তরিকুল ইসলাম সুমন:
দ্রুত ভরাট হওয়া, বালি ফেলার জায়গার অভাব এবং ঘন ঘন দিক পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াই করেই চলছিল পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের ড্রেজিং কাজ। এবার দেখা দিয়েছে বড় বিপত্তি। ব্যক্তিগত জমিতে ঢুকে গেছে ব্রহ্মপুত্র। এসব জায়গায় ড্রেজিং করতে দিচ্ছেন না স্থানীয়রা। ফলে ড্রেজিং কাজে তৈরি হয়েছে জটিলতার বেড়াজাল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্রহ্মপুত্র নদটি সরু ও ভরাট হওয়ার প্রবণতা অন্য যেকোনো নদীর তুলনায় অনেক বেশি। প্রতিনিয়ত এই নদের গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের জন্য কিছু কিছু অংশে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে নদী প্রবাহিত হচ্ছে। ড্রেজিং কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চলমান রাখার ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি করছে। এ কারণে গাইবান্ধা জেলার সন্ন্যাসিচর এলাকায় যেখানে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে যমুনা নদীর সংযোগস্থল অফটেক অঞ্চল ভাঙনপ্রবণ। সীমানা নির্ধারণ জটিলতায় স্থানীয় জনসাধারণের বাধার কারণে গত ৫ বছরে ১৫ কিলোমিটার এলাকায় ড্রেজিং শুরু করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়াও শেরপুর জেলার নকলা উপজেলায় নদের সীমানা নির্ধারণে জটিলতা এবং স্থানীয় জনসাধারণের বাধার কারণে ৫ কিলোমিটার এলাকায় ড্রেজিং কাজ বন্ধ রয়েছে। কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলার সাহেবের চর এলাকায় ২.৫ কিলোমিটার সীমানা নির্ধারণ জটিলতায় প্রায় ৩ বছর ওই এলাকায় জনসাধারণ ড্রেজিং কাজ করতে দেয়নি।
প্রকল্প সূত্র জানায়, গাজীপুরের কাপাসিয়া টোক থেকে কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও জামালপুর জেলায় ২০টি লটে ৪৫টি ড্রেজার নিয়োজিত রয়েছে। প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) সার্বক্ষণিক তদারকি করছে। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের ড্রেজিংয়ের জন্য দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ড্রেজিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ১৮১৮.৮০ লাখ ঘনমিটার নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এ পর্যন্ত প্রায় ৪২৮.১৬ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং করা হয়েছে। এ ড্রেজিং কাজের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৬৩ কোটি টাকা। সার্বিক অগ্রগতি বিবেচনা করলে মাত্র ৩০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। এখনো বাকি ৭০ ভাগ কাজ। আগামী বছরের জুনে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হবে না। এ কাজ শেষ হতে আরো তিন বছর সময় বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনগ্রসর ব্রহ্মপুত্র নদের জটিলতা নিয়ে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) রকিবুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদ বেশ কয়েকটি নদীর সঙ্গে যুক্ত। এর আগে কখনোই এটি ড্রেজিং করা হয়নি। পলি জমতে জমতে প্রায় শুকিয়ে গেছে। বৃষ্টির সময় ছাড়া পানি খুব কম থাকতো। নদীর সীমানা ও দিক পরিবর্তন ড্রেজিংকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ কারণে অগ্রগতিও কম। নানা প্রতিবন্ধকতার পরেও ড্রেজিং কাজ থেমে নেই। কাজ চলছে; তবে পুরো কাজ শেষ হতে সময় বৃদ্ধি করতে হবে।
একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাজের কার্যাদেশ দিলেও তারা ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। নদের বিভিন্ন জায়গা বেশি সরু। আবার কোথাও নদ ভাঙছে। কোথাও আবার সিএস ম্যাপে নদ বলা হলেও সেখানে নেই। তা এখন প্রবাহিত হচ্ছে ব্যক্তিগত জমির ওপর দিয়ে। ড্রেজিং করতে গেলেই আমাদের ড্রেজার ভাঙচুর করা হয়। অনেককে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। কয়েক জায়গায় ড্রেজারের কর্মচারীরা হামলার শিকার হয়েছেন। এ কারণেই কাজ আগাচ্ছে না।
ঠিকাদাররা আরো জানান, ইউএনও, চেযারম্যানদের সঙ্গে দফায় দফায় মিটিং করে ড্রেজিং শুরু করলেও ড্রেজিং করা মাটি ফেলার জায়গা না পেয়ে অনেক ক্ষেত্রে ড্রেজার প্রত্যাহার করতে হচ্ছে।
অগ্রগতি কম হওয়া প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক ও বিআইডব্লিউটিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. ছাইদুর রহমান বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই নদটি ব্যক্তিগত জমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত। তাই ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ডাইক (বর্জ্য ফেলার জায়গা) ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। এ কারণেও ব্যাহত হচ্ছে ড্রেজিং কার্যক্রম। নিরবচ্ছিন্নভাবে ড্রেজিং করা মাটি-বালি ব্যবস্থাপনার পর্যাপ্ত জায়গার বিষয়ে ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, গাইবান্ধা, জামালপুর, শেরপুর, গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক, সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে সরেজমিন পরির্দশন করা হচ্ছে এবং কিছু জায়গার সমাধান হচ্ছে আবার কিছু জায়গার সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ড্রেজিং অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে। এ যাবৎ খননকৃত প্রতিস্থাপিত মাটি-বালির মধ্যে ময়মনসিংহ অঞ্চলে মোট স্পট ১২২টি। এরমধ্যে ৪৮টি স্পটের নিলাম চলমান। বাকি স্পটের মধ্যে বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্প, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ভূমি উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সম্মতিক্রমে ব্যবহার করা হয় এছাড়া অনেক জায়গায় সেটেল হয়ে গেছে। নদীর তীর থেকে দূরবর্তী বিভিন্ন জায়গায় ডাইক নির্মাণ করে সেখানে মাটি-বালি ফেলা হলেও পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অগ্রগতি কম।
তিনি আরো বলেন, ইজারা হওয়া স্বত্বেও উত্তোলিত মাটি-বালি অপসারণ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ডাইক সমস্যা বাড়ছেই। ড্রেজিংয়ের মাটি ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হচ্ছে। শেরপুর জেলার নকলা উপজেলায় নদের সীমানা নির্ধারণ জটিলতায় স্থানীয় জনসাধারণের বাধার কারণে ড্রেজিং কাজ বন্ধ আছে। গাইবান্ধার সন্ন্যাসিচর এলাকায় যেখানে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে যমুনা নদীর সংযোগস্থল (অফটেক অঞ্চল) স্থানীয় লোকজন বাধার কারণে সেখানে ড্রেজিং করা সম্ভব হয়নি। ওই স্থানগুলোয় নদী ভাঙন অংশের স্থানীয় জনগণ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করে। যেসব জায়গা ভাঙছে সে সব এলাকায় ব্যাংক প্রটেকশন কাজ শুরু করার লক্ষ্যে স্থানীয় মিটিং করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হবে।
প্রকল্প পরিচালক আরো বলেন, খননকৃত ১৮৬ কিলোমিটারের মধ্যে ১৫০ কিলোমিটার এলাকায় নদের গভীরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীতে সারা বছর পানি থাকছে। কৃষক নদীর পানি কৃষি কাজে ব্যবহার করছে। নদীতে মাছের প্রজনন বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীভাঙন কমেছে। নৌযান চলাচল করছে।
সূত্র জানায়, গত ৩১ মে ব্রহ্মপুত্র নদ ও যমুনা নদীর সংযোগস্থল অফটেকে তীর রক্ষা ও খনন কাজ উদ্বোধন করেন গাইবান্ধা-৪ এর সংসদ সদস্য মাহমুদ হাসান রিপন। ব্রহ্মপুত্র নদ ও যমুনা নদীর সংযোগস্থল অফটেকে ভাঙন প্রবণ ও ভরাট প্রবণ এলাকা। এজন্য সার্বক্ষণিক সংরক্ষণ ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন হবে। গত ৩০-০৫-২০২৪ তারিখে শেরপুর জেলার নকলা উপজেলার নারায়ণখোলা এলাকায় ড্রেজিং সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে শেরপুর জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ্য, ব্রহ্মপুত্র বাহাদুরবাদের উজানে বৈরাল সারের কাছে যমুনার যে দারাটি জামারপুরের পুল্লী কান্ডি হয়ে জামালপুর জেলা এবং ময়মনসিংহ জেলার ভেতর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে মেঘনা (অপার) নদীতে পড়েছে তার নামই পুরাতন ব্রহ্মপুত্র। ১৭৮৭ সালে তিস্তা নদীতে বন্য এবং ভূমিকম্পের কারণে মধুপুর অঞ্চল উঁচু হওয়ায় ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে যমুনা নদীতে পড়েছে। তখন থেকে এর প্রাচীন গতিপথ ক্ষীণকায় হতে হতে প্রায় মরে যায়। কেবল বর্ষাকালে এই নদীপথ দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। বর্ষাকালে এই নদীর জামালপুর অংশে ভাঙনের প্রবণতা রয়েছে। ঝিনাই, বানার-আপার, সুতিয়া শীতলক্ষ্যা, বানার লোয়ার, আড়িয়াল খাঁ, আইমান, আছিল প্রভৃতি পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী। জিঞ্জিরাম ও মরা-জিঞ্জিরাম পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের উপনদী।





