খরগোস পালন করে স্বাবলম্বী নারীরা

ছবি : বাংলাদেশের খবর

ফিচার

খরগোস পালন করে স্বাবলম্বী নারীরা

  • মো. ইউনুস আলী, ধনবাড়ী (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ১৩ ডিসেম্বর, ২০২০

পিরোজপুর গ্রামের অর্ধশত হতদরিদ্র নারী সংসারের কাজের পাশাপাশি খরগোস পালন করে এখন তারা স্বাবলম্বী হয়েছেন। এ গ্রামের অনেক বাড়িতেই নারীরা খরগোস পালন করছে। এক সময় এ গ্রামের নারীরা হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগল পালন করতেন। এখন এসবের পাশাপাশি খরগোস পালনে লাভের মুখ দেখছে বেশি। এতে করে প্রায় বাড়ীতেই নারীরা খরগোস পালনের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। এতে বাড়তি আয়ের পথ খোঁজে পেয়েছেন এ গ্রামের হতদরিদ্র উদ্যোমী প্রান্তিক নারীরা।
ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ ও নিজেদের হাত খরচের জন্য এখন আর স্বামীর কাছে হাত পাততে হয় না। এভাবে পিরোজপুর গ্রামে এখন প্রায় অর্ধশত হতদরিদ্র উদ্যোমী নারীরা তাদের সংসারের কাজের পাশাপাশি খরগোস পালন করে যাচ্ছেন।

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার কুড়াগাছা ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম পিরোজপুর। মধুপুর শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে এই গ্রামেটির অবস্থান। এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষি কাজের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। গ্রামের কৃষি ফসলে ভরা আনারস, পেঁপে, আদা, হলুদ, কচু, সরিষা, ধান, পাট, আলু, কলা, সবজি গ্রামের মানুষের প্রধান অর্থকরী ফসল। কৃষি তাদের প্রাণ। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পালনে গ্রামের নারীরা এগিয়ে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও কৃষি কাজে জড়িত। তারা মাঠেঘাটে কাজ করে। অন্যান্য কাজের পাশাপাশি তারা নতুন একটি আইটেম খরগোস পালনে তারা এগিয়ে যাচ্ছে। এলাকায় এই খরগোস পালন হতদরিদ্র নারীদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। এই গ্রামের প্রায় অর্ধশত নারী নিজেদের সংসারের কাজের পাশাপাশি খরগোস পালনে করে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পিরোজপুর গ্রামের অনেক বাড়ীতেই নারীরা খরগোস পালন করছে। প্রায় নারীরই রয়েছে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৫-২০টি করে খরগোস। নারীরা জানালেন, প্রতিটি মা খরগোস ৪-৯টি পর্যন্ত বাচ্চা দিয়ে থাকে। বাড়ীতে পাইকাররা এসে নগদ দামে কিনে নেয়। খরগোস পালনকারী নারীরা সকালে নিজেদের বাড়ীর কাজ শেষে মাঠে গিয়ে ঘাস কেটে এনে খরগোসদের খাবার দেন। এতে তাদের মাঝে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ।

নারীরা জানান, খরগোস পালনের জন্য আলাদা ঘর প্রয়োজন। এ জন্য কাঠের ফালি দিয়ে বাক্স বানিয়ে তিন দিকে কাঠের বেড়া দিতে হয়। সামনের দিকে জালের নেট দিয়ে দরজা বানিয়ে খরগোস পালন করে। এতে সামনের দিক দিয়ে আলো বাতাস ঢুকে ও ময়লা পরিষ্কার করতে সহজ হয়। দিনে ও রাতে কয়েক বার খাবার দিতে হয় এবং এ খরগোস থাকার ঘর বা বক্স পরিষ্কার করতে হয় প্রতিদিন। খাবারের মধ্যে ঘাস অন্যতম। ঘাসের সাথে ভাত ও ধানের কুড়া মিশিয়ে খাবার দিতে হয়। ছোট বাচ্চাগুলোকে আলাদা রাখতে হয়। যাতে বড় খরগোসের চাপে বা আঘাতে না মারা যায়। প্রতিদিন দিনে ৪-৫ বার দুধ খাওয়াতে হয়। বাচ্চা দেখতে ইঁদুরের মতো। ২০-২৫ দিনের মধ্যে বাচ্চা বিক্রি করা যায়। প্রতিটি বাচ্চা ৫০-১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়। শীতকালে দাম কিছুটা কম থাকে।

খরগোস পালনকারী আজিরন বেগমের বর্তমানে ১৫টি বড় খরগোস। প্রতিমাসে ১৫-২০টি করে বাচ্চা বিক্রি করেন। তার প্রতিমাসে দেড় হাজার টাকা বাড়তি আয় হয়। বাড়তি আয় দিয়ে তিনি তার কাপড়, নাতি-নাতিনদের পড়ালেখায় খরচ চালান। এখন তার আর বাড়তি অর্থের জন্য চিন্তা করতে হয় না। হনুফা বেগম (৩৫) তার ১৬টি বড় মা খরগোস। প্রতি মাসে খরগোস বিক্রি করে ২-৩ হাজার টাকা আসে।

নিজের খরচ মেটানোর পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হয় না। ফরিদা বেগম (৪০) তিনিও খরগোস পালন করে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা করিয়েছেন। বাড়ীতে থাকার ঘর দিয়েছেন। স্বামীকে প্রতিমাসে ৩-৪ হাজার টাকা করে সাহায্য করেন। এভাবে শুধু আজিরন, নাজমা, হনুফা, ফরিদাই নন এ গ্রামের অর্ধশত নারী এখন স্বাবলম্বী হয়েছেন।

তারা জানান, বর্তমানে পাইকার কম থাকার কারণে ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। যদি সরকারিভাবে কোন ব্যবস্থা অথবা পৃষ্ঠপোষকতা সহযোগিতা পান তাহলে আমারা আরো এগিয়ে যেগে পারবো এমনটাই প্রত্যাশা এ গ্রামের উদ্যোমী নারীদের।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads