ঐতিহ্য-অহংকারের পাটশিল্প

সংগৃহীত ছবি

কৃষি অর্থনীতি

আড়ালে থেকে যাচ্ছে পাট চাষে পরিবেশের উপকারিতা

ঐতিহ্য-অহংকারের পাটশিল্প

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ৯ মার্চ, ২০২২

পরিবেশের সঙ্গে পাট চাষের নিবিড়বন্ধন। পাটের পরিচয় অর্থকরী ফসল হিসেবে হলেও এখন পরিবেশ সহায়ক হিসেবে পাটজাত পণ্যের ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তবে আড়ালে থেকে যাচ্ছে পাট চাষে পরিবেশের উপকারী দিকগুলোর কথা। আর একারণে একজন পাটচাষির পরিবেশ রক্ষায় অবদানের কথা বিবেচনায় আসছে না। এমনকি যিনি পাটের আবাদ করছেন তিনি নিজেও জানেন না যে তিনি কেবলই অর্থকরি ফসল হিসেবে নয়, পরিবেশের সহায়ক অসামান্য অবদান রাখছেন। আমরা কেবল পাটের অর্থকরি অবদানের দিকটিই জানি। তবে পাট গাছ যে অর্থকরী, পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু পরিবর্তন বিরোধী একটি ফসল সে কথা অনেকেরই হয়তো জানা নেই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, পাট ফসলটি নির্মল বাতাস সৃষ্টির অত্যতম কারিগর। কারণ পাট গাছ বাতাস থেকে কার্ব-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে, যা আমরা ত্যাগ করি এবং প্রচুর অক্সিজেন ত্যাগ করে যা আমরা গ্রহণ করে বেঁচে থাকি। কথা আসতে পারে এ তো বৃক্ষর মতোই। কথা সত্যি হলেও পাট গাছের ক্ষেত্রে আছে অনেক ব্যতিক্রম অবদান- যা ফসলি জমির উর্বরতা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশকে করে সমৃদ্ধ। পাট একটি জলবায়ু সহনশীল ফসলও বটে। কারণ সাময়িক খরা কিংবা জলাবদ্ধতায় পাট ফসলের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। পাট সবুজ বৃক্ষ এবং প্রকৃতি ও পরিবেশের নিজস্ব উপাদান। পাট উৎপাদনে খুবই কম পরিমাণের সার প্রয়োজন হয়।

২০০০ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক তন্তুর প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হলে দেশে বেসরকারি খাতে পাটকল স্থাপন বাড়তে থাকে। কিন্তু বেসরকারি খাতও প্রধানত কাঁচাপাট, বস্তা ও সুতার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। দেশের পাটকলগুলোতে সবচেয়ে বেশি পাটের সুতা উৎপাদন হয়। এরপরই রয়েছে বস্তা। বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, বর্তমানে তাদের সংগঠনের ২০২টি পাটকল রয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য খাতের পাটকল মিলিয়ে দেশে তিনশর বেশি পাটকল রয়েছে। কিন্তু সব পাটকল চালু নেই। ১৮০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০টি পাটকল নিয়মিত উৎপাদনে রয়েছে। বাকিরা অনিয়মিতভাবে উৎপাদন করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, একজন কৃষক এক হেক্টর জমিতে পাট চাষ করলে তা মোট ১০০ দিনে ১৫ টন কার্বন ডাই অক্সাইড প্রকৃতি থেকে শোষণ করে, আর ১১ টন অক্সিজেন প্রকৃতিকে দেয়। পাটজাত দ্রব্য সহজে মাটিতে মিশে যায় বলে, প্রক্রিয়াকৃত পাটজাত দ্রব্যও পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না। অপরদিকে বিশ্বে প্রতিবছর এক ট্রিলিয়ন মেট্রিকটন পলিথিন ব্যবহার করা হয়- যার ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার ১০ লাখেরও বেশি পাখি এবং লক্ষাধিক জলজ প্রাণী। আমরা যদি পলিব্যাগের বদলে পাট জাত দ্রব্য ও মোড়ক ব্যবহার হলে আমরা পরিবেশকে অবক্ষয় থেকে রক্ষা করে মানবজাতির উপযোগী করে তুলতে পারি।

পাট অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৮ লাখ হেক্টরের ওপরে পাট এবং পাট জাতীয় (কেনাফ ও মেস্তা) ফসলের চাষাবাদ হচ্ছে। এ থেকে বছরে ৮০ থেকে ৮৪ লাখ বেল পাট উৎপাদন হয়।

রপ্তানি আয় : ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশ থেকে ১১৬ কোটি ডলারের পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে কাঁচাপাট রপ্তানি হয়েছে ১৩ কোটি ৮১ লাখ ডলারের। পাটের সুতা রপ্তানি হয়েছে ৭৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের। পাটের বস্তা ও ব্যাগ রপ্তানি হয়েছে ১৩ কোটি ৮৬ লাখ ডলারের। এ ছাড়া পাটের অন্যান্য পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৮ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের। চলতি অর্থবছরে পাট ও পাটপণ্য থেকে সরকার ১৪২ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। ইতোমধ্যে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি) ৭৯ কোটি ৯৪ লাখ ডলারের রপ্তানি হয়েছে। গত ২০২০-২১ অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮৬ কোটি ২৭ লাখ ডলার।

বাংলাদেশের পাটকলে উৎপাদিত সুতার বেশির ভাগ রপ্তানি হয় তুরস্কে। ভারতে কাঁচাপাট ও পাটপণ্য রপ্তানি হয়। নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, সুদান ও আফ্রিকার নানা দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি হয়।

জলবায়ু সহনশীল ফসল

পাট গাছ নিজেই প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন ও অন্যান্য পুষ্টিকর উপাদান মাটিতে সরবরাহ করে। সবুজ প্রকৃতির শোভা, খাদ্য সংকট মোকাবিলায় ভূমিকা, রপ্তানি আয় ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষেত্রে সকল ফসলেরই কমবেশি ভূমিকা আছে। তবে পাটের বিষয়টা সম্পূর্ণই আলাদা। কারণ পাট হচ্ছে চির সবুজ বাংলার পরিচায়ক প্রধান অর্থকরি ফসল ও পরিবেশের অকৃত্রিম বন্ধু। যার আরেক নাম সোনালি আঁশ। একসময় নদীমাতৃক এই বাংলাজুড়ে যেদিকে চোখ গেছে সেদিকে ছিল সবুজ পাটের ক্ষেত। নির্মল বাতাসে দোল খাওয়া এই পাট কেবলই অর্থনীতি নয়, পরিবেশের অকৃত্রিম বন্ধু। আমরা জানি, বাংলাদেশের প্রকৃতি এবং জলবায়ু পাট ও পাট জাতীয় ফসল চাষাবাদের জন্য খুবই উপযোগী। পাট বৃষ্টিনির্ভর ফসল। পাট চাষ থেকে পশুখাদ্য ও সবজি পাওয়া যায়। পাট পাতা দেশের বহুল ব্যবহূত একটি উপাদেয় শাক এবং শুকনো পাট পাতার পানীয় ‘চা’ হিসেবে ব্যবহারের প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করা হয়েছে। ঘন ও উঁচু ফসল হওয়ার কারণে পাট বনভূমির ন্যায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, ফসল হিসেবে একজন কৃষক এক হেক্টর জমিতে পাট চাষ করলে তা মোট ১০০ দিনে ১৫ টন কার্বন ডাই অক্সাইড প্রকৃতি থেকে শোষণ করে এবং ১১ টন অক্সিজেন প্রকৃতির মাঝে নিঃসরণ করে বায়ুমণ্ডলকে বিশুদ্ধ ও অক্সিজেন সমৃদ্ধ রাখে। পাট ফসলের কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ ক্ষমতা প্রতি বর্গমিটার জায়গায় ০.২৩ থেকে ০.৪৪ মিলিগ্রাম। তার চেয়েও বড় ব্যাপারটি হলো- পাট ফসল পৃথিবীর গ্রিন হাউস গ্যাস ও তার পরিপ্রেক্ষিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে।

বহুমুখী পাটপণ্য : এবারের ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন পাটের তৈরি জিন্স (ডেনিম), পাটখড়ি থেকে উৎপাদিত ছাপাখানার বিশেষ কালি (চারকোল), পাট ও তুলার মিশ্রণে তৈরি বিশেষ সুতা (ভেসিকল), পাটের তৈরি বিশেষ সোনালি ব্যাগ ও পাটপাতা থেকে উৎপাদিত ভেষজ পানীয় প্রদর্শন করেছে। এ ছাড়া বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান পাট দিয়ে শাড়ি, লুঙ্গি, সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, ব্যাগ, খেলনা, শোপিস, ওয়ালম্যাট, নকশিকাঁথা, পাপোশ, জুতা, স্যান্ডেল, শিকা, দড়ি, সুতলি, দরজা-জানালার পর্দার কাপড়, গহনা ও গহনার বাক্স তৈরি করছে। জুট অ্যাসোসিয়েশন বলছে, দেশে পাট থেকে ২৮৫ ধরনের পণ্য তৈরি হয়, যা দেশে ও বিদেশে বাজারজাত করা হচ্ছে।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, পরিবেশ সচেতনতা থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাটপণ্যের ব্যবহার বেড়েছে। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি উন্নত দেশগুলোতে গাড়ি নির্মাণ, পেপার অ্যান্ড পাম্প, ইন্স্যুলেশন শিল্পে, জিওটেক্সটাইল হেলথকেয়ার, ফুটওয়্যার, উড়োজাহাজ, কম্পিউটারের বডি তৈরি, ইলেকট্রনিক্স, মেরিন ও স্পোর্টস শিল্পে পাটের ব্যবহার হচ্ছে।

পরিবেশ সহায়ক জ্বালানি পাটকাঠি

পাটখড়ি পাট চাষের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ। পাট আঁশের দ্বিগুণ পরিমাণ পাটখড়ি উৎপাদিত হয়। ঘরের বেড়া, ছাউনি এবং জ্বালানি হিসাবে খড়ির ব্যবহার সর্বাধিক প্রাচীনতম।  বাঁশ এবং কাঠের বিকল্প হিসেবে পার্টিকেল বোর্ড, কাগজের মণ্ড ও কাগজ তৈরিতেও পাটখড়ি ব্যবহূত হয়। জ্বালানির বিকল্প হিসেবে পাট কাঠির ব্যবহার যত বাড়বে গাছ কেটে বন উজার করার প্রবণতা তত কমবে। সঙ্গে আরো লাভ হবে- বৃক্ষ পরিবেশকে মানুষের জন্য বাস উপযোগী করে তোলবে। বৃক্ষের ফল, ফুল মানব জাতিকে পুষ্টি ঔষধি উপকরণ জোগাবে। কীট-পতঙ্গ, পোকা-মাকড় আর পশুপাখির নিরাপদ বাসস্থান হবে বৃক্ষ। তাহলে জ্বালানি হিসেবে পাটকাঠির ব্যবহার পরিবেশের জন্য সহায়ক। আমরা জানি সোনালি আঁশ পাটকাঠির আরেক নাম রুপালি কাঠি। বাংলাদেশ থেকে পাটকাঠির ছাইয়ের প্রধান আমদানিকারক দেশ হচ্ছে চীন। বর্তমানে চীন ছাড়াও তাইওয়ান, জাপান, হংকং ও ব্রাজিলেও পাটকাঠির ছাই রপ্তানি হচ্ছে। চীনসহ বিভিন্ন দেশে পাটকাঠির ছাই থেকে কার্বন পেপার, কম্পিউটার ও ফটোকপিয়ারের কালি, আতশবাজি ও ফেসওয়াশের উপকরণ, মোবাইলের ব্যাটারি, প্রসাধনীপণ্য, এয়ারকুলার, পানির ফিল্টার, বিষ ধ্বংসকারী ওষুধ, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, দাঁত পরিষ্কারের ওষুধ ও ক্ষেতের সার ইত্যাদি পণ্য তেরি করা হয়। পাটকাঠি থেকে উতৎপাদিত কার্বনের গুণগতমান সর্বাধিক। তাই বিশ্ববাজারে এর চাহিদা ও মূল্য দুটিই বাড়ছে। তাছাড়াও পাটকাঠি থেকে কয়লা বা অ্যাকটিভেটেড চারকোল উৎপাদন করা হয়। ইউরোপে ওয়াটার পিউরিফিকেশন প্ল্যান্টের প্রচুর চাহিদা রয়েছে।

প্রতি বছর দেশে প্রায় ৩০ লাখ টন পাটকাঠি উৎপাদন হয়। এর অর্ধেকও যদি সঠিকভাবে চারকোল উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়, তাহলে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, পাবনা, ঝিনাইদহ, কুড়িগ্রাম, শরীয়তপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৩৩টি প্রতিষ্ঠান পাটকাঠি থেকে চারকোল তৈরি করে রপ্তানি করছে। প্রতিমাসে বাংলাদেশ থেকে দেড় হাজার টন চারকোল রপ্তানি হয়।

মাটির উর্বরতাশক্তি ও গুণগত মান বাড়ায়

পাটের পাতায় প্রচুর নাইট্রোজেন, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়াম থাকে যা মাটির উর্বরতা শক্তি বাড়ায়। আরো সহজভাবে বলতে পারি- যে জমিতে পাট চাষ হয় সে জমিতে অন্য ফসলও ভালো হয়। কিভাবে তাই বলছি। পাট ফসল উৎপাদন কালে হেক্টর প্রতি ৫ থেকে ৬ টন পাট পাতা ঝরে গিয়ে মাটিতে যোগ হয়। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর গড়ে ৯৫৬.৩৮ হাজার টন পাটপাতা ও ৪২৩.৪০ হাজার টন পাটগাছের শিকড় মাটির সঙ্গে মিশে যায়, যা জমির উর্বরতা ও মাটির গুণগত মান বৃদ্ধিতে ব্যাপক প্রভাব রাখে। পাটগাছের মূল মাটির ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি বা তার বেশি গভীরে প্রবেশ করে। এই পাট মূল মাটির গভীর থেকে অজৈব খাদ্য উপাদান মাটির ওপরের স্তরের সঙ্গে সংমিশ্রণে সঞ্চালকের ভূমিকা রাখে। আর এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মাটির ভৌত অবস্থার উন্নয়ন ঘটে ও মাটিতে পানি চলাচল সহজ এবং স্বাভাবিক থাকে। এছাড়াও ফসল কর্তনের পর জমিতে থেকে যাওয়া পাট গাছের গোড়াসহ শিকড় পচে মাটির সঙ্গে মিশে জৈব সারে পরিণত হয়। এর ফলে পরবর্তী ফসল উৎপাদনের সময় সারের খরচ কম লাগে। আবার পাট জাগ দেওয়ার পর ছালের আঁশ ভিন্ন অন্যান্য নরম পচে যাওয়া অংশ এবং জাগের ও ধোয়ার তলানী, পাট পচা পানি উৎকৃষ্ট জৈব সার হিসেবে ব্যবহার যোগ্য। পাট জাগ দেওয়ার সময়ে সেখানে মাছের উত্তম খাবার মিলে। মাছ তা খেয়ে দ্রুত বাড়ে।

সচেতনতায় বাড়ছে সুযোগ ও সম্ভাবনা

পাটের পরিবেশবান্ধব বহুমাত্রিক ব্যবহার বিশ্বে দিন দিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব মনোভাব নিয়ে সচেতন ভূমিকায় পাটের তৈরি পণ্য ব্যবহার বাড়ছে। পাটের ব্যবহার হয়ে থাকে  সুতা, পাকানো সুতা, বস্তা, চট, কার্পেট ব্যাকিং ইত্যাদিতে। পর্দার কাপড়, কুশন কভার, কার্পেট ইত্যাদি পাট থেকে তৈরি হয়। গরম কাপড় তৈরির জন্য উলের সঙ্গে পাটের মিশ্রণ করা হয়। কৃষি পণ্য এবং অন্যান্য দ্রব্যাদি বস্তাবন্দি ও প্যাকিং করার জন্য ব্যাপকভাবে পাট ব্যবহার করা হয়। পাটের আঁশের বহুমুখী ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে প্রসাধনী, ওষুধ, রং ইত্যাদি।

জানলে অবাক হবেন, বাংলাদেশের পাট এখন পশ্চিমা বিশ্বের গাড়ি নির্মাণ, পেপার অ্যান্ড পাম্প, ইনসুলেশন শিল্পে, জিওটেক্সটাইল হেলথ কেয়ার, ফুটওয়্যার, উড়োজাহাজ, কম্পিউটারের বডি তৈরি, ইলেকট্রনিক্স, মেরিন ও স্পোর্টসশিল্পে ব্যবহূত হচ্ছে। এছাড়া ইউরোপের বিএমডাব্লিউ, মার্সিটিজ বেঞ্চ, ওডি ফোর্ড, যুক্তরাষ্ট্রের জিএম মোটর, জাপানের টয়োটা, হোন্ডা কোম্পানিসহ নামিদামি সব গাড়ি কোম্পানিই তাদের গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও ডেশবোর্ড  তৈরিতে ব্যবহার করছে পাট ও কেনাফ। বিএমডাব্লিউ পাট দিয়ে তৈরি করছে পরিবেশ সম্মত ‘গ্রিন কার’ যার চাহিদা এখন প্রচুর। পাট পণ্যের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধান পণ্য পাটের বস্তা অনেক দেশে ধান সংরক্ষণের জন্য প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় রাস্তার মাটি ক্ষয় রোধে, নদীভাঙন রোধে, হাতিরঝিল প্রকল্পে রাস্তা করার সময় রাস্তার পাড়ে সয়েল সেভার ব্যবহার করা হয়েছে। পাট পণ্যের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধান প্রোডাক্ট পাটের বস্তা এখন অনেক দেশে ধান সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। পাট কাটিংস ও নিম্নমানের পাটের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে নারিকেলের ছোবড়ার সংমিশ্রণে প্রস্তুত করা হয় পরিবেশবান্ধব এবং ব্যয়সাশ্রয়ী জুট জিওটেক্সটাইল। জিওটেক্সটাইল ভূমিক্ষয় রোধ, রাস্তা ও বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদীর পাড় রক্ষা ও পাহাড় ধস রোধে ব্যবহূত হচ্ছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, জিওটেক্সটাইলের অভ্যন্তরীণ বাজার এখন ৭০০ কোটি টাকার। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, রেল, সড়কসহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগের অবকাঠামো তৈরিতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল হিসেবে জিওটেক্সটাইলের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শুধু বাংলাদেশে নয় বিশ্বজুড়ে নানা কাজে ‘মেটাল নেটিং’ বা পলিমার থেকে তৈরি সিনথেটিক জিওটেক্সটাইলের পরিবর্তে পরিবেশ উপযোগী ও উৎকৃষ্ট জুট জিওটেক্সটাইলের কদর বাড়ছে। 

এস এম মুকুল : কৃষি অর্থনীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক,  writetomukul36@gmail.com
 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads