পৌষের শুরুতে শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশায় হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় বিপর্যস্ত জনজীবন। সাধারণ ও খেটে-খাওয়া মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। ঠান্ডাজনিত নানা রোগে আক্রান্ত শিশু ও বৃদ্ধরা। কনকনে শীতে কাঁপছে তরুণ-তরুণীরাও।
এর মাঝেই শীত থেকে বাঁচতে রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষ ছুটছেন গরম কাপড় কিনতে। দোকানিরাও হরেক রকমের শীতের পোশাকের পসরা সাজিয়েছেন। গরম কাপড়ের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরগরম ফুটপাত ও বস্ত্র বিতানগুলো। বিশেষ করে কম্বল, জ্যাকেট, সোয়েটার, কার্ডিগান, শাল, হাত মোজা ও কানটুপি বিক্রির শীর্ষে। বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় খুশি দোকানিরাও।
গতকাল শনিবার রাজধানীর গুলিস্তান, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, মতিঝিল, বঙ্গবাজার, বায়তুল মোকাররম, নিউমার্কেট, মালিবাগ, মিরপুর, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গরম কাপড় কেনার হিড়িক পড়েছে। এসব এলাকায় গরম কাপড় কেনার জন্য মানুষের ঢল নামে। চাহিদার তুঙ্গে ছিল শিশুদের গরমের পোশাক। অনেক নারীকে দেখা গেছে নিজের এবং সন্তানদের জন্য পছন্দের সোয়েটার কিনতে। হকারদের হাঁকডাক আর ক্রেতাদের ভিড়ে এসব এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ ও বঙ্গবাজারে তিলধারণের ঠাঁই ছিল না। সুযোগ বুঝে দোকানি ও হকাররা এসব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতেও কার্পণ্য করেননি। স্থান ভেদে একই পণ্যের ভিন্ন ভিন্ন দাম নজরে পড়েছে।
নিম্নআয়ের মানুষের বেশি ভিড় ছিল নিউমার্কেট এলাকায়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও ভিড় করে নিউমার্কেট এলাকায়। তাদের চাহিদার শীর্ষে ছিল, জ্যাকেট, মাফলার ও কানটুপি। কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, হঠাৎ আবহাওয়ার এ পরিবর্তনে তারা বিপাকে পড়েছেন। মাসের মাঝামাঝি হওয়ায় তাদের কাছে তেমন টাকা না থাকায় চাহিদামতো শীতের কাপড় কিনতে পারছেন না।
হঠাৎ করে শীতের এমন আক্রমণে রাজধানীর অভিজাত শপিংমলগুলোতেও বেড়েছে বিক্রি। আর অলিগলিতে ভ্যানে করে গরম কাপড় বিক্রির দৃশ্য চোখে পড়ে। মালিবাগ এলাকায় হকার মিজান মিয়ার সঙ্গে কথা হয়। বিক্রি বেশি হওয়ায় তাকে খুশি দেখা যায়। গদগদ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবার থেকে ক্রেতার চাপ বেড়ে গেছে। সবার চাহিদা গরম কাপড়ের।’
নিউমার্কেট এলাকায় কথা হয় যাত্রাবাড়ী থেকে আসা গৃহিণী রওশন আরার সঙ্গে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, শীতের তীব্র আক্রমণে ধুঁকছি আমরা। দুইশ টাকার জিনিস এখন ৪০০ টাকা হাঁকছেন বিক্রেতারা। বাধ্য হয়ে কিনতে হচ্ছে।
নিউমার্কেটের সামনে ফুটপাতে গরম কাপড় বিক্রেতা শাহ আলম বলেন, দুই দিন ধরে শীতের পোশাকের চাহিদা বেশি। এ কারণে শীতের পোশাক বিক্রি করছি। গায়ের পোশাকের পাশাপাশি কম্বলের চাহিদাও বেড়েছে। বেচা-বিক্রিও ভালো বলেই জানান তিনি।
মহানগর প্রজেক্টের বাসিন্দা আইমান জাহিদ নিউমার্কেটে শীতের পোশাক কিনতে এসেছেন। তিনি বলেন, শীত বেড়ে যাওয়ায় গরম কাপড় কিনতে হচ্ছে। আলসেমির কারণে প্রথম দিকে না কেনায় এখন বেশি দাম দিতে হচ্ছে।
গুলিস্তানের হকার্স মার্কেটের দোকানদার দেলোয়ার হোসেন বলেন, গত দুই দিনে প্রায় ৪০০ কম্বল বিক্রি করেছি। গত বৃহস্পতিবার থেকে ক্রেতাদের ভিড় বাড়তে থাকে। দোকানে থাকা কম্বল ক্রেতা সিরাজুল ইসলাম বলেন, দুই দিনে ছোট কম্বলপ্রতি কম করে হলেও ১০০ থেকে ২০০ টাকা করে দাম বেড়েছে। ছোট কম্বলগুলো গত পরশু ২২০ টাকা চাইলেও আজ সেগুলো সাড়ে তিনশ টাকা দাম চাওয়া হচ্ছে। শীত বাড়ায় ব্যবসায়ীদের পকেট মোটা হচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি।
নিউমার্কেটের মক্কা লেদার স্টোরের কম্বল বিক্রেতা মাহমুদ বলেন, শীতে সব সময় উলের কম্বলের চাহিদা বেশি। সাধারণত চায়না ও কোরিয়ার কম্বল বেশি বিক্রি হয়। এসব কম্বল পাওয়া যায় এক হাজার থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে।
হাড়কাঁপানো শীতে কাঁপছে রাজধানীর ভাসমান ও ছিন্নমূল মানুষ। তাদের ভাগ্যে জোটেনি সরকারি বা বেসরকারি কোনো সাহায্য-সহযোগিতা। নিদারুণ কষ্টে জীবন পার করছেন তারা। কিছু কিছু এলাকায় আগুন জ্বালিয়ে হাত-পা গরম করতে দেখা গেছে।
এদিকে ফুটপাতের দোকানে কম মূল্যে শীতের পোশাক পাওয়ায় শ্রবজীবী মানুষের ভিড় সেখানেই বেশি। কারওয়ানবাজারে রিকশাচালক তমিজ মিয়া বলেন, ‘রিকশা চালালে শরীর গরম থাকলেও কান আর হাত অনেক ঠান্ডা হয়ে যায়। এ কারণে হাত মোজা ও কানটুপি কিনলাম।’





