একের পর এক প্রেমিক বদলে অভিজাত হন মুনিয়া

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

বোন-ভগ্নীপতিকে বানিয়েছেন ধনাঢ্য

একের পর এক প্রেমিক বদলে অভিজাত হন মুনিয়া

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৯ এপ্রিল, ২০২১

কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার আত্মহত্যার পর ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে তার অতীত জীবনের সব চমকপ্রদ ঘটনা। জানা যায়, কুমিল্লায় নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই মুনিয়া পাশের গ্রামের নিলয় নামের এক যুবকের প্রেমে পড়েছিলেন। বিবাহিত ও দুই সন্তানের জনক নিলয়ের হাত ধরে বাড়ি ছেড়ে অজানার উদ্দেশে পাড়ি জমিয়ে শুরু করেছিলেন দাম্পত্য জীবন। কিন্তু এতে বাধা হয়ে দাঁড়ান মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত জাহান। 

সেসময় মুনিয়াকে ফেরাতে কুমিল্লা কোতোয়ালি থানায় নিলয়কে আসামি করে নারী নির্যাতনসংক্রান্ত একটি মামলা করেন নুসরাত। মামলার এজাহারে বলা হয়, মুনিয়া অপ্রাপ্ত বয়স্কা। তাকে ফুসলিয়ে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে তার সম্ভ্রম লুটসহ জানমালের ক্ষতির শঙ্কা করছি। অবিলম্বে নিলয়কে গ্রেপ্তার করে মুনিয়াকে উদ্ধার ও প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর আবেদন জানাচ্ছি। মামলার সাড়ে তিন মাস পরে পুলিশ কুমিল্লার ফেনীতে নিলয়ের এক আত্মীয়ের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করে মুনিয়াকে। কিন্তু ততদিনে মুনিয়া-নিলয় রীতিমতো বিয়ে করে ঘর-সংসার শুরু করেন। পরে স্থানীয়দের মধ্যস্থতায় গ্রাম্য বৈঠকে মোটা অঙ্কের জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে নিলয়-মুনিয়ার বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটানো হয় এবং যে যার পরিবারে ফিরে যান।

নিলয়ের সঙ্গে পলাতক থাকা অবস্থায় বেশ কিছুদিন রাজধানীর মালিবাগ এলাকায় নিলয়ের বন্ধু হিরুর আশ্রয়ে অবস্থান করতে হয়েছিল মুনিয়াদের। তার মাধ্যমেই এফডিসিতে আসা-যাওয়া, শুটিং, আড্ডা, নাচ-গানের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন মুনিয়া। এবার তিনি শো বিজের প্রতি উৎসাহী হয়ে ওঠেন। কিন্তু এর মাঝেই বোনের অপহরণ মামলায় পুলিশি তৎপরতায় কোথাও পালিয়ে থাকার সুযোগ পাচ্ছিলেন না তারা। শেষ পর্যন্ত নিলয়ের আত্মীয়ের বাড়ি ফেনীর পল্লিতে গিয়ে দাম্পত্য জীবন শুরু করেন তারা।

নিলয়ের সঙ্গে প্রেম-বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর দুই বছর বড় বোনের কাছে থেকে পড়াশোনা চালালেও এসএসসি পরীক্ষা দিয়েই মুনিয়া আবার পাড়ি জমিয়েছিলেন ঢাকার উদ্দেশে। নিলয়ের হাত ধরে পরিচিত হিরু মিয়ার মাধ্যমে শোবিজ জগতে ওঠাবসা শুরু হয় তার। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি মুনিয়াকে। একের পর এক প্রেমিক বদলে মুনিয়া হয়েছেন অভিজাত, বোন-ভগ্নীপতিকে বানিয়েছেন ধনাঢ্য। একটার পর একটা প্রেম আর একের পর এক হাত বদলের মাধ্যমে নিজের আখের গোছানোর চেষ্টা করেছেন।

বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর এই বোন-ভগ্নীপতিই ছিল তার একমাত্র অভিভাবক। কিন্তু দুহাতে অঢেল টাকা কামানোর চেষ্টা, অর্থবিত্তের লোভে মুনিয়ার জীবন কোথায় পৌঁছে যাচ্ছে সেই খবর নেওয়ার কোনো দরকারই মনে করেননি তারা। বরং ছোট বোনকে যথেচ্ছ চলাচল, যার সঙ্গে খুশি দিনরাত যাপনের অবাধ স্বাধীনতা দিয়ে বোন-ভগ্নীপতি হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। মুনিয়ার ফ্ল্যাট থেকে ৫০ লাখ টাকা খোয়া যাওয়ার যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে কথিত অডিও রেকর্ডে, এ টাকাও মুনিয়ার হাত ঘুরে তার বোন-ভগ্নীপতির ঘরে পৌঁছেছে বলেই মনে করছেন অনেকে।

গত সোমবার রাজধানীর গুলশানের অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে মুনিয়ার মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হন মুনিয়া। কুমিল্লার একটি সাধারণ পরিবারের মেয়ে মোসারাত জাহান মুনিয়া। পুরো পরিবার কুমিল্লায় থাকলেও ২০১৭ সাল থেকেই ঢাকায় একাকী থাকতেন তিনি। এসএসসি পাসের পর থেকেই মুনিয়ার স্বপ্ন ছিল সিনেমায় কাজ করার। এক প্রযোজকের হাত ধরে পরিচয় হয়েছিল ঢাকাই সিনেমার এক নায়কের সঙ্গে। তার সঙ্গে অল্প কিছুদিন লিভ টুগেদারের পর তার আকাশকুসুম স্বপ্নজাল হঠাৎ ছিন্ন হয়। সেই অভিনেতার সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কে ছেদ পড়তেই বেসামাল হয়ে পড়েন তিনি।

একপর্যায়ে অভিনেতা বাপ্পীরাজের সঙ্গে পরিচয় হয় মুনিয়ার। পরিচয় থেকে গভীর প্রেম। বাপ্পীর মিরপুরের বাসায় নিয়মিত একান্তে দেখা হতো তাদের। ওই বাসাতেই শোবিজের অনেকের সঙ্গেই আড্ডায় মেতে উঠতেন তারা। সেখানেই তাদের গ্রুপভিত্তিক নানারকম সম্পর্কের মজাদার সব কাহিনী ছড়িয়ে আছে শোবিজে। একদিন প্রেমিকা মুনিয়া বিয়ের দাবিতে বাপ্পীর বাসায় গিয়ে ধরনা দেন। সেখানে টানা দুদিন অবস্থানের পর আত্মহত্যা করারও চেষ্টা করেন। পরে বাপ্পীরাজের বন্ধু-বান্ধবীরা বুঝিয়ে-শুনিয়ে মুনিয়াকে বাপ্পীরাজের বাসা থেকে বের করে নিয়ে যান।

জানা যায়, এরপর থেকেই অভিনেতা বাপ্পীরাজের কাছ থেকে উধাও হয়ে যান মুনিয়া। তারপর এক সংগীতশিল্পীর সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠলেও মুনিয়া যোগ দেন পিয়াসা সিন্ডিকেটে। মুনিয়াকে নিয়ে বিভিন্ন তথ্য জানান সাবেক প্রেমিক অভিনেতা বাপ্পীরাজ। মুনিয়ার বিষয়ে বাপ্পীরাজ বলেন, আমার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। আমি মন থেকে ওকে পছন্দ করতাম। আমার পুরো পরিবার বিষয়টি জানত। সম্পর্কের মাঝে হঠাৎ গ্যাপ হয়ে গেল। তারপর মুনিয়া কোথায় যেন হারিয়ে গেল। গত বছর আমি খুলনাতে ছিলাম। এখনো খুলনাতেই আছি। তখন বলেছিল, আমরা বিয়ে করেছি। তারপর চার-পাঁচ দিন টানা কথা হয়েছিল আমাদের, ও সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। তারপর আবার রাগ করে ব্লক করে দেয়।

আপনার সাথে কবে নাগাদ সম্পর্ক ছিল আর মুনিয়া তখন কীসে পড়ত-জানতে চাইলে বাপ্পী আরো বলেন, ২০১৭-১৮ সালে দুই বছর আমাদের সম্পর্ক ছিল। আসলে তো লুকোচুরি লুকোচুরিভাবেই আমার-ওর বিষয়গুলো শেয়ার করত। ওর বোনের (নুসরাত) সঙ্গেও ফেসবুকে আমার কথা হয়েছে। আগের আইডিটি এখন আর নাই। মুনিয়া তখন মিরপুরে থাকত। ও বিড়াল পছন্দ করত, আমিও করতাম।  এভাবেই একটু একটু করে আমাদের গভীর সম্পর্ক হয়ে গেছিল। এরই মধ্যে হঠাৎ না বলে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। না পাওয়ার বিষয়টি সামনে চলে আসল। আমি জাস্ট ভুলেই গেছিলাম ওকে। তারপর গত বছর মার্চের দিকে ওর সঙ্গে আমার আবার কথা হয়েছিল।

আলাপের একপর্যায়ে স্মৃতিকাতর হয়ে বাপ্পীরাজ বলেন, মুনিয়া দেখতে অনেক সুন্দর ছিল। আমি মন থেকে ওকে চেয়েছিলাম। কিন্তু আস্তে আস্তে জানতে পারলাম, ওর অনেক ঝামেলা আছে। আমি সেসব ঝামেলায় জড়াতে চাইনি বলে সরে এসেছিলাম।

বাপ্পীরাজ ছাড়াও একাধিক প্রেমের সম্পর্ক ছিল মুনিয়ার। তিনি বেশ আড্ডাবাজ ছিলেন। সব ধরনের আসরেই ওঠাবসা ছিল তার। গুলশানের ওয়েস্টিনে নিয়মিত আড্ডাবাজির কারণে বহুল আলোচিত পাপিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। কিন্তু অতিমাত্রার উচ্চাভিলাষী মুনিয়ার আশপাশে থাকা নিরাপদ মনে করেননি পাপিয়া। তাই পাপিয়া নিজেই সরে যান মুনিয়ার পাশ থেকে। ওই সময় পাপিয়া তার ঘনিষ্ঠজনদের বলতেন, এই মেয়ে (মুনিয়া) বড়ই ভয়ংকর। পাপিয়ার সেই আগাম বার্তাকেও সত্যি বলে প্রমাণ করেছেন মুনিয়া।

সর্বশেষ রাজধানীর গুলশানে অভিজাত ফ্ল্যাটে অবস্থানকালে তিনি নিজেকে বসুন্ধরার এমডি সায়েম সোবহান আনবীরের বান্ধবী হিসেবে দাবি করলেও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল সরকারদলীয় হুইপ ও চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য শামসুল হক চৌধুরীর ছেলে শারুনের সঙ্গে। শেষ মুহূর্তেও আনভীরের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় সে সম্পর্কে শারুনের কাছ থেকে দিকনির্দেশনা নিতে মুনিয়া এসএমএস চালাচালি করেছেন। সেসব এসএমএসের প্রমাণ এখন পুলিশের হাতে। এই প্রমাণের ভিত্তিতে হুইপপুত্র শারুনকে ইতোমধ্যে পুলিশ এক দফা জিজ্ঞাসাবাদও করেছে। 

সম্প্রতি চট্টগ্রামের এক ব্যাংক কর্মকর্তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে শারুন চৌধুরীর বিরুদ্ধে। শারুন ওই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হুইপপুত্র শারুন চৌধুরীর সঙ্গে মুনিয়ার কথোপকথনের কিছু স্ক্রিনশটের সূত্র ধরে গত মঙ্গলবার বিকেলে একটি সূত্র তার কাছে কিছু তথ্য জানতে চায়।

ছড়িয়ে পড়া স্ক্রিনশটে কথোপকথন কত তারিখের, তা স্পষ্ট নয়। সময় বিকেল পাঁচটা বাজার কিছু আগে। খুদে বার্তার ওই কথোপকথনে মোসারাত মুনিয়া শারুনকে লেখেন, তিনি ভালো নেই। এরপর লেখেন, ‘উনি তো আমাকে বিয়ে করবেন না। কী করব আমি?’ জবাবে শারুন লেখেন, আগেই বলেছিলাম ওর কথা।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads