করোনামুক্ত হওয়ার পরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছেন, তাদের মধ্যে শর্ট ও লং টার্ম জটিলতা রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় লং কোভিড বা লং হলার্স। এরমধ্যে আছে সিভিয়ার মেন্টাল হেলথ সমস্যা, অনিদ্রা, স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া, ক্রনিক ফ্যাটিগ বা ভীষণ অবসাদগ্রস্ত, দুর্বলতা, হূৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ক্রনিক হাইপোক্সিয়া (অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম), মাংসপেশীতে ব্যথা, চুল পড়ে যাওয়া, ইত্যাদি।
করোনামুক্ত হওয়ার প্রায় আট মাস পরও ধকলমুক্ত হতে পারেননি জুনায়েদ। তিনি বলেন, করোনা পজিটিভ রিপোর্ট পান গত বছরের ২৫ অক্টোবর। এক মাস পর আসে নেগেটিভ রিপোর্ট। এসময় তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়নি। বাসায় থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধসহ খাওয়া-দাওয়া ও ব্যায়াম করে সুস্থ হন। তিনি আরো বলেন, আগে উচ্চ রক্তচাপ ছিল না, এখন সেটাও ধরা পড়েছে। টানা দুমাস ওষুধ খেতে হয়েছে। তবু মাঝে মাঝে হূৎস্পন্দন বেড়ে যায়। সঙ্গে যোগ হয়েছে ভুলে যাওয়ার সমস্যা। করোনা কেটে যাওয়ার প্রথম দুই মাস এ সমস্যা ছিল। মাঝে ছিল না। সাত-আট মাস পর এখন আবার প্রকট হয়েছে।
জুনায়েদ বলেন, কাউকে হয়তো কল করার জন্য ফোন হাতে নিয়েছি, কিন্তু ভুলে গেলাম কেন ফোন হাতে নিয়েছি। এ সময়ে তার ওজনও কমেছে প্রায় পাঁচ কেজি। ক্ষুধাও চলে গেছে। এ কারণে খাওয়া হয় না সময়মতো। তবে বড় সমস্যা হচ্ছে প্যানিক অ্যাটাক। এটা এক দুর্বিষহ যন্ত্রণা, বললেন জুনায়েদ। আরো জানালেন, কেমন একটা মৃত্যুভয় সব সময় তাড়িয়ে বেড়ায়। তখন ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। ৩০ বছরের রুবেল করোনায় আক্রান্ত হন জুনের প্রথম সপ্তাহে। দুবলর্তা, ক্ষুধা না লাগা, ভুলে যাওয়ার সমস্যায় ভুগছেন এখনও।
বেসরকারি চাকরিজীবী ফাহমিদা আক্তার গত ডিসেম্বরে করোনায় আক্রান্ত হন বাড়ির পাঁচ সদস্যসহ। ফাহমিদা বলেন, তারা করোনা থেকে সেরে উঠেছেন, কিন্তু প্রভাবমুক্ত হতে পারেননি।
আগে সমস্যা না থাকলেও ফাহমিদার এখন মাঝে মাঝে শ্বাসকষ্ট হয়। ওষুধ খেতে হয় প্রতিদিন চারটা করে। রাতে ওষুধ খেতে ভুলে গেলেই ভোররাতে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এ কষ্ট কত তীব্র, বোঝানো যাবে না, বলেন ফাহমিদা। করোনা সারলেও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন জটিলতা থেকেই যায়। একে লং কোভিড বলে আসছেন চিকিৎসকরা।
বিদেশের মেডিকেল জার্নালসহ আমাদের চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, করোনায় যখন কেউ আক্রান্ত হন তখন শরীরের কিছু কিছু অঙ্গ, যেমন হূৎপিণ্ড, কিডনি, মস্তিষ্ক, লিভার, ফুসফুসে ড্যামেজ হচ্ছে। কিন্তু করোনা সেরে গেলেও ওই অঙ্গগুলো সেরে উঠছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্বাসতন্ত্র বিষয়ক চিকিৎসক ডা. ডিয়াজ বলেন, লং কোভিডে কতজন আক্রান্ত হয়েছেন, কী কারণে এমন হচ্ছে তা নিয়ে আরো গবেষণা লাগবে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০ জনে ১ জন আক্রান্তের মধ্যে একমাস পরও দীর্ঘমেয়াদি উপসর্গ থাকে। তবে কতদিন সেটা স্থায়ী হবে তা জানা যায়নি। বিশেষ করে বয়স্ক ও আগে থেকে জটিলতায় ভোগা মানুষরা এতে আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি।
তবে আক্রান্তদের সবার পরিস্থিতিই যে একই রকম হয় না, তা জানিয়ে ডিয়াজ বললেন, রোগের তীব্রতার মাত্রা একেক জনের একেক রকম। শিশুদেরও এটা হতে পারে।
তিনি জানান, কোভিড-পরবর্তী জটিলতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় অবসাদ। এ ছাড়া রয়েছে, উত্তেজিত হওয়ার জটিলতা, মনোযোগ না থাকা, স্মৃতিশক্তি কমা, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় করা ও স্নায়ুবিক সমস্যা। এমনটা কি ভাইরাসের কারণে নাকি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ভিন্নতার কারণে হচ্ছে, তা জানতে আরো গবেষণা দরকার।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, বাংলাদেশে লং কোভিড নিয়ে পরিপূর্ণ তথ্য নেই, কিন্তু অনেকেই চিকিৎসকদের কাছে যাচ্ছেন এই সমস্যা নিয়ে। কারো দীর্ঘ সময় জ্বর এবং কারো ফ্যাটিগ (ক্লান্তি বা অবসাদ বোধ করা) থেকে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, অনেকে করোনা থেকে সেরে উঠার ১২ সপ্তাহ পরও ফুসফুস ও হার্টের সমস্যায় ভুগছেন। করোনামুক্ত হওয়ার পর হার্টের সমস্যা নিয়ে এসেছেন এমন কয়েকজন রোগীকে আমি নিজেই চিকিৎসা করছি- জানিয়ে রোবেদ আমিন বলেন, যারা কোভিড থেকে সেরে উঠছেন তাদের প্রথম ফলোআপটা যেন দুই সপ্তাহের ভেতরেই হয়। তাদের অন্তত দুই থেকে আড়াই বছর ফলোআপে রাখতেই হবে।
তিনি আরো বলেন, করোনা থেকে একবার সেরে উঠলেই যে সম্পূর্ণ প্রটেকশন পেয়ে গেছেন এটা ভাবারও সুযোগ নেই। সেরে উঠলেও সব স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। কারণ, এখন অনেক ভ্যারিয়েন্ট রয়েছে।





