পদ্মা সেতু নিয়ে গুজব ছড়ানোর ঘটনার পেছনে সরকারবিরোধীরা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। গতকাল বুধবার বেলা ১১টায় পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।
আইজিপি বলেন, ‘একটি স্বার্থান্বেষী মহল সুপরিকল্পিতভাবে দেশের পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে পদ্মা সেতু নিয়ে এ ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে। তবে এই গুজব যারাই ছড়াক না কেন, তারা রক্ষা পাবে না। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পুলিশপ্রধান বলেন, পদ্মা সেতুতে মাথা লাগবে— এ সংক্রান্ত প্রথম যে পোস্টটি আমাদের নজরে এসেছে, তা দুবাইভিত্তিক এক ব্যক্তির করা পোস্ট বলে আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছি। এ ছাড়া গুজবসংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ১০৩ জনের ভেতরে কয়েকজনকে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের প্রোফাইল তৈরির কাজ চলছে।
পুলিশপ্রধান আরো বলেন, দেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রাকে রুখে দিতে স্বার্থান্বেষী একটি মহল এসব গুজব উসকে দিচ্ছে। তারা দেশে অস্থিরতা সৃষ্টিতে অন্য উপায়ে ব্যর্থ হয়ে এ পথ বেছে নিয়েছে। বৃত্তের আড়ালে থেকে বা দেশের বাইরে থেকে এ ধরনের গুজবের পোস্ট অনেকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া অনেকেই সরকারবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। এমনকি দুবাই থেকে এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছেন, তিনি সরকারবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমরা তাকেও শনাক্ত করেছি।
গণপিটুনি দিয়ে যারা মানুষ হত্যা করছে এবং গুজব ছড়াচ্ছে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুশিয়ারি দেন আইজিপি। তিনি বলেন, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। যে যত বড় শক্তিশালীই হোক না কেন, আমরা কাউকে ছাড় দেব না। প্রত্যেককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক বলেন, গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে আপনি কিন্তু হত্যা মামলার আসামি হয়ে যাচ্ছেন। হত্যা মামলার আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হয়ে থাকে। যেখানেই থাকুন না কেন, আমরা আপনাকে খুঁজে বের করব এবং কঠোর শাস্তির জন্য আইনের হাতে তুলে দেব।
আইজিপি বলেন, কেউ যদি এ রকম ঘটনা (ছেলেধরা) দেখতে পান বা জানতে পারেন, কাউকে যদি সন্দেহ হয়— আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করবেন। অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের ফোর্স ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাবে।
পুলিশপ্রধান বলেন, বৃহস্পতিবার থেকে দেশজুড়ে গুজববিরোধী সচেতনতা সপ্তাহ পালন করা হবে। এর অংশ হিসেবে প্রতিটি জেলা, থানা ও মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ সদস্যরা উঠান বৈঠক করবেন। স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় গিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে গুজবে আতঙ্কিত না হওয়ার প্রচারণা চালাবেন।
তিনি বলেন, সচেতনতা সপ্তাহের অংশ হিসেবে শুক্রবার জুমার নামাজের খুতবার সময় ইমামদের গুজববিরোধী বয়ান করার অনুরোধ জানানো হবে।
ড. জাবেদ পাটোয়ারী জানান, এ পর্যন্ত গুজব রটনার অভিযোগে ৬০টি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, ২৫টি ইউটিউব চ্যানেল ও ১০টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল বন্ধ করা হয়েছে। সারা দেশে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন আটজন, যাদের কেউই ছেলেধরা বা শিশু অপহরণকারী ছিলেন না। এমনকি যারা গণপিটুনিতে আহত হয়েছেন, তাদের কারো বিরুদ্ধে ছেলেধরা বা শিশু অপহরণের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। গুজব ও গণপিটুনির অভিযোগে ৩১টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১০৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
নেত্রকোনার একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে আইজিপি বলেন, ওই ঘটনায় রবিন নামে যে ব্যক্তি জড়িত, তিনি ছিলেন মাদকাসক্ত। ২০১৭-১৮ সালে দুবার তাকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছিল। পুলিশের হাতে তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। মাদকাসক্ত হওয়ার করণে একবার তিনি নিজের স্ত্রীর গলাকাটার চেষ্টা করেছিলেন। ফলে ওই ঘটনাটি কোনোভাবেই ছেলেধরা সংক্রান্ত নয়। তিনি বলেন, ‘বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, কেরানীগঞ্জ, সাভার, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার প্রতিটি ঘটনা আমরা বিশ্লেষণ করে দেখেছি। এসব ঘটনার কোনোটিতেই ছেলেধরা সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।’
জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, ‘শিশুদের প্রতি আহ্বান থাকবে, তোমাদের যদি কেউ পদ্মা সেতু নিয়ে ভয় দেখায়, তোমরা কান দেবে না। কারণ, এ ঘটনা সত্য নয়। যদি কোথাও কোনো সমস্যা দেখ, সরাসরি ৯৯৯ নম্বরে যখন-তখন ফোন করে আমাদের জানাবে।’





