মুক্তমত

উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে হবে

  • প্রকাশিত ১৮ ডিসেম্বর, ২০২০

রেজাউল করিম খোকন

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমৃদ্ধিশালী উন্নত জাতি গঠনে রেখে গেছেন অনন্য অর্থনৈতিক দর্শন। রক্তে ভেজা সংবিধানেই স্থান দিয়েছেন দারিদ্র্য মুক্তির পথনির্দেশনা। শত শত বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক-সামাজিক বৈষম্য দূর করে শোষণমুক্ত সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়তে বাস্তবমুখী নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দারিদ্র্য দূরীকরণের লড়াইকে তিনি অল্প সময়ের মধ্যে বেশ এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় আমূল সংস্কার, শিল্প বিকাশে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ, বন্ধ শিল্প-কারখানা দ্রুত চালুকরণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা প্রদান, কৃষির আধুনিকায়নে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ, সমবায় চেতনার বিকাশসহ নানামুখী কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই। তার সকল পদক্ষেপ ও পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল দেশের দ্রুত উন্নয়ন, যার মাধ্যমে স্বপ্নের সোনার বাংলা যেন বাস্তবে রূপ পায়। দেশজুড়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সকলের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া, মানসম্পন্ন কারিগরি শিক্ষার বিকাশ, নারী জাগরণ, অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্তকরণ, সম্পদের সুষম ব্যবহার ও বণ্টন ইত্যাদির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অনেক বাস্তবমুখী কর্মসূচি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের হাল ধরার পরপরই। স্বাধীন বাংলাদেশে শহর বন্দর গ্রামজুড়ে যেখানেই গেছেন সাধারণ মানুষের কাছাকাছি গিয়ে তাদের দুঃখকষ্ট, সমস্যা, সংকটের কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় অগ্রগতির ধারাকে বেগবান করার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কল-কারখানায়, মাঠে-ঘাটে, ক্ষেতে-খামারে উৎপাদন বৃদ্ধির নানা কলাকৌশল প্রয়োগে জোর দিয়েছেন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিকে গড়ে তুলতে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, মাত্রা ও প্রকৃতি নির্ধারণ করেছিলেন প্রথমে। এরপর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাটি ও মানুষের সমন্বিত অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈপ্লবিক নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। দীর্ঘদিনের শোষণ, বঞ্চনা আর বৈষম্যের শিকার বাংলাদেশের সামগ্রিক চেহারা পাল্টে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির যুগোপযোগী কর্মসূচি চালু করেছিলেন। তৃণমূল পর্যায়ে শ্রমঘন শিল্পায়নের ধারা বেগবান করে টেকসই ও সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে দেশকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সামাজিক রূপান্তর আজ গোটা বিশ্বে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে যে বাংলাদেশকে একটি সময়ে তলাবিহীন ঝুড়ি আখ্যা দিয়ে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছিল আন্তর্জাতিক একটি মহল, তারাও আজ বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া দেখে বিস্ময় প্রকাশ করছে, এখানকার উন্নয়ন কৌশলের প্রশংসা করছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালেই জাতিসংঘের স্বপ্লোন্নত (এলডিসি) দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছিল। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছে। ২০১৮ সালে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকার ওপরে স্থান দিয়েছে। জাতিসংঘের এই মর্যাদা ঘোষণার ফলে উন্নয়নশীল দেশের পথে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশ। পঞ্চাশ বছর আগেই বঙ্গবন্ধু উন্নয়নের যে নতুন চিন্তাধারার সূচনা করেছিলেন তা এখনো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কিষান-কিষানির ঘাম ঝরানো উদয়াস্ত খাটুনি, কৃষি বিজ্ঞানীদের প্রাজ্ঞ প্রশংসনীয় গবেষণা এবং সরকারের অবিশ্বাস্য উপাদান ভর্তুকিসহ সংবেদনশীল ও কার্যকর নীতি কৌশলের ফলে কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

জাতীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করার অন্যতম পথ অর্থনীতির প্রতিটি খাতের কর্মকাণ্ডে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা। বর্তমান বিশ্বে সকল প্রগতিশীল রাষ্ট্র ব্যবস্থায় উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন কার্যক্রমকে জাতীয় আন্দোলন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় শিল্পনীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদনশীলতা কার্যক্রমকে ধারাবাহিক ও পদ্ধতিগতভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সৃষ্টি করা হচ্ছে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিক প্রেক্ষাপটে বলা যায়, অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিল্পায়নের যেমন কোনো বিকল্প নেই একইভাবে সুষ্ঠু শিল্পায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উৎপাদনশীলতা উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। শিল্প বিকাশের জন্য যেমন নতুন শিল্পকারখানা সৃষ্টির প্রয়োজন তেমনিভাবে এ সকল কারখানায় দক্ষতা ও মুনাফা বৃদ্ধি করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিও একান্তভাবে অপরিহার্য।

এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে তৈরি পোশাক শিল্প। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে উজ্জ্বল অবস্থানে পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশে প্রস্তুত বিভিন্ন শিল্পজাত সামগ্রী, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, ওষুধ পৃথিবীর অনেক দেশে যাচ্ছে। প্রযুক্তির নানা বিকাশ, শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির রাজত্ব গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক কাঠামোয় এনেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। এখন বিশ্বব্যাপী কারিগরি জ্ঞানের কদর খুব সহজেই চোখে পড়ে। বিদেশে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এক কোটিরও বেশি মানুষ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। জনশক্তি রপ্তানি খাত থেকে বর্তমানে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে তা আরো কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। আমাদের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা প্রয়োজন দেশের কলকারখানায়, শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানে, কৃষি খামারে, কৃষি জমিতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনশক্তির বিকল্প নেই। সরকার দেশব্যাপী কারিগরি শিক্ষালাভের জন্য অনেক ইনস্টিটিউট, ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছে।

করোনার ভয়াবহ প্রকোপে গোটা বিশ্বে এক ধরনের অচলাবস্থা, স্থবিরতা নেমে এসেছে। গোটা বিশ্ব চরম এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। করোনার কারণে বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থনীতিতে নেমে এসেছে স্থবিরতা। করোনার কারণে এখানেও শিল্প কলকারখানার উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকলেও আবার সব সচল হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। কৃষি, শিল্প, সেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিটি ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সোনার বাংলা বিনির্মাণে দেশের সব মানুষকে দলমত নির্বিশেষে সচেষ্ট এবং সক্রিয় হতে হবে।

 

লেখক :  সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads