শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি:
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। ওই দিন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পল্লী বিদ্যুৎ মোড়ে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করে বিক্ষুব্ধ ছাত্রজনতা।এ অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেয় ছাত্র-জনতা ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। ঐ দিন আন্দোলনে যোগ দেয় জাকির হোসেন রানা।দুপুর ১২টার সময় ময়মনসিংহের নেত্রকোনা থেকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নিজস্ব পরিবহন ও বাসযোগে সড়কপথে গণভবনে যাওয়ার সময় ঢাকা -ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনা চৌরাস্তা পল্লী বিদ্যুৎ মোর নামক স্থানে আসলে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার তোপের মুখে পড়ে।
এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতার কবলে পড়ে যায় তারা। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা তাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। এ সময় বিক্ষুব্ধ ছাত্র জনতা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিতে চায়।পরে বিকেল ৩টার দিকে অবস্থা বেগতিক দেখে বিজিবির সদস্যরা এলোপাথারি গুলি শুরু করেন।এ সময় গুলিতে নিহত হন জাকির হোসেন রানা।পরের দিন বিকেলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তাঁর লাশ নেওয়া হয় বাড়িতে। সন্ধ্যায় তাঁর দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়। জাকির হোসেন রানা উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের কপাটিয়াপাড়া গ্রামের জামাল উদ্দিনের একমাত্র ছেলে।
সে স্থানীয় ঢাকা ফারইস্ট লিমিটেড নামক একটি কারখানায় জুনিয়র ইন্সপেক্টর পদে চাকরি করতেন ।তাঁর আয়ে চলত স্ত্রী সহ পাঁচ সদস্যের সংসার। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন দিশেহারা পরিবারটি।খেয়ে না খেয়ে দিন কাটলেও কেউ পাশে দাঁড়ায়নি তাদের। গতকাল মঙ্গলবার রানার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়,বাবা জামাল উদ্দিন ছেলের শোকে পাগলপ্রায়।লোকজন দেখলেই আহাজারি করছেন। তিনি বলেন,বাড়ি ভিটা ছাড়া কোনো জমি নাই আমাদের। আমি নিজেও অসুস্থ, উপার্জনের আর কেউ নেই।জাকির হোসেন রানার চাচাতো ভাই মাসুদ বলেন, রানার সাথে আমিও আন্দোলনে গিয়েছিলাম।
গুলিবিদ্ধ রানাকে প্রথমে স্থানীয় আলহেরা হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখান থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। আহত রানাকে ময়মনসিংহ নেওয়ার পথে ভালুকায় মারা যায়। পরে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। সেখান থেকে (৬ আগস্ট) বিকেল ৩ টায় রানাকে নিজ বাড়িতে আনা হয়। এবং ওইদিন সন্ধ্যায় দাফন সম্পন্ন হয়। জাকির হোসেন রানার চাচাতো ভাই আরও বলেন, উচ্চমাধ্যমিক পাস করেই সংসারের হাল ধরেন তার ভাই। চার বছর আগে বিয়ে করেন। তাঁর সংসারে একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।নাম ইমলা।
ছাত্র আন্দোলন শুরু হলে কাজে যাওয়া বন্ধ হয় তার।ওইদিন তার বাবা তাকে আন্দোলনে যেতে নিষেধ করলে বলেন,এলাকার কেউ ঘরে বসে নেই, সবাই মাঠে নেমেছে। আমি একা ঘরে থেকে কী করব?রানার পিতা জামাল উদ্দিন বলেন, দুপুর ১২ টার দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় রানাকে প্রশ্ন করলে বলে- সে আন্দোলনে যাবে। আমি তাকে আন্দোলনে যেতে নিষেধ করি, পরে রানা বলে বাড়ির পাশে বাগান মোড় যাবে।
কে জানিত এটাই রানার শেষ যাওয়া। বিকেলে ফোনে খবর পাই আমার একমাত্র ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।খবর শোনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। রানার স্ত্রী মুন্নি আক্তার কান্নাজরিত কন্ঠে বলেন, একটা গুলিতে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল সোনার সংসার।আমার স্বামী ছিল সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যাক্তি। সংসারে পাঁচ বছর বয়সী ইলমা নামক এক কন্যা সন্তান রয়েছে। সংসারের হাল ধরার মতো আর কেউ নেই, ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখছি। এমতাবস্থায় কীভাবে সংসার চলবে ভেবে পাচ্ছি না।সংসার কীভাবে চলে,খোঁজ নেয় না কেউ।





