কাল থেকে চলাচলে মানতে হবে কঠোর বিধিনিষেধ

ফাইল ছবি

জাতীয়

কাল থেকে চলাচলে মানতে হবে কঠোর বিধিনিষেধ

  • মোহসিন কবির
  • প্রকাশিত ১৩ এপ্রিল, ২০২১

করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে কাল থেকে চলতি বছর দ্বিতীয় দফায় আবারো কঠোর লকডাউনে যাচ্ছে পুরো দেশ। তবে এবার আর প্রথম দফার মতো ঢিলেঢালা নয়। সর্বাত্মক লকডাউনের ঘোষণা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ১৩ দফা নির্দেশনাসহ এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। উপসচিব মো. রেজাউল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে ১৪ এপ্রিল ৬টা থেকে ২১ এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত নির্দেশনাগুলো কঠোরভাবে মেনে চলার কথা বলা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে জারি করা নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে-১. সব সরকারি-আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, বেসরকারি অফিস ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। ২. সব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করবে, তবে বিমান, সমুদ্র ও স্থলবন্দর এবং তৎসংশ্লিষ্ট অফিসসমূহ এ নিষেধাজ্ঞা আওতাবহির্ভূত থাকবে। ৩. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আদালতসমূহের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করবে। ৪. সব ধরনের পরিবহন (সড়ক, নৌ, রেল, বিমান) বন্ধ থাকবে। তবে পণ্য পরিবহন, উৎপাদন ব্যবস্থা ও জরুরি সেবা এ আদেশের বাইরে থাকবে।

৫. শিল্প কারখানা স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালু থাকবে। ৬. অতি জরুরি প্রয়োজন (ওষুধ ও পণ্য, চিকিৎসা, লাশ সৎকার) ব্যতীত কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে যাওয়া যাবে না। তবে টিকা কার্ড দেখিয়ে টিকা গ্রহণের জন্য যাতায়াত করা যাবে। ৭. খাবারের দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা এবং রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কেবল খাদ্য বিক্রয় ও সরবরাহের জন্য খোলা রাখা যাবে। ৮. শপিংমল ও দোকানপাট বন্ধ থাকবে। ৯. কাঁচাবাজার ও নিত্যপণ্যের বাজারে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত খোলা স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে। ১০. বোরো ধান কাটার জরুরি প্রয়োজনে কৃষিশ্রমিক পরিবহনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন সমন্বয় করবে।

১১. স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে জুমা ও তারাবির নামাজের জামাত বিষয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয় নির্দেশনা দেবে, তা মানতে হবে। ১২. সারা দেশে জেলা ও মাঠ প্রশাসন এ সমস্ত নির্দেশনা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাতে সহায়তা করবে। ১৩. আইনশৃঙ্খলা ও জরুরি পরিষেবা, যেমন কৃষি উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি), খাদ্য শস্য ও খাদ্য দ্রব্য পরিবহন, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা (-কোভিড-১৯-এর টিকা প্রদান), বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, বন্দরসমূহ, টেলিফোন, ইন্টারনেট সেবা, গণমাধ্যম, বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ডাক সেবাসহ অন্যান্য জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিসসমূহ, তাদের কর্মচারী ও যানবাহন এ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।

তবে জরুরি প্রয়োজনে একান্তই বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হলে তাদের জন্য ‘মুভমেন্ট পাস’র ব্যবস্থা করছে পুলিশ। এই পাসধারী ব্যক্তি হয়রানি ছাড়াই চলাচল করতে পারবেন।  শুধু জরুরি  সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দেওয়া হবে এ পাস। তারা এই পাস ব্যবহার করে কাজে যেতে পারবেন।

আজ রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মুভমেন্ট পাস’ অ্যাপ্লিকেশনটির উদ্বোধন করবেন বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ। গতকাল পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, সদর দপ্তরের আইসিটি উইংয়ের সমন্বয়ে শুরু হতে যাচ্ছে ‘মুভমেন্ট পাস’ কার্যক্রম। জরুরি পণ্য পরিবহন, সেবাদাতা, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের যাচাই-বাছাই করে দেওয়া হবে এই পাস।

এ ছাড়া, মুদি দোকানে কেনাকাটা, কাঁচাবাজার, ওষুধপত্র, চিকিৎসা কাজে নিয়োজিত, কৃষিকাজ, পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ, ত্রাণ বিতরণ, পাইকারি/খুচরা ক্রয় পর্যটন, মৃতদেহ সৎকার, ব্যবসা ও অন্যান্য ক্যাটাগরিতে দেওয়া হবে এই পাস। যাদের বাইরে চলাফেরা প্রয়োজন কিন্তু কোনো ক্যাটাগরিতেই পড়েন না, তাদের অন্যান্য ক্যাটাগরিতে পাস দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। পাসটি পেতে  https://movementpass.police.gov.bd/  এই ওয়েবসাইটে গিয়ে আবেদনের জন্য বলা হয়েছে।

এর আগে  সংক্রমণ ঠেকাতে ২৯ মার্চ ১৮ দফা নির্দেশনা দেওয়ার পর ৫ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত এক সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণা করা হয়। তবে সেই লকডাউন কার্যত যথাযথভাবে প্রতিপালিত হয়নি। বরং লকডাউনে ঢিলেঢালাভাব থাকায় এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। 

এদিকে দ্বিতীয় দফায় করোনার এই ঢেউকে সুনামির সঙ্গে তুলনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোতে মিলছে না সাধারণ বেড। আর মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে আইসিইউ বেডের। চিকিৎসকরা বলছেন, এভাবে রোগী বাড়তে থাকলে হাসপাতালে জায়গা দেওয়া যাবে না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। তাই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জোর দিয়েছেন তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাবলিক মুভমেন্ট অনেক বেড়ে যাওয়ার ফলে সংক্রমণ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যায়। এটি নিয়ন্ত্রণে তাই লকডাউন লাগবেই। জাতীয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ বলেন, ১৮ দফা নির্দেশনা মানুষ মানছে না। এ কারণেই কমিটি দুই সপ্তাহ লকডাউনের সুপারিশ করেছে। তিনি বলেন, দুই সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগে সংক্রমণের হার বিবেচনা করে লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর উপদেষ্টা এবং মহামারী বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, এর আগে যেসব এলাকায় লকডাউন দেওয়া হয়েছিল তাতে দেখা গেছে, সেখানে সংক্রমণ বাড়তে পারেনি। লকডাউনের ফলে যদি সবাই ঘরে থাকে তবে সংক্রমণ কমবেই।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ১৪ এপ্রিল ভোর ৬টা থেকে থেকে ২১ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত সব ধরনের পরিবহন (সড়ক, নৌ, রেল, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট) বন্ধ থাকবে। তবে পণ্য পরিবহন, উৎপাদন ব্যবস্থা ও জরুরি সেবাদানের ক্ষেত্রে এই আদেশ প্রযোজ্য হবে না বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। শিল্প-কারখানাসমূহ স্বাস্থ্য বিধি অনুসরণ করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালু থাকবে। এ জন্য শ্রমিকদের স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আনা-নেওয়া নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা অনুযায়ী দিনের দুই ভাগে অর্থাৎ, দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা এবং রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত খাবারের দোকান ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় কেবল খাদ্য বিক্রয়/সরবরাহ করা যাবে। তবে শপিংমলসহ অন্যান্য দোকান বন্ধ থাকবে।

এদিকে গত বছরের মতো এবারো পবিত্র রমজানে তারাবিসহ অন্যান্য নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি। গত বছরের ৬ এপ্রিল মুসল্লিদের ঘরে নামাজ পড়ার নির্দেশ দিয়েছিল সরকার।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads