাঁধ নির্মাণ করা হলেও তা বার বার বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে এবং পুনঃসংস্কারের অভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে, সাইক্লোন আম্ফানের তাণ্ডবে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়িবাঁধ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে এখন এসব জীর্ণশীর্ণ বাঁধ ভেঙে ফসলের ক্ষেত, চিংড়ির ঘের, লোকালয়ে সর্বনাশা লবণাক্ত পানি অনায়াসেই ঢুকে পড়ে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের শেষ উপজেলা খুলনার কয়রা। প্রায় ২ লাখ জনঅধ্যুষিত অঞ্চলটি চারদিকে নদী দ্বারা বেষ্টিত। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ জনপদ টিকে ধরে রেখেছ। বেড়িবাঁধের নাজুক অবস্থা ভেবে সর্বদাই স্থানীয়দের তটস্থ থাকতে এই ভেবে- কখন জানি লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে! বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানির প্রবাহে জনপদ প্লাবিত হলেও গ্রীষ্ম মৌসুমেও মাঝেমধ্যে বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। কয়রায় শেষ প্রায় আট মাস আগে আম্ফানের প্রভাবে পানি ঢুকেছিল, সেই পানিবন্দি অভিজ্ঞতা অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে না হতেই ইয়াসের আগমন। এ আগমন আকস্মিক নয়। বিগত প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পূর্বাভাস কেন্দ্র থেকে বলা হচ্ছিল ইয়াসের বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য। দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ও মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি একটি অন্যতম বড় পর্যায়। কিন্তু যথাযথ তথ্য ও সতর্কতামূলক প্রচারণা থাকা সত্ত্বেও আমরা পূর্বপ্রস্তুতি নিতে পারেনি। স্থানীয় প্রশাসন ইয়াসের আগমনে এরূপ প্রতিকূল আবহাওয়ায় প্রবল স্রোতের বিপরীতে যে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, অনুকূল আবহাওয়ায় সেই কাজ করলে বেশি ফলপ্রসূ হতো।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলেই রয়েছে পাঁচ হাজার ৭৫৭ কিলোমিটার। কিন্তু এসব বাঁধ অনেক ক্ষেত্রেই ঝুঁকিপূর্ণ ও নিয়মিত তদারকির অভাব হেতু নাজুক অবস্থায় রয়েছে, যা উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবনকে বিপদাপন্ন করে তুলেছে। উল্লেখ্য, সরকারের তরফ থেকে একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। প্রতিটি দুর্যোগের পরই জোড়াতালি দেওয়া হলেও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে সাতক্ষীরা-খুলনা-বরিশাল হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকা চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। উপকূল সুরক্ষার প্রথম ও প্রধান শর্তই হলো সুরক্ষিত ও টেকসই বাঁধ ব্যবস্থাপনা। কিন্তু সমন্বিত কর্মসূচির আওতায় টেকসই বাঁধ ব্যবস্থাপনা যেন এখনো সুদূর পরাহত।

এখনো উপকূলীয় অঞ্চলের দুর্বল পয়েন্টগুলোতে বাঁধের বড্ড অভাব, যা জনপদে পানি প্রবেশের বড় পথ হিসেবে কাজ করছে। ফলস্বরূপ প্লাবিত হচ্ছে জনপদ, বয়ে নিয়ে আসছে দুর্ভোগ। মানববিধ্বংসী এসব ঝুঁকি এড়াতে আমাদের স্থানীয় জনজীবনের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। নির্মাণ করতে হবে নিচে ১০০ ফুট, ওপরে ৩০ ফুট এবং ৩০ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন শক্ত, স্থায়ী ও মজবুত বাঁধ, যা উপকূলবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। সঙ্গে স্থানীয় অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব ও প্রকৌশলীদের সঙ্গে আন্তঃসমন্বয় করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক রাখতে ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বিঘ্ন ঘটবে না। আমাদের মনে রাখা দরকার স্বল্পমেয়াদি অদূরদর্শী কোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে উপকূলীয় জনজীবনে স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনা, উপকূলবাসীর চাক্রিক এই আর্তনাদ আহাজারি প্রশমন সম্ভব নয়। দুর্যোগের বিরূপ প্রভাব থেকে জীবন ও জীবিকা রক্ষায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সুসমন্বিত পরিকল্পনা।

 

লেখক : নিবন্ধকার

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads