চাল ও তেল নিয়ে কারসাজির পর এবার উত্তপ্ত গমের বাজার। কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সব খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। কিন্ত সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর বলছে, আমদানি প্রায় স্বাভাবিক। যুদ্ধের কারণে গম আমদানিতে এখনো কোনো প্রভাব পড়েনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে স্বাভাবিক রয়েছে আমদানি। তাই বাজারে গমের দাম বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুদ্ধ শুরুর পর শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন থেকে জাহাজীকরণ বন্ধ রয়েছে। তবে আগে থেকে জাহাজীকরণ হওয়া পণ্য আমদানি হচ্ছে। এক্ষেত্রে এত তাড়াতাড়ি দেশে গমের বাজারে প্রভাব পড়ার কথা নয়। কিন্তু ভোক্তাদের অভিযোগ, আগেভাগে অনেকটা ‘গুজব’ ছড়িয়ে দাম বাড়াচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। আর প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গুজব তৈরি করে যদি দাম বাড়ানো হয়, সেক্ষেত্রে নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গত সপ্তাহে মণপ্রতি গম বিক্রি হয়েছে এক হাজার ১২০ টাকায়। অথচ এ সপ্তাহের শুরুতেই হঠাৎ বেড়ে যায় গমের দাম। এখন মণপ্রতি গম বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ২২০ থেকে এক হাজার ২৩০ টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে গমের দাম বেড়েছে মণপ্রতি ১০০ টাকা। এদিকে রাজধানীর অন্যতম প্রধান পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজার বিভিন্ন বাজারে গমের দাম ৮ থেকে ১০ শতাংশ বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, যুদ্ধ শুরুর আগে প্রকারভেদে আন্তর্জাতিক বাজারে টনপ্রতি গমের দাম ছিল ৩০০-৩৬০ ডলার। যুদ্ধ শুরুর পর কানাডা-অস্ট্রেলিয়াসহ শীর্ষ গম উৎপাদনকারী বিভিন্ন দেশ দাম বাড়িয়ে ৪০০-৪৫০ ডলার করেছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী রমজানে পণ্যের দাম আরো অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
তবে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সূত্র জানায়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলেও তার প্রভাব দেশের গমের বাজারে পড়েনি। বর্তমানে ইউক্রেন-রাশিয়া ছাড়া অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি স্বাভাবিক রয়েছে। এছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন থেকে যুদ্ধের আগে যেসব গম জাহাজীকরণ হয়েছে, সেগুলো আমদানির প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এত তাড়াতাড়ি দাম বাড়া মানে এটি ব্যবসায়ীদের এক ধরনের কারসাজি।
দেশে মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ গম বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হয়। রাশিয়া, ইউক্রেন, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, তাঞ্জানিয়া, কেনিয়া, আর্জেন্টিনাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এসব গম আসে। এর মধ্যে যুদ্ধ লেগেছে শুধু দুটি দেশে। বাকি দেশ থেকে চাহিদার বিপরীতে গম আমদানি করা যাবে।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের তথ্যমতে, শুধু চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৬ লাখ ৭৫ হাজার ২৭০ টন গম আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে ইউক্রেন থেকে এসেছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫৮৭ টন এবং রাশিয়া থেকে এসেছে ৩ লাখ ২ হাজার ৮৩৩ টন। বাকিগুলো অন্যান্য দেশ থেকে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা এই পরিসংখ্যানকে এ পর্যন্ত চাহিদার সঙ্গে স্বাভাবিক বলে উল্লেখ করছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে তারা রাশিয়া-ইউক্রেনের বিকল্প দেশ থেকে গম আমদানির জন্য ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দিচ্ছেন। এতে দেশে ভবিষ্যতেও গমের সংকট হবে না।
উদ্ভিদ সঙ্গ নিরোধ কেন্দের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ নাছির উদ্দীন বলেন, গম আমদানি স্বাভাবিক রয়েছে। এত তাড়াতাড়ি বাজারে দাম বাড়ার কথা নয়। শুধু রাশিয়া-ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর ওই দুটি দেশ থেকে জাহাজীকরণ বন্ধ রয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা বিকল্প দেশ থেকে আমদানি করতে পারবেন। তাহলে ভবিষ্যতেও দাম বাড়ার সম্ভাবনা কম।
এসিআই এগ্রিবিজনেসের প্রেসিডেন্ট এফ এইচ আনসারি বলেন, এই মুহূর্তে মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন ছিল না। কিছু সময়ের জন্য বাজার স্বাভাবিক থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে আমরা দেখছি এরইমধ্যে বিশ্ববাজারের সঙ্গে স্থানীয় বাজারেও গম, ভুট্টা ও তেলের দাম বেড়েছে। আমরা অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইতালি এবং ব্রাজিল থেকে আমদানি করতে পারি। ওই দেশগুলো দাম বাড়ালে আমাদের বেশি দামে আমদানি করতে হবে। তবে ওই বাজারগুলো যেহেতু তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল হতে পারে, তাই বাংলাদেশ কাছাকাছি কোনো বিকল্পের দিকে নজর দিতে পারে।
আমদানিকারক ও চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট মাহবুব আলম বলেন, যুদ্ধের কারণে এই সংকট হয়েছে। কানাডা-অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ দাম বাড়িয়েছে। তারা টনপ্রতি প্রকারভেদে ১০০ ডলার পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এজন্য দেশের বাজারে দাম বেড়েছে। তবে বিকল্প উৎস দেখে আমদানি করতে হবে।
গমের দাম বাড়ার বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মমিনুর রহমান বলেন, আমরা বিষয়টি তদারকি করছি। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। কারসাজি করে দাম বাড়ানো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মোসাম্মৎ নাজমানারা খানম বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন আমাদের গমের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী। আমরা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার পরিবর্তে সেখান থেকে তুলনামূলক কম দামে গম পাই। এই রুটটি যেহেতু বন্ধ হয়ে গেছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়বে। কিন্তু আমাদের জন্য নতুন বাজার হলো ভারত। দেশটি এখন বিপুল পরিমাণ গম উৎপাদন করে। আমরা ইতিমধ্যে ভারতের সঙ্গে কথা বলেছি। বুলগেরিয়ার সঙ্গেও আমাদের একটি চুক্তি আছে। সেখান থেকে তুলনামূলক কম দামে গম পাওয়া যেতে পারে।
এদিকে শুধু গমই নয়, এক সপ্তাহে ভোজ্যতেলের দামও টনে ৫০ থেকে ৮০ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। গত তিন দিনে খাতুনগঞ্জে প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ। এরমধ্যে সয়াবিন ও পাম তেলের দামও প্রতি মণে (৪০.৯০ লিটার) ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
ইউক্রেন থেকে আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্য সরিষার দামও বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। গত সপ্তাহে প্রতি মণ সরিষা ২ হাজার ৬৫০ টাকায় বিক্রি হলেও, দাম মণে ১ হাজার টাকা বেড়ে এখন সরিষা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৬৫০ টাকায়। আর মণে প্রায় ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে রাশিয়া থেকে আমদানিকৃত ভুট্টার দাম।
চলমান সংঘাতের সুযোগ নিয়ে অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়িয়ে দিয়েছেন আমদানিকারকরা। গত সপ্তাহে প্রতিমণ ভুট্টা ১ হাজার ১২০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩০০ টাকায়। মাত্র তিন দিনে প্রতি মণে চিনির দাম বেড়েছে ৪০ টাকা পর্যন্ত। আর প্রতি মণ সাদা মটোরের দাম বেড়েছে ১৫০ টাকা পর্যন্ত।





