কঠোরতায়ও বোধোদয় হয়নি!

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

কঠোরতায়ও বোধোদয় হয়নি!

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ৪ জুলাই, ২০২১

করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) প্রতিদিনই সংক্রমণ ও মৃত্যুতে নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। গত কয়েক মাস ধরে এ ভাইরাস একের পর এক নতুন ধরন নিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পহেলা জুলাই থেকে সরকার চলমান লকডাউনকে কঠোর বিধিনিষেধ দিয়ে আরো শক্তিশালী করেছে। জনসচেতনতা বাড়াতে হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সব ধরনের অফিস ও কারখানা। কিন্তু এতেও মানুষের বোধদয় হয়নি।

কঠোর বিধিনিষেধের তৃতীয় দিনে গতকাল শনিবার রাজধানীতে প্রচুর মানুষ স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে বাহিরে ঘোরাফেরা করেছে। চলেছে ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস ও পণ্যবাহী গাড়ি। এছাড়া সড়কে প্রচুর মোটরসাইকেল ও রিকশা চলতে দেখা যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে এমনিতেই অক্সিজেনসহ চিকিৎসা সেবায় ভয়াবহ সংকটের দারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। এ অবস্থায় কঠোর বিধিনিষেধের মাধ্যমে লোকজনকে গৃহবন্দি করা না গেলে সামনে রয়েছে সংক্রমণের প্রবেল ঝুঁকি। আর সাধারণ মানুষ বলছেন, ঘরে খাবার নেই। লকডাউনে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেক কষ্টে আছি। এভাবে আর কতদিন থাকব। আমরা চরম বিপাকে আছি। তাই বাধ্য হয়ে সাহায্য বা কাজের জন্য বাইরে বের না হয়ে উপায় নেই। সরেজমিনে দেখা গেছে, লকডাউন মানছে না মানুষ। সেনাটহল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার পরও বাইরে বের হচ্ছেন তারা। লকডাউন ভেঙে দেশের বিভিন্ন জেলায় হাটবাজারে দেখা যাচ্ছে মানুষের ভিড়। সামাজিক দূরত্ব না মানায় বাড়ছে করোনা সংক্রমণ ঝুঁকি। জরুরি প্রয়োজন ছাড়াও অনেকে ঠুনকো অজুহাতে বেরিয়েছেন ঘর থেকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে যাত্রী নিয়ে মোটরসাইকেল দুজনও চলতে দেখা গেছে সড়কে।

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, লকডাউন মানার বিষয়ে কঠোর অবস্থানে আছেন তারা। এদিকে গতকাল ঢাকায় ৬২১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এছাড়া, সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ডিএমপির আটটি ক্রাইম ও ট্রাফিক বিভাগ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল কোর্ট চালিয়ে ১ লাখ ৬ হাজার ৪৫০ টাকা জরিমানা করেছে। পাশাপাশি মাঠে কাজ করছে, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর টিম। তাদের সঙ্গে রয়েছে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। ফলে মিথ্যা অজুহাতে বাইরে বের হয়ে জরিমানা গুনছেন অনেকে।

আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় লোকজনের ভিড় দেখা গেছে। অলিগলিতে এদিন দেখা গেছে মানুষের বেশি চলাচল। প্রয়োজন ছাড়াই অনেকে বের হয়েছেন ঘর থেকে।

প্রগতি সরণিতে চেকপোস্টে রয়েছেন সেনাসদস্যরা। এখানে যানবাহন থামিয়ে চালক বা আরোহীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশ বিভিন্ন চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করছে। অপ্রয়োজনে যারা বের হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছে পুলিশ।

কী করেন, কোথায় যাচ্ছেন? ম্যাজিস্ট্রেটের এমন প্রশ্নের জবাবে একটি পার্সেল সার্ভিস কোম্পানির কর্মী বলেন, মিরপুরের অফিসে যাচ্ছি। মোটরসাইকেল অফিসের নাকি নিজের? উত্তরে ওই কর্মী বলেন, অফিসের। ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, কাগজ দেখান। কাগজে দেখা গেল মোটরসাইকেলটি তার নিজের। মিথ্যা বলায় সঙ্গে সঙ্গে তাকে আইনের আওতায় আনা হলো।

এসময় ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিবেদকের দিকে তাকিয়ে বলেন, নিজের চোখেই দেখলেন মানুষ কীভাবে মিথ্যা বলে! মিথ্যা বলার তো কোনো দরকার ছিল না। এভাবেই হরহামেশা নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে অফিসের কাজের কথা বলে মানুষ বাইরে বের হচ্ছে।

চেকপোস্টে তল্লাশির মুখোমুখি হতে হয় প্রত্যেকটি যানবাহনকে : গতকাল রাজধানীর কল্যাণপুর ফুটওভার ব্রিজের নিচে পুলিশ চেকপোস্টে দায়িত্ব পালন করছিলেন ঢাকা জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এম কে ইশমাম।

ওই চেকপোস্টে ঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়ে দেখা যায়, অসংখ্য মানুষ মিথ্যা বলে পার পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কাগজ দেখতে চাওয়ায় সবকিছু গরমিল হয়ে যায়। কেউ যাচ্ছেন সাভারের অফিসে, কেউ মিরপুর। সবারই জরুরি প্রয়োজন। কিন্তু ক্রসচেক করতে গেলেই সব উল্টো হয়ে যায়।

চেকপোস্টে কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের। ওই পথ ধরে যারা রিকশায় যাচ্ছিলেন, সন্দেহ হলে তাদেরও দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করা হচ্ছিল। অজুহাত ঠিকমতো প্রতিষ্ঠা করতে না পারায় বেশ কয়েকটি গাড়ি ঘুরিয়ে দেওয়া হয় ওই চেকপোস্ট থেকে।

অন্যদিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কে এম ইশমাম বলেন, নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বের হয়ে প্রতিষ্ঠানের কাজের অজুহাত দেখাচ্ছেন অনেকেই। এটি মন্ত্রিপরিষদের নির্দেশনার সঙ্গে কোনোভাবেই যাচ্ছে না। অপ্রয়োজনে মানুষ ঘোরাফেরা করছে, লকডাউন দেখতে বেরিয়েছ। এক্ষেত্রে আমরা তাদের জরিমানা করছি। জরুরি সেবার সঙ্গে যারা জড়িত তারা উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে যেতে পারছেন।

এদিকে ঢাকার প্রবেশপথ গাবতলী ব্রিজে চেকপোস্ট বসিয়েছে দারুসসালাম থানা। এই পথ ধরেই উত্তরবঙ্গের সব গাড়ি ঢাকায় প্রবেশ করে। সেখানেও নানা অজুহাতে অনেককে ঢাকায় প্রবেশ করতে দেখা গেছে। তবে উপযুক্ত কারণ ছাড়া পুলিশ কাউকেই এ পথ দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। যৌক্তিক কারণ দেখাতে না পারলে মামলাও দেওয়া হচ্ছে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মাঝেমধ্যে পুলিশের সঙ্গেও ঝগড়ায় জড়াচ্ছেন অনেকে।

এ চেকপোস্টে মো. শিবলু নামে এক শিক্ষার্থীকে জরিমানা করা হয়েছে ২ হাজার টাকা। তিনি জানান, তার বাসা সাভারে। যাচ্ছিলেন উত্তরায় তাদের মুদি দোকানে। পথিমধ্যে এই চেকপোস্টে পুলিশের মুখোমুখি হন তিনি। পুলিশকে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তাকে জরিমানা করা হয়।

মামলার বিষয়ে সার্জেন্ট হারুন বলেন, তিনি দোকানে যাচ্ছেন সেটি নিয়ে আমাদের কোনো বাধা নেই। কিন্তু ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ নেই। তিনি নিজেকে শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। এতে আমরা বুঝতে পারি সরকারি নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তিনি জানেন। তাই সরকারি নির্দেশ অমান্য করায় তাকে জরিমানা করা হয়েছে।

জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ঢাকার বাইরে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছে না পুলিশ : গাবতলী ব্রিজের পুলিশ চেকপোস্টের দায়িত্বে থাকা দারুসসালাম ট্রাফিক জোনের সার্জেন্ট জি এম আবু সুফিয়ান বলেন, বর্তমানে সাধারণ জনগণের মুভমেন্ট অনেক কমে গেছে। যারা ঢাকার বাইরে যাচ্ছেন তারা জরুরি প্রয়োজনেই যাচ্ছেন। কেউ অসুস্থ, কারো আত্মীয়স্বজন মারা গেছেন এমন কারণেই ঢাকার বাইরে যাচ্ছেন অনেকে। আর যাদের মনে হয় অজুহাত দিচ্ছে, তাদের আমরা ফিরিয়ে দিচ্ছি। আজকে এমন একজনকে ফেরত দিয়েছি যার ভাই মারা গেছেন বলে আমাদের জানান। পরে তার বাড়িতে কল দিয়ে জানলাম, কেউ মারা যায়নি। মানুষ এমন করলে আমাদের আর কী করার থাকে।

তিনি আরো বলেন, গার্মেন্টস, শিল্পকারখানা, চিকিৎসা সেবায় যারা আছেন, সাংবাদিক, ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানসহ জরুরি প্রয়োজনে যারা কাজ করে তাদের ঢাকায় ঢুকতে দিচ্ছি। বাকিদের ফিরিয়ে দিচ্ছি, প্রয়োজনে মামলা দিচ্ছি।

এতো সব তৎপরতার মধ্যেও অনেকে অসচেতন মাস্ক ব্যবহারে। নির্দেশনা অমান্য করার তাই শাস্তিও দিয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, কঠোর বিধিনিষেধেও যারা জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হচ্ছে, তাদেরকে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করছে র্যাব। তারপরও যারা নীতিমালা লঙ্ঘন করছে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নিজ নিজ পরিবারের কথা বিবেচনা করে সবাইকে ঘরে থাকার জন্য আহ্বান জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার থেকে চলছে সাতদিনের সর্বাত্মক লকডাউন। যদিও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ১৪ দিনের লকডাউনের পরামর্শ দিচ্ছেন। রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর বলেন, লকডাউনের সুফল দু-একদিনে দিনের মধ্যে পাওয়া যাবে না। এজন্য ভাইরাসে সুপ্তিকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। শহর-গ্রামে মাস্কপরা নিশ্চিত করা গেলে লকডাউনের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হতো না। যদিও ঘরবন্দি হওয়া মানুষের স্বভাবে নেই। যানবাহন, ব্যবসা-বাণিজ্য সব বন্ধ থাকুক এটিও কেউ চায় না। কিন্তু গত দেড় বছরে এই অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত  দফায়, দফায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের সরকারকে নিতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ভ্যাকসিনের অপ্রতুলতা আছে। সেই সাথে আছে ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের অতি সংক্রমণশীলতা। এ অবস্থায় লকডাউন দেওয়া ছাড়া খুব বেশি বিকল্প নেই সরকারের হাতে। এবারের লকডাউন স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষার মাশুলও বটে। অন্তত মাস্ক নিশ্চিত করা গেলে লকডাউনের মতো কঠোর পদক্ষেপ এড়ানো যেতো। 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads