দুঃসময় কাটছে না নিম্ন ও মধ্যবিত্তের। দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে করোনা মহামারিতে সব হারিয়ে দিশেহারা তারা। এর মধ্যে দফায় দফায় বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। কিন্তু কেন দাম বাড়ছে, কারা দাম বাড়াচ্ছে তা দেখার কেউ নেই। বিশেষ করে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে আকাশ ছুঁয়েছে। সরকার কয়েক দফায় টিসিবির মাধ্যমে চাল, ডাল, চিনি, তেল ও আলু ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করলেও বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই। মহামারির কারণে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক মন্দার সঙ্গে সংগ্রাম করে ক্লান্ত সীমিত আয়ের মানুষ এখন চরম বিপাকে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রধান প্রধান নিত্যপণ্যের জন্য বিদেশের বাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকায় বাংলাদেশ সব সময় আমদানি প্ররোচিত মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিতে থাকে। ফলে এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায় কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের জন্য নিজস্ব সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করা। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের চেষ্টা আগেই করা উচিত ছিল।
তারা বলছেন, দাম কমিয়ে আনার জন্য তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে সরকারের ব্যাপকভাবে কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য খোলা বাজারে বিক্রির ব্যবস্থা করা উচিত। পাশাপাশি দামের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, এমন সীমিত আয়ের মানুষকে সরকারি সহায়তা হিসেবে নিজস্ব স্টক থেকে কিছু নিত্যপণ্য সরবরাহ বা ভর্তুকি দেওয়া উচিত। খুচরা বাজারে সরকারের মূল্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এসব পণ্য বিক্রির ব্যাপারে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ- ক্যাব মনে করছে, স্থানীয় বাজারে অনেক পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বেশি। এর অর্থ, ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দামের অজুহাতে মানুষের কাছ থেকে বেশি টাকা আদায় করছেন। সরকারের অবিলম্বে এই বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত। পাশাপাশি যেসব ব্যবসায়ী সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করে ভোক্তাদের শোষণের চেষ্টা করছেন তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা দরকার। একইসাথে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য ক্রমাগত কমে যাওয়া রোধ করা উচিত। এতে বিভিন্ন পণ্যের আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
ক্যাব নেতারা বলছেন, সরকারকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি আরো সাবধানে প্রণয়ন করতে হবে। কারণ কিছু বিশ্লেষক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, করোনার কারণে চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে মুদ্রাস্ফীতির যথেষ্ট চাপ থাকবে। যেহেতু বিশ্ব করোনা মহামারি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
এদিকে, নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় গত বুধবার থেকে আবারো রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে টিসিবির ট্রাকসেল কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কিন্তু বিপুল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য যে পরিমাণ নিত্যপণ্য প্রয়োজন তা সরবরাহ করতে পারছে না টিসিবি। তাই টিসিবির ট্রাকের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন হাজার হাজার দরিদ্র মানুষ।
রামপুরার বাসিন্দা করিম উদ্দিন বলেন, কম দামে পাই বলে নিয়মিত টিসিবির ট্রাকে পণ্য কিনি। কিন্তু দিনদিন ক্রেতার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে। টিসিবির ট্রাক থেকে আমাদের মতো অল্প আয়ের মানুষরা বাজারের চেয়ে কম দামে তেল, ডাল, চিনি, পেঁয়াজ কিনতে পারতাম। সারা বছর এটা চালু রাখলে আমরা বাঁচতে পারি। বাজারে জিনিসপত্রের দাম যে হারে বাড়ছে, ওই দামে কেনার ক্ষমতা আমাদের নেই।
জানা গেছে, ২০১৯ সালের আগে বছরে তিন থেকে চারবার টিসিবির পণ্য বিক্রি কার্যক্রম চলতো। এখন প্রতি মাসে এ কার্যক্রম চলছে। আগে মাসের মধ্যে দুই সপ্তাহ বিক্রি হতো, বাকি দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকতো। এখন মাসের মধ্যে ২২ থেকে ২৪ দিন এ কার্যক্রম চলে। তবে পরিবেশক ও পণ্যের হিসাব-নিকাশ করা, বিভিন্ন কোম্পানি থেকে পণ্য ক্রয় করা এবং প্রয়োজনীয় পণ্য মজুত নিশ্চিত করার জন্য মাঝেমধ্যে কয়েক দিনের জন্য বিরতি দিতে হয়।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খুচরা বাজারেও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তারা বর্তমানে বিভিন্ন পণ্যের অস্থিতিশীল দামের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে স্থিতিশীল পণ্যগুলোর দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এজন্য সরকারের জোরালো বাজার মনিটরিং প্রয়োজন।
এদিকে আবারো পেঁয়াজ, রসুন ও আদার বাজারে আগুন লেগেছে। কোনো কারণ ছাড়াই মাত্র চার থেকে পাঁচদিনের ব্যবধানে কেজি প্রতি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ২০-২৫ টাকা। আর প্রতিকেজি ভারতের আদা বিক্রি হচ্ছে ৯০-১০০ টাকায়, চায়না আদা ১৩০-১৪০ টাকা। যা তিনদিনের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ১৫-২০ টাকা বেশি। একইভাবে দেশি রসুন বিক্রি হচ্ছে ৬০-৮০ টাকা দরে। চায়না রসুন ১২০-১৩০ টাকা। যা একই সময়ের ব্যবধানে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, হঠাৎ করে আড়তদাররা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়েছে। ফলে তাদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তাই বেশি দামে বিক্রি করছি। কিন্তু আড়তদাররা বলছেন, ভারতে পেঁয়াজের বুকিং রেট বেড়েছে। এ কারণে আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাই লাফিয়ে বাড়ছে পেঁয়াজের দাম।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি দরে। তবে আগের কেনা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকা কেজি। অথচ ১ অক্টোবর রাজধানীর বাজারে পেঁয়াজের কেজি ছিল ৪৫-৫০ টাকা কেজি। অর্থাৎ কেজি প্রতি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ২০-২৫ টাকা। আরো বাড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। নতুন করে পেঁয়াজের দাম বাড়ায় ক্রেতারা পড়েছেন চরম বিপাকে।
রাজধানীর মিরপুরে ব্যবসায়ী সানাউল হক পেঁয়াজ বিক্রি করছেন ৭৫ টাকা কেজিতে। তবে কেউ দামদামি করলে ৭০ টাকা কেজি বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। গতকাল কিংবা আজকে যারা পেঁয়াজ কিনেছে (বিক্রেতা) তারা বিক্রি করছে ৭৫ টাকা কেজি। আমার পেঁয়াজ কেনা শনিবার, তাই পরিচিত কাস্টমারের কাছে ৭০ টাকায়ও বিক্রি করছি।
একই কথা বলেন কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী লিটন হোসেন। তিনি বলেন, আড়তদাররা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়েছে। বলছে আরো বাড়বে। ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি কমেছে, এই অজুহাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। আর তার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।
নিউমার্কেট কাঁচাবাজারে আসা ক্রেতা নুসরাত করিম বলেন, এক সপ্তাহ আগে ৪০ টাকা কেজি পেঁয়াজ কিনেছি। আজকে কিনতে এসেছি, দাম বলছে ৭৫ টাকা। অর্থাৎ অলমোস্ট ডাবল। তিনি বলেন, কাঁচামরিচের কেজি ২০০ টাকা, ডিমের হালি ৪০ টাকা, চালের দাম বাড়তি। এখন পেঁয়াজের দামও বাড়াচ্ছে। আমরা কই যাবো।
পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের দাবি, ভারতে অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে পেঁয়াজের ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। এছাড়াও পুজার কারণে বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকবে। ফলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা ক্ষেত থেকে পেঁয়াজ উঠানো কমিয়ে দিয়েছেন। মোকামগুলোতে লোডিং কমে গেছে। তবে পুজার পর এমন দাম থাকবে না। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন জাতের পেঁয়াজ উঠতে শুরু করেছে। সেগুলো আসতে শুরু করবে। ফলে দাম কমে আসবে। আগে দিনে এক থেকে দেড় হাজার টন পেঁয়াজ বাজারে এলেও এখন আসছে ৬০০-৭০০ টন।
পেঁয়াজের পথে হাঁটছে আদা-রসুনও। ফলে অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে মসলার বাজার। তবে পাইকারি বাজারে দেখা গেছে ভিন্নচিত্র। সেখানে আদা-রসুনের দাম ততটা বাড়েনি। অভিযোগ রয়েছে, পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে খুচরা ব্যবসায়ীরা আদা-রসুনের দামও বাড়িয়ে দিয়েছেন।
শ্যামবাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, গত তিনদিনের ব্যবধানে আদার দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে সেটা স্বাভাবিক অন্য সময়ের বাড়া-কমার মতো। কিন্তু হঠাৎ পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে আদা-রসুনের ওপর। খুচরায় পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে আদা-রসুনের বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে।
তারা বলেন, বৃহস্পতিবার শ্যামবাজারে ভারতের আদা কেজিপ্রতি ৪০-৪৭ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর চায়না আদা বিক্রি হচ্ছে ৯০-১১০ টাকা। এই দুই জাতের আদার দাম পাইকারিতে তেমন বাড়েনি। তিনদিন আগের তুলনায় ২-৫ টাকা বেড়েছে। অপরদিকে পাইকারিতে দেশি রসুন ৩০-৪০ টাকা এবং চায়না রসুন ৮০-১০২ টাকার মধ্যে বেচাকেনা হচ্ছে। এ দুই জাতের রসুনের দাম তিনদিনের ব্যবধানে বাড়েনি।
পাইকারি বাজার থেকে খুচরায় দামের অসামঞ্জস্যতার বিষয়ে কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, পরিবহন খরচ, পণ্যের ঘাটতি এবং বাছাই পণ্য বিক্রির কারণে দাম বেশি খুচরায়। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, পাইকারি বাজারের দাম হিসাব করে আমাদের চলে না। তারা যে মাল বিক্রি করে, সেটা বাছাইয়ের পর মণে ৫-৭ কেজি ঘাটতি হয়। এছাড়া পরিবহন, দোকান খরচ মিলে এর থেকে কম দামে বিক্রি করা যায় না।
অন্যদিকে, শীত শুরু না হতেই বাজারে উঠতে শুরু করেছে বিভিন্ন শীতকালীন সবজি। বাজারে বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন সবজি উঠলেও দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। বিক্রেতারা বলছেন, আগাম শীতকালীন সবজির দাম একটু বেশি হয়। শীত শুরু হয়ে গেলে এ দাম আর থাকবে না। তখন সাধারণ ক্রেতার নাগালেই থাকবে সবজির দাম।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর এবং কাওরান বাজার ঘুরে দেখা যায়, আকার ও জাত ভেদে লাউ বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পিস, ঝিঙার কেজি ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা ৫০ টাকা কেজি, বরবটি ৮০ টাকা কেজি, পটল ৫০ টাকা, চালকুমড়া ৫০ টাকা পিস, ঢেঁড়স ৬০ টাকা কেজি, বেগুনের আকার ও জাত ভেদে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৮০ টাকা দরে। ক্যাপসিকাম ২২০ টাকা কেজি, শিম ১০০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। টমেটো ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি, ফুলকপি প্রতি পিস ৫০ টাকা, বাঁধাকপি ৫০ টাকা পিস এবং লতি প্রতি কেজি ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া কাঁচামরিচ ১৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।





