মুক্তমত

কমিউনিটি ক্লিনিক

করোনাকালের সম্মুখযোদ্ধাদের ভাগ্য নিয়ে ভাবতে হবে

  • প্রকাশিত ২৮ জানুয়ারি, ২০২১

কাজী সুলতানুল আরেফিন

 

কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্মচারীরা করোনাকালে সম্মুখযোদ্ধা। তারা যদি মাঠে থেকে সেবা না দিত তবে দেশের মানুষের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে যেত। সেই সাথে দেশে বিশৃঙ্খলা দেখা দিত। এই দেশে মাঠে থেকে সরাসরি সেবা দিয়ে যাচ্ছে কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্মচারীরা। এতে কোনো সন্দেহ নেই। পরামর্শ থেকে সেবার জন্য তারা আজ জনগণের কাছে আস্থাভাজন হয়ে উঠেছে। অথচ এই কর্মীরা আজ নয় বছর এক বেতনে চাকরি করে আসছে। কোনো সুযোগ-সুবিধা পায় না। প্রথমে রাজস্বের আশ্বাস দিয়ে তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে দীর্ঘ এক মাস টানা অবস্থান কর্মসূচি চলাকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট গঠনের ঘোষণা দেন। একই বছর ৮ অক্টোবর জাতীয় সংসদে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট আইন পাস হয় এবং গেজেট প্রকাশিত হয়। উক্ত আইনের ২৪ ধারায় কর্মীদের সরকারি চাকরির মতো সব সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান রাখার কথা বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে আইন কার্যকর হওয়ার দিন থেকে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্পের সবকিছু কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট আইনে পরিচালিত বিধান রাখা হয়েছে। এরপর ঊর্ধ্বতনদের বার বার নির্দেশনার পরও কয়েক বছর অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে তবু আইনটি বাস্তবায়নে গড়িমসি হচ্ছে কর্মকর্তাদের।

এদিকে দিন দিন কর্মী অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করছে। সব কর্মীর দাবি, তাদের চাকরি রাজস্ব করা হোক। নতুবা দ্রুত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে রাজস্বের প্রক্রিয়া শুরু করা হোক! কর্মীদের রাজস্ব করে ক্লিনিক ট্রাস্ট দিয়ে পরিচালিত হলেও তাদের আপত্তি নেই।

কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবাসমূহ হচ্ছে— মহিলাদের প্রসবপূর্ব, প্রসবকালীন, প্রসব-উত্তর অত্যাবশ্যকীয় সেবা প্রদান এবং কোনো জটিলতা দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব জরুরি প্রসূতি সেবা কেন্দ্রে প্রেরণ করা; সদ্য প্রসূতি মা (৬ সপ্তাহের মধ্যে) ও শিশুদের (বিশেষ মারাত্মক পুষ্টিহীন, দীর্ঘমেয়াদি ডায়ারিয়া এবং হামে আক্রান্ত) ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল প্রদান; মহিলা ও কিশোরীদের রক্তস্বল্পতা শনাক্ত করা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান; কিশোর-কিশোরীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ প্রদান; ইপিআই শিডিউল অনুযায়ী শিশুদের প্রতিষেধক (যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, হুপিং কফ, পোলিও, ধনুষ্টংকার, হাম, হেপাটাইটিস-বি এবং ১৫-৪৯ বছর বয়সি মহিলাদের ধনুষ্টংকার প্রতিষেধক) টিকাদান; পনেরো বছর বয়সের নিচের শিশুদের মধ্যে সন্দেহজনক একিউট ফ্ল্যাসিড প্যারালাইসিস (এএফপি) শনাক্ত করে রেফার করা; এক থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের ছয় মাস পরপর প্রয়োজনীয় পরিমাণ ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো এবং রাতকানা রোগে আক্রান্ত শিশুদের খুঁজে বের করে চিকিৎসা প্রদান। ডায়ারিয়া আক্রান্ত রোগীকে খাওয়ার স্যালাইন ও জিংক বড়ি (শিশুদের ক্ষেত্রে) সাহায্য চিকিৎসা; সদ্যবিবাহিত ও অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের নিবন্ধনকরণ এবং সম্ভাব্য প্রসব তারিখ সমাগত হলে যোগাযোগ করা; জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করা; এবং নবজাতকের অত্যাবশ্যকীয় সেবা প্রদান। এছাড়াও করোনাকালে স্বাস্থ্য শিক্ষা, জরুরি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রদানসহ এসব কর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্যাম্পল কালেকশন করেছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সার্ভারে নিয়মিত তথ্য আপলোড করতে হয় তাদের। এক কথায় এসব কর্মীর কাজের অভাব নেই। কিন্তু এদের প্রতি কোনো এক মহলের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে!

বেতন না বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে এখন ১৩ হাজার ৪৪২টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু আছে। এসব ক্লিনিক থেকে মাসে গড়ে ৯৫ লাখ মানুষ বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নেয়। কমিউনিটি ক্লিনিক চালু হওয়ার পর থেকে উপজেলা হাসপাতালে রোগীর চাপ কমেছে।

একজন কর্মীর টাইমলাইন থেকে— ‘আমি একজন স্বাস্থ্যকর্মী। আমার পদবি সংক্ষেপে সিএইচসিপি। যার পূর্ণ রূপ হলো কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার। কর্মস্থল কমিউনিটি ক্লিনিক। আমি এবং আমার সব সহকর্মী করোনাকালের নীরব মহাযোদ্ধা। চরম ঝুঁকির মধ্যেও আমরা গ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। এই ক্রান্তিলগ্নে যখন কিছু মানুষ বাইরে সেবা নিতে যেতে পারছে না, তখন আমরা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। এমনকি মোবাইলেও রাত-দিন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। আমরা যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যাইনি! আমি নিজেকে নিয়ে মোটেও চিন্তা করি না। এমন ঝুঁকিতে কাজ করে যখন ঘরে ফিরি তখন আমার ছোট ছোট শিশুদের জন্য চিন্তা হয়। পরিবার-পরিজনের কথা চিন্তা হয়। ভয়ে থাকি আমার জন্য কখন তারা বিপদে পড়ে। আমার জন্য তারা দু-রকমের ঝুঁকিতে আছে। একটি হচ্ছে করোনা ঝুঁকি। অন্যটি হচ্ছে আমি মরে গেলে তারা একটি শোকবার্তা ছাড়া কিছু পাবে কি-না এখনো সন্দেহ আছে! তবু দেশের এই চরম ক্রান্তিকালে আমি/আমরা সেবা দিয়ে যাব। অনবরত ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করে যাব। প্রয়োজনে দেশের জন্য আত্মত্যাগ করে যাব।

তবু আমার/আমাদের মনে লুকানো কষ্ট মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে ওঠে। দুঃখগুলো নড়ে ওঠে। দীর্ঘশ্বাসগুলো চেপে রাখতে পারি না। আমার দুজন সহকর্মী করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। অনেকজন করোনা পজিটিভ। আমার অসংখ্য সহকর্মী দুঃখ-কষ্ট বুকে চাপা নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। আমি কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করব না। অভিযোগ করতে পারব না।

প্রধানমন্ত্রীর শতচেষ্টার পরেও এদেশে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে থাকা কিছু বাজে সিস্টেম দেশকে কুরে কুরে খাচ্ছে। লুটেরা লুটে নিচ্ছে। আর যোগ্যরা বঞ্চিত হচ্ছে। সবচেয়ে বেদনার কথা হচ্ছে, যা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তা না দেখার ভান করে আছে অনেকেই। এমনকি অধিকারের কথা বলা যাবে না বলেও সতর্ক করা হচ্ছে!

কিন্তু আর কতকাল? সোনালি সূর্য কেউ দমিয়ে রাখতে পেরেছিল কোন দিন? একদিন সেই সোনালি সকাল আসবে। সূর্যের আলো সব অস্থায়ী কালো মেঘ সরিয়ে ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশে। হটে যাবে হঠকারি আর দুর্নীতিবাজরা। সিএইচসিপিদের জয়ের উল্লাসে মাতোয়ারা হবে সারা বিশ্ব। দেশের সবাই বুক ফুলিয়ে গর্ব করবে কমিউনিটি ক্লিনিক নিয়ে। হয়তো সেদিন বা সে সকাল আমি কিংবা আমার কিছু সহকর্মী দেখে যেতে পারব না!’

ইতোমধ্যে কমিউনিটি ক্লিনিক দায়িত্ব পালনকালে বহু সিএইচসিপি অকাল মৃত্যুবরণ করেছেন। সেবা দিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়েও অনেক কর্মী মারা গেছেন। কিন্তু সরকার বা প্রকল্পের পক্ষ থেকে কর্মীর পরিবারকে কোনো আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয় না, শুধু একটি শোকবার্তা চিঠিতে সীমাবদ্ধ। এছাড়া এসব কর্মী ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত থাকে সবসময়। নানা অজুহাতে তাদের সঠিক পাওনা বুঝিয়ে দিতে গড়িমসি করা হয়। ছুটি ভোগ করা তাদের কাছে অনেকটা ‘সোনার হরিণের’ মতো!

প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার দেওয়া এই প্রকল্পের কর্মীদের বঞ্চিত করে কার লাভ হচ্ছে কিংবা দেশের কী লাভ হচ্ছে এখন সেই প্রশ্ন অনেকের মনে। নতুন বছরের শুরুতেই কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্মচারীরা ভাগ্যের পরিবর্তন দেখতে চায়।

 

লেখক : নিবন্ধকার

arefin.feni99@gmail.com

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads