সারা দেশ

গাজীপুর নগরীতে বেড়েছে ছিনতাই, বাঁধা দিলেই খুন!

  • ''
  • প্রকাশিত ১৩ মে, ২০২৪

আল সাদি,গাজীপুর:

গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অত্যন্ত ব্যস্ত একটি সড়ক। উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের ২৯টি জেলার মানুষের রাজধানী ও গাজীপুরে প্রবেশের দ্বার হলো ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। ফলে এই মহাসড়কে প্রতিদিন লাখ লাখ পণ্য ও যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচল করে। টঙ্গী থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার সড়ক পরিনত হয়েছে ছিনতাইকারীদের ‘নিরাপদ চারণভূমিতে’। প্রতিবছর এ মহাসড়কে ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে একাধিক ব্যক্তি প্রাণ হারাচ্ছেন, আহত হচ্ছেন অনেকে। পুলিশ, র‌্যাব, ডিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও রাত্রিকালীন টহলেও দৌরাত্ম কমছেনা ছিনতাইকারীদের।

তথ্য বলছে, ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ি এলাকায় ছিনতাইকারীর গুলিতে রোমান নামের এক কর্মচারী খুন হন, ২০১৫ সালের মার্চ মাসে নগরীর বোর্ড বাজার এলাকায় দিন-দুপুরে বিকাশ কর্মকর্তা রবিন সরকারকে ছুরি মেরে খুন, ২০২৩ সালের ২৯ এপ্রিল ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনা ফ্লাইওভার এলাকায় আলম মিয়া নামের এক যুবককে খুন, ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গীর হোসেন মার্কেট এলাকায় মো. নয়ন মৃধা নামের এক পথচারীকে খুন, সবশেষ চলতি বছরের ০৪ মে দুপুরে নগরীর বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে ঘুরতে গিয়ে আশিকুর রহমান নামের এক কলেজছাত্র হত্যার স্বীকার হয়েছেন। এছাড়াও বিগত কয়েকবছরে একাধিক ব্যক্তি খুন হয়েছেন ছিনতাইকারীর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে। এসব পৃথক ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের দেওয়া তথ্যমতে খুনের মূল কারন ছিলো ছিনতাইয়ের সময় বাঁধা দেওয়া।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেট্রোপলিটনের বাসন থানার চান্দনা চৌরাস্তা, বারবৈকা, দিঘিরচালা, চান্দনা পোস্ট অফিসের সামনে, উলকা সিনেমা হলের সামনে, নলজানী, মধ্যে ভোগড়া জঙ্গল মার্কেট, কসমস গলি, যোগীতলা, কড্ডা ও টান কড্ডা ব্রিজ, ভোগড়া বাইপাস, তেলিপাড়া। টঙ্গীর কলেজ গেট, স্টেশন রোড, গাজীপুরা, সাতাইশ, ধরপাড়া, রাজনগর,খাঁপাড়া রোডের মাথা থেকে তিলারগাতি, বড় দেওড়া আক্কেল আলীর বাথান, মিত্তিবাড়ি বটতলা থেকে শ্বশান রোড, মোল্লাবাড়ি রোড, নান্দু মোড়ল রোড, হোসেন মার্কেট, সফিউদ্দিন সরকার একাডেমি রোড, সুরতরঙ্গ রোড, চেরাগআলী থেকে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস রোড হয়ে বড় দেওড়া ফকির মার্কেট। গাছা থানার কলম্বিয়া গার্মেন্টস এর আশপাশ, মালেকের বাড়ি, বোর্ড বাজার থেকে গাছা রোড, বড়বাড়ি, কলমেশ্বর। জিএমপির সদর থানার পশ্চিম ভুরুলিয়া বিআইডিসি রোড, শিববাড়ি মোড়, জয়দেবপুর রেলস্টেশন, টাংকিরপাড়, ব্রি-তিন সড়ক, নাটা (জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমি) সড়ক, সালনা ফ্লাইওভার। এসব এলাকায় সন্ধ্যা হলেই আনাগোনা বাড়ে ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাং সদস্যদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত এক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘অনেক সময় এদেরকে (ছিনতাইকারী) কিছু বললে বা থানা পুলিশের হাতে তুলে দিলে তাদের সাথে থাকা অন্য সদস্যরা আমাদের উপর হামলা করে।’

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, চান্দনা চৌরাস্তা ও টঙ্গী স্টেশন রোড এলাকাতেই গড়ে প্রতিদিন ৫-৬ জন ব্যক্তি ছিনতাইয়ের শিকার হোন। আবার অনেকে কিশোর গ্যাং সদস্যদের ‘ফিটিং’ এর শিকার হয়ে হারান নিজের সর্বস্ব। গ্রাম থেকে আসা নতুন কোনো মানুষ এবং বান্ধবীর সাথে ঘুরতে বের হওয়া অধিকাংশ তরুণেরাই এদের ‘ফিটিং’ এর শিকার হয়ে থাকেন।

ছিনতাইয়ের শিকার মো. আনাস মিয়া নামের ভুক্তভোগী এক পোশাক শ্রমিক জানায়, ‘কিছুদিন আগে ময়মনসিংহ থেকে গাজীপুরের ভাড়া বাসায় ফিরতেছিলাম। রাত ১টার দিকে চান্দনা চৌরাস্তা থেকে রিকশা করে বাসন সড়ক যাওয়ার পথে মহাসড়কের ঢাকা লেনের কসমস গলির সামনের রাস্তায় তিনজন ছিনতাইকারী চাপাতি দিয়ে খুন করার হুমকি দিয়ে মোবাইল, টাকা ও এটিএম কার্ড নিয়ে যায়।’

কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডাক্তার মামুনুর রহমান কাপাসিয়া থানা পুলিশের বরাত দিয়ে জানান, ‘রাজধানীর মোহাম্মদপুর নিজের বাসা থেকে গাজীপুরে আসার পথে মোহাম্মদপুর সড়ক থেকে ডাক্তার নকিবকে অপহরণকারীরা একটি গাড়ীতে তুলে নেয়। কিছু দূর এনে তার কাছে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবী করে। ডাক্তার নকিব গাজীপুরের ভবানীপুরে এসে তাদেরকে দশ হাজার টাকা দেয়। আরো টাকা দিবে বলে কৌশলে পুলিশে খবর দেয় তিনি। পরে খবর পেয়ে থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।’
চলতি বছরের রমজান মাসে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে। টঙ্গীর দুই থানায় দুই মাসে ১২৪ ছিনতাইকারী সহ ২৭৮ জন আসামী গ্রেপ্তার হয়েছে। গত রবিবার (৩ মার্চ) টঙ্গী পূর্ব ও পশ্চিম থানা সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে। ঈদের আগে গাজীপুরের বিভিন্ন জায়গায় ছিনতাইয়ের অভিযোগে র‌্যাব-০১ গাজীপুরের পোড়াবাড়ি ক্যাম্প সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের ০৩ জন দলনেতা সহ মোট ১৮ জন ও ইজিবাইক ছিনতাই চক্রের মূল হোতাসহ ৫জন সদস্যকে গ্রেফতার করে।

র‌্যাব-০১ স্পেশালাইজড কোম্পানী, পোড়াবাড়ি ক্যাম্পের কমান্ডার মেজর জুন্নুরাইন বিন আলম বলেন, ‘গাজীপুরের স্থানীয় বাসিন্দা ও গাজীপুরের সড়ক ব্যবহারকারী যাত্রীরা যেন নিরাপদে চলাচল করতে পারে এক লক্ষ্য নিয়ে ছিনতাইকারী, মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টির বিরুদ্ধে র‌্যাবের নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি সাঁড়াশি অভিযান অব্যহত আছে।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads