নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন নিয়ে সবার নজর এখন বঙ্গভবনের দিকে। সার্চ কমিটির তালিকায় কোন ১০ জনের নাম আছে, তা প্রকাশ না করায় তালিকায় কারা আছেন, তা নিয়ে চলছে ব্যাপক গুঞ্জন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) সহ কারা থাকছেন এবার ইসিতে, তা নিয়ে দেশের মানুষ ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। তবে সিইসি হিসাবে আলোচনায় আছেন সাবেক তিন সচিব।
এদিকে নতুন ইসিতে কারা আসছেন তা নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর। নির্বাচনে কারচুপির লক্ষ্যে সরকার সার্চ কমিটির নাটক করছে বলে অভিযোগ করছেন দলের নেতারা। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ আমলে না নিয়ে আওয়ামী লীগ বলছে আইনানুযায়ী একটি শক্তিশালী ইসি গঠনে কাজ করছে সরকার।
এর আগে গত মঙ্গলবার সার্চ কমিটির বৈঠকে ১০ জনের তালিকা চূড়ান্ত হয়। আজ বৃহস্পতিবার কমিটি এই তালিকা রাষ্ট্রপতির হাতে তুলে দেবে। তালিকা থেকে রাষ্ট্রপতি পাঁচজনের সমন্বয়ে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করে দেবেন।
এদিকে সিইসি হিসাবে খুব জোড়ালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইঞা ও শফিউল আলম এবং সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব কাজী হাবিবুল আউয়াল। এছাড়া বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যমতে, সিইসি হিসাবে সম্ভাব্য আরো কয়েক জনের নাম বেশি আলোচিত হচ্ছেন। তারা হলেন-পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক, পুলিশের সাবেক আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক সচিব কামরুন নাহার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদুর রহমান খান, সাবেক হাইকমিশনার (লন্ডন) এম এ হান্নান, সাবেক স্বাস্থ্য সচিব সিরাজুল হক খান ও সাবেক যুগ্ম সচিব মো. আবুল কাশেম। তবে শেষ মুহূর্তে কে হতে পারে, তা নিয়ে বঙ্গবভনের দিকে তাকিয়ে আছেন সবাই।
মোশাররফ হোসেন ভূঁইঞা : তিনি বাংলাদেশের ২০তম মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি নরসিংদীর মনোহরদীর লেবুতলা ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। অস্ট্রেলিয়ার পার্থে অবস্থিত কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাবলিক সেক্টর ম্যানেজমেন্ট ও পাবলিক পলিসি সম্পর্কে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।
কর্মজীবনে মোশাররফ হোসেন ভূঁইঞা ১৯৮১ সালের বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের প্রশাসন ক্যাডারের সদস্য হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। চাকরিজীবনে তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সহকারী কমিশনার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ উপজেলা ও জেলায় বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়া তিনি পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য, বাংলাদেশ তৈল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) বিকল্প গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শফিউল আলম : তিনি বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন। এর আগে তিনি মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের ২১তম মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছিলেন। ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর ২০১৯ থেকে ৩ বছরের জন্য বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান।
প্রারম্ভিক জীবনে শফিউল আলম ১৯৫৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়নের রুমখা পালং গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছৈয়দ হোসাইন ও মাতার নাম আলমাছ খাতুন। তিনি ১৯৭৫ সালে স্থানীয় পালং মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, জগন্নাথ কলেজ ১৯৭৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক ও ১৯৭৯ সালে ওমরগণি এমইএস কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯০ সালে তিনি চট্টগ্রাম বঙ্গবন্ধু ‘ল’ টেম্পল থেকে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। এছাড়ও ১৯৯৪ সালে ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘উন্নয়ন প্রশাসন’ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনে শফিউল আলম ১৯৮২ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হন এবং ১৯৮৩ সালের ২৭ অক্টোবর সহকারী কমিশনার ও ৩য় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বান্দরবান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে, ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ঢাকায় রাজউক-এর ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবেও তিনি চার মাস কাজ করেন।
এছাড়ও তিনি বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ পদে যথা মাগুরা ও ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের এমডিএস, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের এবং বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান, রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের (বর্তমান সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়) অতিরিক্ত সচিব, রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের সচিব, ভূমি আপীল বোর্ডের চেয়ারম্যান (সচিব) এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ২৯ অক্টোবর ২০১৫ তারিখ থেকে তিনি বাংলাদেশের ২১তম মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কাজী হাবিবুল আউয়াল : তিনি মেধাবী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার পরও সেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে থাকেননি। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রতিরক্ষা সচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি একজন কর্মঠ, সৎ এবং ব্যক্তিত্ববান মানুষ হিসেবে পরিচিত। তবে শেষ পর্যন্ত এই তিনজন হবেন নাকি এর বাইরেও কেউ প্রধান নির্বাচন কমিশনার হবেন তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে যে, যদি শেষ পর্যন্ত ১০টি নাম অনুসন্ধান কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে দেন, তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিপরীতে দুটি নাম দেওয়া হতে পারে। সেক্ষেত্রে এই তিনটি নামই অগ্রাধিকার পাবে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুস সালাম বলেন, নতুন ইসি ইতিহাসের কালো তালিকাভুক্ত হবেন। তাই যারা পরবর্তী নির্বাচন কমিশনার হতে চাচ্ছেন, বার বার বলছি আমরা সবাইকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু সেই নির্বাচন কমিশনে গিয়ে আপনারা কোনো কাজ করতে পারবেন না। যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকে, প্রধানমন্ত্রী চেয়ারে বহাল থাকেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকেন, সব মন্ত্রী থাকেন—তাহলে আপনারা নির্বাচন কমিশনে বসে কী করবেন।
পরবর্তী কমিশনের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারবেন? কোনোভাবে সম্ভব না। তাই এখনো সময় আছে। আমরা চাই, দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আল্লাহর ওয়াস্তে কমিশনার হিসেবে যাদের নাম ঘোষণা করা হবে, দেশের জন্য এবং দেশকে ভালোবেসে স্বেচ্ছায় তারা নাম প্রত্যাহার করবেন।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, যে কোনো কিছুকেই বিএনপি বিতর্কিত করে। আইন মেনেই আগামী ইসি গঠন হচ্ছে। একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের অধীনেই দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হবে বলে তিনি জানান।





