একটি যুদ্ধ কী ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে তার বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এই বিশ্ব। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা পৃথিবীতে নতুন নয় কিন্তু যুদ্ধের ফলে পৃথিবীজুড়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে তার অভিজ্ঞতা একটু নতুনই বলতে হবে। কারণ হলো, করোনাভাইরাসের মতো একটি অতিমারি পার দিয়েই এভাবে যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয়নি। এখন একইসাথে পৃথিবীকে যুদ্ধের সংকট এবং করোনাভাইরাসে প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের মেরামত করতে হচ্ছে। রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পরপর জ্বালানি তেলের মূল্য বিশ্ববাজারে রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে আনছে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাবে দরিদ্র দেশগুলোই বেশি ভুগছে বলে। এর ফলে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন,খাদ্য সংকট এবং ভয়াবহ মূল্যস্ফীতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। শ্রীলংকার মতো করুণ পরিণতি বরণের আশঙ্কায় রয়েছে আরও বেশ কিছু দেশ এমন আভাসই রয়েছে। শ্রীলঙ্কার সংকট তৈরি হয়েছে অর্থনীতি থেকে আর সেখান থেকে রাজনৈতিক সংকট এবং অতঃপর দীর্ঘদিনের শাসক গোষ্ঠীর ভয়াবহ পরিণতি। এনডিটিভির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে- শ্রীলঙ্কা, লেবানন, রাশিয়া, সুরিনাম ও জাম্বিয়া এরই মধ্যে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে। বেলারুশসহ আরো কিছু রাষ্ট্র সে পথে হাঁটছে। এছাড়া সংকটের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে আর্জেন্টিনা, পাকিস্তান, ইউক্রেন, বেলারুশ, তিউনিশিয়া, ঘানা, মিশর, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, ইথিওপিয়া, ইকুয়েডর এবং এল সালভাদর। এমন তথ্যই গণমাধ্যম থেকে জানা গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এমন ভবিষ্যত এড়াতে কি করণীয় হবে? রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্ব এক ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে থাকে। দ্রব্যমূল্যের অপর্যাপ্ততা, মূল্যবৃদ্ধি এবং অতীতের তুলনায় ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি পৃথিবীকে গ্রাস করতে শুরু করে। টানা দুই বছর করোনায় বিপর্যস্ত উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থা আরো বড় ধাক্কা খায় চলতি বছরে এসে। যদিও করোনা প্রায় থেমে যায় কিন্তু যুদ্ধ সেই মন্দার গতিকে আরো বাড়িয়ে দেয়। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে বিশ্ব এখন রীতিমতো নাকাল হওয়ার অবস্থায়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোও এর প্রভাবে ব্যাপকভাবে ভুগছে। এর মধ্যেই যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ফলে খুব দ্রুতই যে এই সমস্যার সমাধান হবে সেটাও আশা করা যায় না।
দেশে দেশে জ্বালানি সংকট এখনই এত তীব্র হয়েছে যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে নানা পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে বিভিন্ন দেশ। পৃথিবীর উন্নত দেশ জাপানেও যুদ্ধের আঁচ লেগেছে। সেখানে বর্তমানে খাদ্যপণ্যের মূল্য আকাশছোঁয়া। দেশটির মূল্য জরিপ সংস্থার তালিকা অনুযায়ী সেখানে এক কেজি চালের মূল্য ৩৬৫ টাকা আর এক কেজি গরুর মাংসের দাম ১৬৮০ টাকা। সেখানে ৩৭ শতাংশ মানুষের মাছ মাংস কেনার সামর্থ্য নেই। একটি যুদ্ধ সারা বিশ্ব ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধ এখনই বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। দ্রব্যমূল্যের আঁচে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মানুষও পুড়ছে। আর উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলো তো আছেই। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় ফেলেছে জ্বালানি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ভুগছে লিবিয়া। এ নিয়ে সেখানে বড়সর বিক্ষোভও হয়েছে। সেখানে মানুষ বিদ্যুৎ সংকটে ধুঁকছে। সেখানে প্রাকৃতিক উষ্ণতা আর খাদ্য মূল্যের আগুনে জ্বলছেন প্রায় ৭১ লাখ লিবিয়। সেই সাথে বিশ্বে রয়েছে কাজের সংকট। বিশ্ব বাজার এখন যতটা অস্থির তা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। দফায় দফায় মূল্য বৃদ্ধি বিশেষ করে তেল, গ্যাস ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে যে পরিস্থিতি বিশ্ব বাজারে বিরাজ করছে তা বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পরপর জ্বালানি তেলের মূল্য বিশ্ববাজারে রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে আনছে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাবে দরিদ্র দেশগুলোই বেশি ভুগছে বলে। প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২১ সালে বিশ্বে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ২ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বে প্রতি ১০ ব্যারেল তেলের এক ব্যারেল আসে রাশিয়া থেকে। আবার বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক গ্যাস রাশিয়া উত্তোলন করে। ইউরোপের প্রায় ৪০ শতাংশ গ্যাসের জোগান আসে রাশিয়া থেকে। এর আগে করোনার কারণে তেলের দাম বাড়তে থাকে। তারপর করোনা পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে বিশ্ব বাজারে তেলে দাম কমতে থাকে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ফের বাড়তে থাকে। যা বিশ্বজুড়েই অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তিনটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, নিন্ম মূল্যনীতি এবং সুদের হার কমিয়ে রাখার বিষয়টি ইতিহাস হতে চলেছে। পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের বাইরে যাতে না যায় বা পরিস্থিতি বর্তমানের চেয়ে দুঃসময়ে না যায় সে চেষ্টা করছে সবাই। বস্তুত এখনো কেউ নিশ্চিত নয় যে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ মূল্যস্ফীতির এই ধারা কতদূর নিয়ে যেতে পারে। এভাবে অর্থনীতি নাজুক পরিস্থিতি ক্রমেই মন্দার ঝুঁকি বৃদ্ধি করছে। জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা আঙ্কটাড বলেছে, যে মন্দা চলছে তাতে বিশ্ব অর্থনীতিতে চলতি বছর প্রবৃদ্ধি হবে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। এর আগে তা ৩ দশমিক ৬ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছিল।
সংস্থাটির মতে, এ মন্দা রাশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি রূপ নেবে। পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের দেশগুলো এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এ মন্দার হাওয়া থেকে বাদ যাবে না। আরও কিছু বার্তা রয়েছে। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতিতে মুদ্রার সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতির লাগাম চেষ্টা করা হয়েছে। নতুন বাজেটের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ একটি অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত মে মাসে আমাদের দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। গত এপ্রিল মাসে এই হার ছিল ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মে মাসের সার্বিক মূল্যস্ফীতির প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য থেকে এ তথ্য জানা যায়। নিত্যপণ্য চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। এপ্রিলে যা ছিল ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। দেশের অভ্যন্তরেও জ্বালানি তেল,গ্যাস ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট তীব্র হচ্ছে। যার প্রভাব আমরা ইতিমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ঘাটতির মুখে পরেছে। যার প্রভাব পরছে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে। এসব নিয়ে দেশের অর্থনীতিও চাপে রয়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, গত কয়েক মাসের মতো মে মাসে শহরের চেয়ে গ্রামে মূল্যস্ফীতি হয়েছে। পৃথিবীব্যাপীই বেড়েছে সোনা, রুপা, তামাসহ মূল্যবান প্রায় সব ধরনের ধাতুর দাম। বৃদ্ধি পেয়েছে অন্যান্য খাদ্যশস্যের দামও। এদিকে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার, ভোজ্য তেলসহ প্রায় সবকিছুর মূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে এমনিতে নাজেহাল মানুষের জীবন। এসব বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রথমে করোনার ধাক্কা এবং যখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে ঠিক তখন রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণে ফের অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি হয়েছে। মূল্যস্ফীতির আগুনে পুড়ছে পৃথিবী। দরিদ্র আরও দরিদ্র হচ্ছে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির অবস্থা শোচনীয়। অবস্থা এমন যে ছেঁড়া কাঁথায় একদিকে টানলে অন্যদিকে শরীর বেরিয়ে যায়। করোনা পরবর্তী বৈশ্বিক বাজারের সাথে রাশিয়ার-ইউক্রেন যুদ্ধে সারা বিশ্বের মানুষের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এই পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে থামবে তা বলা সম্ভব না। কারণ কোনোভাবেই যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ফলে পরিস্থিতি আরো নাজুক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আরো অনেকদিন হয়তো এই অবস্থা বিরাজ করবে। এ সময়টুকুতে দক্ষতার সাথে সামাল দেওয়া হবে চ্যালেঞ্জের।
লেখক : শিক্ষক ও মুক্তগদ্য লেখক
sopnil.roy@gmail.com





