কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক বিভিন্ন এনজিও থেকে স্থানীয়দের চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের হিড়িক পড়েছে। গত এক বছরে অন্তত ৫ হাজার স্থানীয়দের চাকরি থেকে ছাটাই করা হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ, কাজে অদক্ষতা, বাজেট না থাকাসহ নানান অজুহাতে স্থানীয়দের চাকরি থেকে বিতাড়িত করা হলেও ঠিকই ভিন্ন জেলার বাসিন্দাদের চাকরী বহাল রেখেছে বেশিরভাগ এনজিও। এদিকে চাকরি থেকে ছাটাই হওয়া নারী পুরুষরা অন্য কোথাও চাকরি না পেয়ে বেকার জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে অনেকে।
কক্সবাজার শহরের বিজিবি ক্যাম্প সিকদার পাড়া এলাকার নাছির উদ্দিন বলেন, কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকে অনার্স মাস্টার্স পাস করে ২০১৮ সালের শুরুর দিকে একটি আর্ন্তজাতিক এনজিওতে চাকরি শুরু করি। কর্মক্ষেত্র ছিল রোহিঙ্গা ক্যাম্প, সব কিছু ভালই চলছিল। ২০২০ সালের শেষের দিকে উক্ত এনজিওর শীর্ষ কর্মকর্তার নির্দেশে মাঠ পর্যায়েও কাজ করেছেন তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। গত ৫ মাস আগে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়। এরপর থেকে বাড়িতে বেকার বসে আছে। এর মধ্যে অন্যান্য এনজিওতে চাকরীর চেষ্টা করলেও কোথাও চাকরি হয়নি।
শহরের পাহাড়তলীর রোজিনা আক্তার জানান,আমি কক্সবাজার মহিলা কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেছি, ৩ বছর আগে একটি স্থানীয় এনজিওতে চাকরি হয়, তাও অনেক তদবির করে। চাকরির টাকা দিয়ে পরিবারে কিছুটা সচ্ছ্বলতা আসলেও আমার শরীর বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তবুও পরিবারের জন্য কিছু করতে চাইছিলাম। তাই চাকরি করতে আগ্রহী ছিলাম। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে চাকরীর মেয়াদ শেষ হয়েছে বলে আর কাজে যোগদান করতে দেয়নি কর্তৃপক্ষ।
তিনি জানান, আমরা এক সাথে ৮/১০ জন মেয়ে জরিপ এবং হেল্থ সেক্টরে কাজ করতাম। এর মধ্যে ৬ জনের চাকরি নাই। বাকিদের নানা তদবির এবং ভিন্ন কারণে চাকরি আছে। তবে প্রত্যেকটি প্রকল্পে ঢাকা রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে এসে চাকরি করা ছেলেমেয়েদের চাকরী ঠিকই আছে। কারণ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের নিকট আত্বীয় হয়। যেহেতু আমাদের জন্য কথা বলার কেউ নাই তাই চাকরিও নাই।
উখিয়ার ভালুকিয়া এলাকার রিয়াজ উদ্দিন বলেন, আমি সহ এলাকার অনেক ছেলেমেয়ে ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং বিভিন্ন এনজিওতে চাকরি করে আসছিলাম। তবে এখন মাত্র কয়েক জনের চাকরি আছে বাকিরা সবাই ঘরে বসে আছে। আমি নিজেও ৪/৫ বার চেষ্টা করে চাকরি বাঁচিয়েছি। আগে ২ বছর আগে ৪৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরী করতাম এখন সব মিলিয়ে ২২ হাজার টাকা পাই তবুও চাকরি করে যাচ্ছি।
এ বিষয়ে উখিয়া উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসেন বলেন,আমার দেখা মতে অর্ধেকের বেশি স্থানীয় ছেলেমেয়েদের এখন চাকরি নাই। তারা এখন বেকার ঘরে বসে আছে। তবে ঠিকই বহিরাগত জেলার ছেলেমেয়েদের চাকরি করতে দেখা যাচ্ছে।
উখিয়া উপজেলা প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহামদ বলেন, এনজিওতে চাকরি করতে গিয়ে এলাকার অনেক ছেলেমেয়ে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছিল,তাদের অনেকের এখন আর চাকরি নাই। অন্যদিকে কলেজেও ঠিকমত ফিরতে পারছে না। ফলে অনেকের ভবিষ্যত অন্ধকার হয়ে পড়েছে। এক সময় জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রত্যেক এনজিওতে স্থানীয়দের ২৫% চাকরী দেওয়ার কথা বাধ্যতামূলক করলেও তার কোন বাস্তবায়ন নেই। এছাড়া এনজিওদের বরাদ্দ থেকে ২৫% টাকা স্থানীয়দের উন্নয়নে খরচ করার কথা থাকলেও তা কোথায় খবর করা হয় কেউ জানে না।
কক্সবাজার সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সহ সভাপতি অধ্যাপক অজিত দাশ বলেন,এনজিওদের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে সেটা আমরা এখনো বুঝতে পারছি না। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কিভাবে এনজিওরা রোহিঙ্গাদের চাকরি দেয় কিভাবে রোহিঙ্গাদের দোকানপাট করতে দেয়,কিভাবে ব্যবসা করতে দেয় কিছু বুঝি না। আমার জানা মতে কোনো এনজিওতে অফিসার পদে স্থানীয় মানুষ নেই। সব বহিরাগত জেলার মানুষ,শুরু থেকে তারা তাদের আত্বীয় স্বজনদের এনে মোটা অংকের বেতনের চাকরিতে সুযোগ দিয়ে আসছে। আমরা সেটার প্রতিবাদ করেছি। তাছাড়া ডিগ্রি পাস আমাদের জেলার ছেলেমেয়েরা কাজ করে ২৫ হাজার টাকায় মাঠ পর্যায়ে একই ভাবে ডিগ্রিপাস বহিরাগত ছেলেমেয়েরা কাজ করে অফিসে ৬০ হাজার টাকা বেতনে। আর এখন কথায় কথায় আমাদের ছেলেমেয়েদের চাকরীচ্যূত করা হচ্ছে এটা খুবই অন্যায়। এর প্রতিবাদ করতে হবে।
এদিকে কক্সবাজার এনজিও সমন্বয় পরিষদের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, আগে প্রায় ১২০ টির মত এনজিও কাজ করতো এখন ৭০ টির মত থাকতে পারে। আগে প্রায় ৫০ হাজার লোকজন কাজ করতো সেটা এখন সর্বোচ্চ ২০ হাজার হতে পারে। সামনে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। কারণ বেশির ভাগ দাতা সংস্থার আর টাকা দিচ্ছে না, ফান্ড দিচ্ছে না। তাই ইতোমধ্যে অনেক প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়াতে বেশিরভাগ স্থানীয় ছেলেমেয়েরা চাকরি হারিয়েছে সেটা সত্য।





