যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের ভূমিব্যবস্থাপনা অনেকটা এগিয়ে গেলেও ততোটা এগোয়নি সেবা প্রক্রিয়া। দক্ষ জনবল সংকটের কারণে দীর্ঘ এক যুগেও ভূমিসংক্রান্ত কার্যক্রমের তেমন অগ্রগতিও হয়নি। এরই মধ্যে চলতি অর্থবছরের (১ জুলাই) শুরু থেকে দেশের বিভিন্ন ভূমি অফিসে ডিজিটাল কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সেখানে এখন প্রচলিত (ম্যানুয়াল) পদ্ধতির পরিবর্তে অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান এবং দাখিলা কার্যক্রম চলছে।
এদিকে ভূমি অফিসগুলোতে অনেক আগের নিয়োগপ্রাপ্ত বয়স্ক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি সেবা দেওয়ার উপযোগী নন। এতে মাঠ পর্যায়ে উন্নত সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সংকট দেখা দিয়েছে। এরমধ্যে ভূমির মাঠ পর্যায়ে ৯ হাজার শূন্য পদ রয়েছে। তবে এই সংকট দূর করতে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চলতি বছরের মধ্যেই ভূমির মাঠ প্রশাসনে প্রথম পর্যায়ে ১৮শ নন-ক্যাডার কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে। পিএসসিতে ৩৮ ও ৩৯তম বিসিএসের অপেক্ষারতদের মধ্য থেকে মাঠ প্রশাসনের কয়েকটি পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। ভূমি মন্ত্রণালয় গত মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পিএসসি সচিবের কাছে পাঠিয়েছে। এর কয়েক দিন আগে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা-২০২১-এর গেজেট প্রকাশ করা ভূমি মন্ত্রণালয়। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শুধু যোগ্য, দক্ষরা কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পাবেন বলে জানান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসনের শূন্য পদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অপরদিকে সংশ্লিষ্ট বিভাগের জনবল সংকট দেখিয়ে প্রায় দেড় যুগ ধরে ভূমি অফিসগুলোতে চলছে সেবাপ্রত্যাশীদের নানাভাবে হয়রানি। জনবল সংকটের এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে দালালচক্র সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে চাহিদা অনুযায়ী উৎকোচ। যুগ যুগ ধরে এ সেক্টরে কর্মরতরা সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীদের বেকায়দায় ফেলে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন-এমন অভিযোগের অন্ত নেই।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে ব্রিটিশ আমলে বেশ কয়েকটি জরিপ সম্পাদিত হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য জরিপ হচ্ছে ক্যাডাস্ট্র্যাল সার্ভে (সিএস সার্ভে)। এরপর পাকিস্তান আমলে সম্পাদিত উল্লেখযোগ্য জরিপ হচ্ছে স্টেট একুইজিশন সার্ভে (এসএ সার্ভে) এবং রিভিশনাল সার্ভে (আরএস সার্ভে) যা মূলত এসএ সার্ভের সংশোধন। সর্বশেষে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর উল্লেখযোগ্য জরিপ হচ্ছে বাংলাদেশ সার্ভে (বিএস সার্ভে), দিয়ারা সার্ভে ও ঢাকা সিটি সার্ভে (সিটি জরিপ)। পুরানো এ পদ্ধতির পরিবর্তন আনতে ২০১০ সালে পুরো ভূমিব্যবস্থাপনাকেই ডিজিটালের (অটোমোশন) আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) অফিসগুলোর একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনিচ্ছায় পুরো ডিজিটালাইজেশনকরণ প্রক্রিয়াই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তেমন এগোয়নি। নতুন অনুমোদিত জুন ২০২৫ পর্যন্ত বর্ধিত সময় দিয়ে এখন চলছে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ।
এখন বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভের (বিডিএস) মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশে আগের সার্ভে জরিপগুলোর রেকর্ড হালনাগাদ করা হবে। এ কাজের জন্য এরই মধ্যে ৪৭ জন কর্মকর্তা নিয়ে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের (ডিএলআরএস) একটি কোর্স মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করে তুলেছেন।
মাঠ পর্যায়ে ভূমিব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই (ক্যাডার বাদে) ২০০৪ সালের আগে নিয়োগপ্রাপ্ত। এরপর থেকে এ পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে কোনো নিয়োগ হয়নি। সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার রায়ে সামরিক শাসনামলে করা নিয়োগ বিধিমালাগুলো বাতিল হয়ে যায়। এর ফলে মাঠ পর্যায়ে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। বর্তমানে কর্মরত সব কানুনগো আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে অবসরে যাবেন। এই সময়ে সিংহভাগ ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) ও ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তাও অবসরে যাবেন। তখন কর্মরত থাকবেন বর্তমানের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশেরও কম। তখন যে শূন্যতা সৃষ্টি হবে, তাতে জনগণের চাহিদা অনুযায়ী ন্যূনতম সেবা দেওয়াও দুরূহ হয়ে পড়বে।
ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সারা দেশে ভূমি অফিস ৩ হাজার ৪৫৭টি। তাদের মাঠ প্রশাসনে অনুমোদিত জনবল সংখ্যা ২৬ হাজার ১৪৪ জন। নানা জটিলতার কারণে গত ১৭ বছর ধরে নিয়োগ বন্ধ থাকায় বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে শূন্যপদ প্রায় ১০ হাজার বা প্রায় ৩৮ শতাংশ। এটা অস্বাভাবিক।
নিয়োগ-সংক্রান্ত জটিলতা দূর হওয়ায় গত ১৭ আগস্ট ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা নিয়োগ বিধিমালা-২০২১-এর গেজেট প্রকাশ করা হয়। একই দিনে ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা-২০২১-এর গেজেট প্রকাশ করা হয়। এই দুটি গেজেট প্রকাশ হওয়ায় মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে আর কোনো বাধা রইল না।
এদিকে ভূমি মন্ত্রণালয় গত মঙ্গলবার মাঠ পর্যায়ের ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা, কানুনগো ও সার্ভেয়ার (ভূমিব্যবস্থাপনা) পদে নিয়োগ-সংক্রান্ত চিঠি পিএসসি সচিবের কাছে পাঠিয়েছে। সূত্র জানায়, যোগ্য, দক্ষ ও তথ্যপ্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্নদের নিয়োগ দেবে ভূমি মন্ত্রণালয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঝঞ্ঝাটমুক্ত করতেই পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পিএসসিতে ৩৮তম বিসিএসের নন-ক্যাডারের জন্য অপেক্ষারতদের মধ্য থেকে মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ওই তিনটি পদে নিয়োগ দেওয়া হবে।
ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বলেন, ভূমিব্যবস্থাপনাকে ক্রমন্বায়ে দুর্নীতি মুক্ত করা হচ্ছে। এ জন্য মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে এই নিয়োগ নিয়ে কেউ প্রশ্ন করতে পারবে না। এ জন্য এই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে। সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করে নিয়োগ-সংক্রান্ত বাধাগুলো দূর করা হয়েছে। যোগ্য, দক্ষরা কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পেলে মাঠ পর্যায়ের কাজে গতি ফিরে আসবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব প্রদীপ কুমার দাস বলেন, এ মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসনে তীব্র জনবল সংকট চলছে। জনবল সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে জনগণ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হলে সেবাগ্রহীতারা যথাসময়ে উন্নত সেবা পাবেন। তিনি আরো বলেন, পিএসসির মাধ্যমে যোগ্য ও বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষদের নিয়োগ দেওয়া হবে। এক সময় তারাই ‘হাতের মুঠোয় ভূমি সেবা’ স্লোগানটি বাস্তবায়ন করবেন। এর ফলে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন সহজতর হবে।
জানা গেছে, পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে ১ হাজার ৩৭৫ জন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা, ১০০ জন কানুনগো ও ৩২৫ জন সার্ভেয়ার (ভূমি ব্যবস্থাপনা)। আইন অনুযায়ী বিভাগীয় কমিশনার ভূমির মাঠ প্রশাসনের তৃতীয় শ্রেণির এবং জেলা প্রশাসক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ দেবেন।
সূত্র জানায়, মাঠ প্রশাসনে বিদ্যমান ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতি দিয়ে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) হিসেবে নিয়োগ করা হবে। এরপর ওইসব ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তার শূন্যপদ পূরণের জন্য পরবর্তী ৩৯তম বিসিএস থেকে নন-ক্যাডারদের নিয়োগ দেওয়া হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন পদের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে রয়েছেন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি), সহকারী কমিশনার (ভূমি), অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, উপসহকারী প্রকৌশলী, কানুনগো, সার্ভেয়ার, ড্রাফটম্যান, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা, ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা ও চেইনম্যান।





