জাতীয়

উৎকষ্ঠায় নাবিকদের পরিবার

  • ''
  • প্রকাশিত ১৪ মার্চ, ২০২৪

তরিকুল ইসলাম সুমন:

সোমালীয় জলদস্যুদের হাতে জিম্মি জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ এবং নাবিকদের উপকূলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জাহাজের নাবিকদের একটি রুমে আটকে রেখে কেড়ে নেওয়া হয়েছে যোগাযোগের মাধ্যম মোবাইল এবং ল্যাপটপ। তাদের মুক্তির জন্য ৫৫ লাখ ডলার বা ৫৫ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১১০ টাকা হিসেবে) দাবি করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, সোমালিয়ান জলদস্যুদের কবলে থাকা জাহাজের সঙ্গে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়নি। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

জলদস্যুরা ৫০ লাখ ডলার চেয়েছে, না হলে তাদের মেরে ফেলা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে স্বজনদের এমন দাবির প্রেক্ষিতে হাছান মাহমুদ বলেন, নাবিকদের ছাড়াতে মুক্তিপণ দেওয়া হবে কি না, কৌশলগত কারণে এখনই তা প্রকাশ করা হবে না। জাহাজ আটকের বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রিপরিষদে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিষয়টি অবগত রয়েছেন।

নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সোমালিয়ান দস্যুদের কবলে যে ২৩ জন নাবিক জিম্মি আছেন তাদের জীবন রক্ষা করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসা আমাদের প্রথম কাজ। আমরা সেটাই করার চেষ্টা করছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এটা নিয়ে কাজ করছে। যেসব জলদস্যু জাহাজকে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে এখন পর্যন্ত তাদের দখলেই আছে। ভারত সাগরে জাহাজটি আছে। সার্বক্ষণিক তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত আমাদের নাবিকরা নিরাপদে আছে। গতকাল যখন বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবহিত হই, তাৎক্ষণিকভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি। নৌবিভাগের সঙ্গে যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কাজ করে, তাদেরও জানানো হয়েছে। নৌবাহিনীর সঙ্গেও কথা হয়েছে। নৌবাহিনীর সঙ্গে অন্যান্য দেশের যোগসূত্র আছে। বিষয়টি সবাইকে অবহিত করেছি, জাহাজটি উদ্ধারের জন্য সবার সহযোগিতা কামনা করেছি।

তিনি বলেন, ২৩ নাবিককে নিরাপদে রাখা এবং তাদের জীবন রক্ষা করে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসার প্রতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এটিই আমাদের প্রথম কাজ। সেভাবে কাজ করছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মুক্তিপণ বা তাদের হত্যার হুমকির বিষয়ে কোনো সংবাদ আমাদের কাছে আসেনি। জলদস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগ করার সংগঠন আছে। তারা এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে পারেন। আমাদের সঙ্গে জলদস্যুদের যোগাযোগ নেই। আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের যোগাযোগ আছে।

গতকাল সকালে চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় অবস্থিত কবির গ্রুপের অফিস ছেলে সাজ্জাদকে উদ্ধারের আকুতি জানিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা মোহাম্মদ গাজু মিয়া। সাজ্জাদ তার মাকে জানিয়েছে, আম্মু, ওরা মোবাইল নিয়ে নিচ্ছে। এখনো ইফতার করি নাই। তারা খাবার দিলে ইফতার করব। কবির গ্রুপের চাচার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। যেভাবেই হোক, আমাদের ছাড়ানোর ব্যবস্থা করেন, আম্মু। এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের চতুর্থ প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ গতকাল মঙ্গলবার রাত আটটায় সর্বশেষ মুঠোফোনে মা জোছনা বেগমকে এই আকুতি জানিয়েছেন। ছেলের চিন্তায় জোছনা বেগম গতকাল সকালে ছুটে যান চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে কবির গ্রুপের কার্যালয়ে। সেখানেই কথা বলেন সাংবাদিকদের সঙ্গে। ছেলের চিন্তায় উৎকণ্ঠায় থাকা এই মা বারবার আকুতি জানাচ্ছেন যেভাবেই হোক তার ছেলেকে যেন ফিরিয়ে আনা হয়।

জোছনা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, মোবাইল কেড়ে নেওয়ার আগে ছেলের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা হয়। জাহাজটি সোমালিয়ার দিকে নিয়ে যাচ্ছে দস্যুরা। তবে তারা কারও গায়ে হাত তোলেনি। জাহাজে পানির পরিমাণ কম। নাবিকদের জন্য দোয়া করতে বলেছে।
জিম্মি জাহাজের নাবিকদের স্বজনেরা কবির গ্রুপের কার্যালয়ে ছুটে আসছেন। সেখানে কথা হয় একাধিক নাবিকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে।

জাহাজে জিম্মি নাবিক নূর উদ্দিনের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস থাকেন চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার লিচুতলা এলাকায়, আড়াই বছরের সন্তানকে রেখে স্বামীর খোঁজ নিতে এসেছেন। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শেষ কথা হয় স্বামী নূর উদ্দিনের সঙ্গে। তখন জানিয়েছিলেন তাদের জাহাজ সোমালিয়ার উপকূলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে দস্যুরা। জাহাজে তখন ৫০ জনের মতো জলদস্যু ছিল। সবার হাতে ছিল অস্ত্রশস্ত্র। পরে একটি অডিও বার্তা পাঠায় নূর উদ্দিন। অডিও বার্তায় শোনা যায়, ফাইনাল কথা, এখানে টাকা না দিলে একজন একজন করে মেরে ফেলবে বলছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আমরা টাকা পয়সা, চাকরি কিচ্ছু চাই না। সরকারের কাছে আবেদন, যেন সবাইকে সুস্থভাবে ফেরত দেওয়া হয়। আমরা তাদের সুস্থভাবে ফেরত চাই।

জিম্মি জাহাজের নাবিক শফিকুল ইসলামের স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। ভাইয়ের খোঁজ নিতে ছুটে আসেন বড় ভাই দিদারুল আলম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, শফিকুল ইসলামের স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। গত মঙ্গলবার মুঠোফোনে কথা হলে শুধু টেনশন না করতে বলেছেন।

নাবিক আইনুল হকের মা লুৎফে আরা বেগম এক সন্তানকে নিয়ে গতকাল সকালে ছুটে যান কবির গ্রুপের কার্যালয়ে। আইনুল হকের মায়ের আকুতি, ‘যেভাবেই হোক আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিন।’

খুলনা মহানগরীর ছোটবয়রা করীমনগর এলাকার বাসিন্দা ও জাহাজের সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার তৌফিকুল ইসলামের বাড়িতেও উৎকণ্ঠায় রয়েছে পরিবারের সদস্যরা। ইঞ্জিনিয়ার তৌফিকুল ইসলামের স্ত্রী জোবায়দা নোমান বলেন, শেষ কথা হয়েছে মঙ্গলবার বিকালে। তিনি ফোনে বলেছেন, দোয়া করো। আমাদের সোমালিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে, হয়তো আর যোগাযোগ হবে না। কী হবে কিছুই তো আসলে জানি না। এটাই শেষ কথা। এরপরে আর কথা হয়নি।

তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রাম থেকে ইফতেখার স্যার ফোন করে পরিবার থেকে লোক পাঠাতে বলেছিলেন। আমার মেজ ভাসুর এবং আমার ভাই দুজন চট্টগ্রাম গিয়েছেন। আমাদের দাবি একটাই সব কিছুর বিনিময়ে হলেও সে আমাদের মাঝে ফিরে আসুক। তার সহকর্মীরাও আল্লাহর রহমতে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসুক।

কবির গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে জাহাজের নাবিকদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা সুস্থ আছেন। নিরাপদ আছেন। জাহাজ এখন সোমালিয়া উপকূলের দিকে যাচ্ছে। পুরোপুরি দস্যুদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দস্যুরা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নেওয়ার পর তাদের দাবি আমাদের কাছে জানাবে। এখন পর্যন্ত যোগাযোগ হয়নি। তবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। নাবিকদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএমওএ) সূত্র জানিয়েছে, একটি বিদেশি সংস্থার সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রতি ৬ ঘণ্টা পরপর জাহাজ সম্পের্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করবে। তবে এ বিষয়ে বিএমএমওএ-এর সাধারণ সম্পাদক মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মো. সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, এখন পর্যন্ত জলদস্যুদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ৫০ লাখ মার্কিন ডলার মুক্তিপণ চাওয়া বা দাবির বিষয়টিও নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।

জাহাজের অবস্থান শনাক্তকারী ওয়েবসাইট মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৯ দশমিক ৯৩ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩২ দশমিক ২৬ মিটার প্রস্থের জাহাজটি বাল্ক কেরিয়ার। এটি আফ্রিকার মোজাম্বিকের মাপুটো বন্দর থেকে ছেড়ে আসে। ১৯ মার্চ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়াহ বন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল। এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে সোমালীয় জলদস্যুদের কবলে পরে। এর আগে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে আরব সাগরে সোমালি দস্যুদের কবলে পড়েছিল বাংলাদেশি একই প্রতিষ্ঠানের আর একটি জাহাজ এমভি জাহান মণি। ওই সময় জাহাজের ২৫ নাবিক এবং প্রধান প্রকৌশলীর স্ত্রীকে জিম্মি করা হয়। নানাভাবে ১০০ দিনের চেষ্টায় দস্যুদের কবল থেকে মুক্তি পান তারা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads