ইমরান হুসাইন
করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে সারা বিশ্বের দুই শতাধিক দেশের মতো বাংলাদেশও ব্যাপকভাবে করোনার এই ভয়াল থাবায় আক্রান্ত। এর প্রভাবে জনজীবন হয়ে উঠেছে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত। পাল্টে গেছে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের গতিধারা। করোনার এই ভয়াবহ অবস্থার কারণে দেশে চলছে কঠোর লকডাউন। চারদিকে এত মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত করে তুলেছে মানুষকে। সমাজের মানুষ যখন আতঙ্কিত এবং বেশ হতাশাজনকভাবে সময় কাটাচ্ছে, তার মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে মানুষের কর্মহীনতা, অর্থনৈতিক মন্দা।
করোনাকালে সবারই আয় কমেছে। দেশে একের পর এক লকডাউনের প্রভাবে বর্তমানে সীমিত ও নিম্ন-আয়ের মানুষ এক প্রকার দিশাহারা। কেউ একেবারেই কাজ হারিয়েছে, আবার কেউ স্বল্প পরিমাণ আয় করছে। এ অবস্থায় চরম বিপাকে দিন কাটাচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষ। ঠিক এমন দুঃসময়ে নিত্যপণ্যের বাজারের ঊর্ধ্বগতি মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন-আয়ের মানুষের জীবন ধারণের ক্ষেত্রে বাধাস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২ জুলাই প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, সর্বাত্মক লকডাউনের অজুহাতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে হুহু করে। সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার পরও বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে দশটি পণ্য বাড়তি দরে বিক্রি হয়েছে। এগুলো হচ্ছে—চিনি, পেঁয়াজ, আলু, মাছ, সবজি, দারুচিনি, হলুদ, শুকনা মরিচ, আদা ও গুঁড়ো দুধ।
অন্যদিকে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দৈনিক বাজার পণ্যমূল্য তালিকায় দেখা যায়, এক দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি আলুর দাম বেড়েছে ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ। দুদিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি দেশি আদা ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ, দারুচিনি ৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ, গুঁড়োদুধের মধ্যে ডানো ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ ও হলুদ ২২ দশমিক ২২ শতাংশ দাম বেড়েছে। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রায় সব ধরনের মাছের দাম কেজি প্রতি ২০ থেকে ১০০ টাকা এবং বিভিন্ন ধরনের সবজির দামও কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। প্রতিবেদনে আরো দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাজারে পণ্যমূল্যের তারতম্যও লক্ষণীয়।
দাম বাড়ার কারণে দোকানদারদের অজুহাত পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে মালামাল আনতে হয়েছে। সাধারণত কোনো দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পায় তখনই যখন বাজারে ক্রেতাদের চাহিদার তুলনায় দ্রব্যের জোগান কম থাকে। লকডাউনের কারণে দেশের অন্য সবকিছু বন্ধ থাকার নির্দেশনা থাকলেও, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকানগুলো নিয়ম মেনে খোলা থাকার নির্দেশনা রয়েছে এবং সেইসঙ্গে এসব নিত্যপণ্যের যেন ঘাটতি না থাকে সে কারণে কাঁচামালের গাড়ি ও মুদিখানার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের চলাচলের অবাধ সুযোগ রয়েছে। সে অনুযায়ী সংকটজনিত কারণে দেশের কোনো পণ্যের হঠাৎ দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু তারপরও বিক্রেতারা লকডাউনের অজুহাত দেখাচ্ছে।
লকডাউনের অজুহাতে অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় যেসব কালোহাতের ইশারায় দেশের এই সংকটময় সময়ে দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি ঘটছে, সেসব কালোহাতকে অতি দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণকারী এই হোতাদের স্বেচ্ছাচারিতা সমাজের নিম্ন-আয়ের মানুষের জীবন ধারণের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে হঠাৎ করেই যখন দ্রব্যের দাম বেড়ে যায়, স্বাভাবিকভাবেই বিপাকে পড়ে স্বল্প আয়ের মানুষ। কারণ এই লকডাউনে দ্রব্যের দাম বাড়লেও বাড়েনি তাদের আয়। বরং বেতন কমেছে নতুবা বকেয়া রয়েছে কয়েক মাস। উপরন্তু লকডাউনের অজুহাত তুলে চাকরি থেকে ছাঁটাই করাও হয়েছে অসংখ্য পেশাজীবীকে। এরূপ পরিস্থিতিতে আবার যদি দ্রব্যের দাম বাড়ে তাহলে ভবিষ্যতে অন্ধকার ছাড়া আলোর কোনো দিশা থাকে না।
আমরা এর আগেও দেখেছি, দেশে দ্রব্যের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকটের চিত্র। কখনো পেঁয়াজের দাম, কখনো আলু, আবার কখনো সবজি, কখনো পর্যাপ্ত উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও বেড়েছে চালের দাম। সুতরাং পর্যাপ্ত জোগান থাকা সত্ত্বেও যেন দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তিতে না পড়তে হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে এই করোনাকালে। যদি সত্যিই কোনো পণ্যের সংকট থাকে বাজারে, তার চাহিদা নিরূপণ করে আগে থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকে, সেইসঙ্গে বাজার মনিটরিং করা জরুরি। কথিত আছে, সরকারের বাজার মনিটরিং সেল রয়েছে বা প্রয়োজনে তা করা হলেও এর কার্যকারিতা কখনোই সাধারণ মানুষ খুব একটা ভোগ করেনি। করোনার দুঃসময়ে এই বিষয়টিও সরকারকে ভাবতে হবে। সর্বোপরি সিন্ডিকেটচক্র না ভাঙতে পারলে বাজারব্যবস্থায় কখনোই সরকার সফলতার মুখ দেখবে না, এটাই স্বাভাবিক। করোনা মহামারিতে সাধারণ স্বল্প আয়ের মানুষকে বাঁচাতে বজারদর নাগালের মধ্যে রাখুন।
লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা





