ক্লু-লেস মামলার আসামি শনাক্ত হচ্ছে ডিএনএ ল্যাবে

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

সিআইডির ডেটাব্যাংকে প্রায় ৩৩ হাজার প্রোফাইল

ক্লু-লেস মামলার আসামি শনাক্ত হচ্ছে ডিএনএ ল্যাবে

  • ইমরান আলী
  • প্রকাশিত ২১ ডিসেম্বর, ২০২১

রংপুর পীরগঞ্জের মাদরাসার ছাত্রী ফাতেমাকে হত্যার পর রশিতে ঝুলিয়ে রেখে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কোনো কুলকিনারা না করতে পারায় ধামাচাপা পড়ে যায় মামলাটি। দীর্ঘ ৬ বছর পর ডিএনএ ল্যাবে ফরেনসিক পরীক্ষায় উন্মোচন হয় মূল রহস্য। প্রেমের সম্পর্ক থাকায় বিয়ের চাপ দেওয়ায় ফাতেমাকে খুন করেছিল তারই চাচাতো ভাই। পরে আসামিকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।

শুধু ফাতেমা-ই নয়, এমন চাঞ্চল্যকর অনেক রহস্য উদ্ঘাটন আসামি গ্রেপ্তারে ভূমিকা রাখছে সিআইডির ডিএনএ ল্যাব। আসামিদের মৌখিক স্বীকারোক্তি পরও অনেক সময় আলামত না থাকায় মামলার বিচার বাধাগ্রস্ত হয়। কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে আলামত নিশ্চিত হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। এখানে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাই থাকে না। তাই আসামি শনাক্ত ও বিচারে বড় ভূমিকা পালন করছে ডিএনএ ল্যাব।

সিআইডির ডিআইজি শেখ নাজমুল আলম জানান, রংপুরের চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্য উদঘাটন আমাদের একটি সাফল্য। ওই ঘটনার পর আমরা মোট ১৪ জনের ডিএনএ সংগ্রহ করি। পরবর্তীতে তার চাচাত ভাই রমজানের ডিএনএ মিলে যায়। একবার নয় কয়েকবার আমরা ম্যাচ করে দেখেছি। পরে তাকে আমরা গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসি।

তিনি বলেন, ডিএনএ ম্যাচিংয়ে আসামি শনাক্ত হলে আর কোনো প্রশ্ন থাকে না। অনেক সময় ক্লুলেস ঘটনাগুলো ডিএনএ ম্যাচিংয়ে ধরা পড়েছে। এরপর আসামি শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়।

বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিএনএ ল্যাবরেটরির নাম পরিবর্তন করে ডিএনএ ব্যাংক নামে কার্যক্রম শুরু করে গত বছরের ১০ জুন। এরআগে ৮ জুন আইজিপি অনুমোদন দেওয়ার পর থেকেই ডিএনএ ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম শুরু করা হয়। সিআইডির ডিএনএ ল্যাবের যাত্রা শুরু হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে। ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি তিনি সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই ল্যাবরেটরি ধর্ষণ, অজ্ঞাত মৃতদেহ শনাক্তকরণ, পিতৃত্ববিরোধ ও নিষ্পত্তি, ডাকাতি, হত্যাসহ প্রায় সাত হাজার মামলার বিপরীতে ১৭ হাজারের বেশি আলামত থেকে ৩৩ হাজারের বেশি ডিএনএ প্রোফাইলিং করেছে। যা এর সার্ভারে সংরক্ষিত আছে।

সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে আদালতের আদেশক্রমে ল্যাবের ডিএনএ প্রোফাইলিং কার্যক্রম শুরু হয়। ‘ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি অব বাংলাদেশ পুলিশ’ প্রথম আলামত গ্রহণ করে ২০১৪ সালের  ১৫ জানুয়ারি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরিতে সংরক্ষিত অপরাধীদের ডিএনএ প্রোফাইল তদন্তকার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা সংক্রান্ত সব আলামতের বিশ্লেষণ ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবে হয়ে থাকে। ডিএনএ ল্যাব সিআইডির সহায়তায় পুলিশ অসংখ্য ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা সমাধানে সফল হয়েছে। বর্তমানে ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাব দেশের বিভিন্ন কোর্ট, থানা থেকে আসা শতাধিক মামলা গ্রহণ ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিপোর্ট দেয়। ডিএনএ ডাটাবেজে সংরক্ষিত ডিএনএ প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে নিখোঁজ বা অজ্ঞাত কোনো ব্যক্তিকে শনাক্তকরণ করা সম্ভব হয়, যদি অজ্ঞাত বা নিখোঁজ ব্যাক্তির দাবিদার কিংবা আত্মীয়স্বজন পাওয়া যায়।

জানা গেছে, জাপান সরকারের জেডিসিএফের অর্থায়নে ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি অব বাংলাদেশ পুলিশ শীর্ষক প্রকল্পের কার্যক্রম ২০১১ সালের আগস্ট থেকে শুরু হয়, যা জুন ২০১৫ সালে সমাপ্ত হয়। দেশের শীর্ষ জঙ্গি মুসাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয় ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে।  মৌলভীবাজারে ২০১৭ সালের এপ্রিলে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অপারেশনে তিন জঙ্গি নিহত হয়। তাদের পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সিআইডি নিশ্চিত হয় এই তিনজনের লাশের মধ্যে জঙ্গি মুসার লাশও রয়েছে। এরকম অসংখ্য মামলা তদন্তে ডিএনএ পরীক্ষা কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আত্মহত্যা করা কিশোরী তরুণীদের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচারে লিপ্ত মুন্নাকে গ্রেপ্তার করা। আলোচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় মজনু মিয়াকে ডিএনএর মাধ্যমে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়।

ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা খানম হত্যাচেষ্টা মামলার হামলাকারীকে শনাক্ত করা হয়েছে সিআইডি ফরেনসিক ল্যাবের ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে। ইউএনও-এর সাবেক মালী গ্রেপ্তারকৃত রবিউল ইসলামের প্যান্টে ইউএনও-এর বাবার প্রোফাইল পাওয়া যায়।

৩১ জুলাই কক্সবাজারের টেকনাফে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যায় যে পিস্তল ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটি শনাক্ত হয়েছে ফরেনসিক ল্যাবের ব্যালিস্টিক পরীক্ষায়।

ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবের ডিএনএ ডাটাব্যাংকে এ মুহূর্তে ৩০ হাজারের বেশি প্রোফাইলিং সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে ২৪ হাজার প্রোফাইল ম্যাচিংয়ের মাধ্যমে অপরাধীও শনাক্ত করা হয়েছে। বাকি ৭ হাজার প্রোফাইল সংরক্ষিত থাকলেও এর মাধ্যমে এখনো অপরাধী শনাক্ত করা যায়নি।

এছাড়া চাঞ্চল্যকর মামলার এক হাজার ৬০০টি রিপোর্ট প্রক্রিয়াধীন। এর মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সারা দেশ থেকে এসেছে ৭ শতাধিক মামলার আলামত। ডিজিটাল ফরেনসিকের জন্য এসেছে প্রায় ১ হাজার মামলার আলামত।

ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামতের নমুনা এবং সন্দেহভাজনদের নমুনা ম্যাচিং হলেই সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর রহস্য উদ্ঘাটনের দ্বার উন্মোচন হবে। প্রক্রিয়াধীন এসব রিপোর্টের মধ্যে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের আলামতই বেশি।

সূত্র জানায়, গুরুত্বপূর্ণ মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে জৈবিক আলামত পরীক্ষায় সারা দেশে সিআইডির অধীনে তিনটি ফরেনসিক ল্যাব রয়েছে। প্রধান ল্যাবটি সিআইডির প্রধান কার্যালয়ের মালিবাগে। এছাড়া চট্টগ্রাম এবং রাজশাহীতে সিআইডির আরো দুইটি ফরেনসিক ল্যাব আছে।

ঢাকার ফরেনসিক ল্যাবে আছে ১২টি শাখা। এগুলো হচ্ছে-জেনারেল ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাব, ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব, কেমিক্যাল ল্যাব, হস্তলিপি শাখা, ফ্রিঙ্গার প্রিন্ট, ব্যালিস্টিক, অফিস, ক্রাইমসিন ইউনিট, জাল নোট ও মেকীমুদ্রা, আলোকচিত্র, অণুবিশ্লেষণ এবং পদচিহ্ন শাখা। চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগীয় ল্যাবে জেনারেল ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাব, ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব এবং অফিস শাখা ছাড়া অন্য সব শাখাই রয়েছে।

জানা গেছে, সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের জনবল ২৮৪। এর মধ্যে ঢাকার জেনারেল ফরেনসিক ল্যাবে ৪২ জন বিশারদসহ ৭১ জন, ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবে ৩৪ জন বিশারদসহ ৪৪ জন এবং ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবে ১২ জন বিশারদসহ ৪৬ জন কর্মরত।

চট্টগ্রাম ফরেনসিক ল্যাবে নয়জন বিশারদসহ ১২ জন এবং রাজশাহী বিভাগী ফরেনসিক ল্যাবে ১২ জন বিশারদসহ ১৭ জন কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া সারা দেশে ক্রাইমসিন ইউনিটে আছেন ৯৪ জন। ২০০৯ সালে চট্টগ্রামে এবং গত বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে ফরেনসিক ল্যাব চালু হয়।

গত কয়েক বছরে সিআইডি ফরেনসিক ল্যাবের অধীন ২৪ হাজার ২১২টি মামলায় ১০ লাখ ২৩ হাজার ৯৮৪টি নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয়েছে।

সিআইডি প্রধান ব্যারিস্টার মাহাবুবুর রহমান বলেন, আমাদের কাছে যে কোনো ধরনের জৈবিক নমুনা দেওয়া হলে আমরা তার প্রোফাইলিং করি। তবে সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করতে না পারলে সেই প্রোফাইলিং মেলানো সম্ভব হয় না। যাদের প্রোফাইল ম্যাচিং করা সম্ভব হয়, তাদের প্রোফাইলও সংরক্ষণ করে রাখি। দীর্ঘদিন পরও যদি সন্দেহভাজন পাওয়া যায়, তাহলেও সংরক্ষিত প্রোফাইলের সঙ্গে সন্দেহভাজনের প্রোফাইল মিলিয়ে দেখা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, প্রতিটি মানুষের ডিএনএ ভিন্ন। একজনের ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে আরেকজনেরটা মিল পাওয়া যায় না। তবে অনেক সময় প্রোফাইল ম্যাচিংয়ের সময় সন্দেহভাজনের নমুনার মিল পাওয়া না গেলেও কাছাকাছি পর্যন্ত যাওয়া যায়। তখন আমরা বুঝতে পারি, সন্দেহভাজনের নিকটাত্মীয়ের (রক্তের সম্পর্ক) কেউ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তখন নিকটাত্মীয়কে শনাক্ত করা সহজ হয়ে যায়।

তিনি বলেন, মানুষ মিথ্যা কথা বলতে পারে কিন্তু এভিডেন্স মিথ্যা কথা বলতে পারে না। বিশেষ করে ডিএনএ মিলে গেলে এখানে আর কোনো অবকাশ থাকে না।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads