গ্যাস নিয়ে দুশ্চিন্তায় সরকার

প্রতীকী ছবি

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি

আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা

গ্যাস নিয়ে দুশ্চিন্তায় সরকার

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

গ্যাসের ওপর ভিত্তি করে সিরামিক ও বস্ত্রশিল্প উদ্যোক্তারা বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। এতে শিল্পখাতে প্রতিনিয়ত জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে। সে অনুযায়ী উত্তোলিত হচ্ছে না গ্যাস, আমদানি করেও মেটানো যাচ্ছে না পুরো চাহিদা। বর্তমানে মোট চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশ গ্যাস উৎপাদন হয় দেশে। বাকিটা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটে মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে এসব শিল্প খাতে। 

যদিও শিল্প খাতে জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সরকার বিদেশে থেকে গ্যাস আমাদানি করে থাকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দামের চাপে দিশেহারা সরকার। কারণ আমদানি করা গ্যাসে বর্তমানে সরকারকে বছরে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়। এ অবস্থায় দেশে গ্যাস সংকট নিরসন ও ভর্তুকি কমানোর বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় সরকার। তাই সরকারের এ ভর্তুকি কমাতে গ্যাসের দাম দ্বিগুণের ওপরে বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে।

দৈনিক জোগান দেওয়া গ্যাসের বড় অংশ ব্যবহূত হয় ৭০টির মতো সিরামিক কারখানায়। এই শিল্পের উৎপাদন থেকে শুরু করে গুণগত মান ধরে রাখা পর্যন্ত অন্যতম নিয়ামক প্রাকৃতিক গ্যাস। এছাড়া বস্ত্রখাতও গ্যাসের বড় অংশের গ্রাহক। কিন্তু সেখানেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অন্তত ২৫ শতাংশ কম গত তিন মাস ধরে। আর এই সংকটের জন্য দায়ী আমদানির ঘাটতি। উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের ওপর ভিত্তি করে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়তে তাদের বিনিয়োগ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এছাড়া গ্যাসের চাহিদা রয়েছে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রেও। তবে চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ দিন দিন কমে আসছে। এতে তাদের শিল্প ও বিনিয়োগ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।  

অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় সামনের দিনগুলোয় এ চাহিদা আরো বাড়বে বলে সরকারি-বেসরকারি নানা গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে জ্বালানি পণ্যটির চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে সরবরাহ বাড়ার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না কেউই। প্রাকৃতিক গ্যাসের নতুন মজুত ও উত্তোলনযোগ্য ক্ষেত্র অনুসন্ধানের কাজটিও খুব একটা গতি পাচ্ছে না। এ অবস্থায় আগামীতে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান ক্রমেই বাড়বে বলে আশঙ্কা জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের। একই আশঙ্কা করছে খাতটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনও (বিইআরসি)। সংস্থাটির এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি ৫৫০ কোটি ঘনফুট ছাড়িয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে ওই সময় গ্যাসের মোট চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভরতা বেড়ে ৮৫ শতাংশও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে যে হারে গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে তাতে ২০৩০ সাল নাগাদ জ্বালানি পণ্যটির অভ্যন্তরীণ মজুদ ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে আসবে। গত অর্থবছরেও (২০২০-২১) দেশে দৈনিক চাহিদার বিপরীতে স্থানীয় সরবরাহের ঘাটতি ছিল ১৮৮ কোটি ঘনফুট। ২০২৫ সাল নাগাদ তা বেড়ে ৩৯০ কোটি ঘনফুট হবে। ২০৩০ সালে এ ঘাটতি আরো বেড়ে দাঁড়াবে ৫৫৮ কোটি ঘনফুটে। গ্যাস সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান-২০১৭ ও পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যান সমন্বয়ের ভিত্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বিইআরসি।

গ্যাস উত্তোলন কমে আসা এবং নতুন কোনো ক্ষেত্র আবিষ্কার না হওয়ায় ক্রমান্বয়ে আমদানিনির্ভর লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) নির্ভর হয়ে পড়ছে দেশ। ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি করতেও প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে জ্বালানি বিভাগকে। কেননা বিশ্ববাজারে এর দাম অনেক বেশিই ওঠা-নামা করে। এমন পরিস্থিতিতে সামনের দিনগুলোতে কী করে প্রাকৃতি গ্যাসের সংস্থান বাড়ানো যায়, সে বিষয়েই পরিকল্পনা কষছেন সংশ্লিষ্টরা।

এলএনজির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান আরপিজিসিএলের হিসাবে, ডিসেম্বরে গড় আমদানি ছিল দৈনিক ৫৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট। যা জানুয়ারিতে নেমে আসে মাত্র ৩৭৫ মিলিয়নে। এই কমে যাওয়ার পেছনে কারণ, এলএনজি আসছে একটিমাত্র জাহাজে। সেটারও পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না, আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দামের কারণে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত অর্থবছরে গ্যাসের দৈনিক গড় চাহিদা ছিল ৪৩০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে স্থানীয় উত্তোলন ও আমদানীকৃত এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ হয়েছে ৩০১ কোটি ঘনফুট। সে হিসাবে চাহিদার বিপরীতে দৈনিক সরবরাহের ঘাটতি ছিল প্রায় ১৩০ কোটি ঘনফুটে। আমদানিকৃত এলএনজির সরবরাহ বাদ দিলে শুধু স্থানীয় সরবরাহ বিবেচনায় নিয়ে গত অর্থবছরে গ্যাসের দৈনিক সরবরাহে ঘাটতি ছিল প্রায় ১৮৮ কোটি ঘনফুট।

বিশেষজ্ঞর ও ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম প্রেসিডেন্সির স্পেশাল এনভয় আবুল কালাম আজাদ বলেন, দেশের শিল্প খাতের সম্প্রসারণ ঘটছে অনেকটা গ্যাসের ওপর নির্ভর করে। জ্বালানি পণ্যটির টেকসই সরবরাহ নিশ্চিত না করা গেলে সামনের দিনগুলোয় এ ধরনের বিড়ম্বনা আরো বড় হয়েও দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় দেশেই গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি লাভজনক আমদানির পথও নিশ্চিত করা জরুরি।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, দেশে গ্যাসের মজুত ক্রমান্বয়ে ফুরিয়ে যাবে, এটি আগেই আমাদের প্রক্ষেপণ করা ছিল। কী পরিমাণ কমে যাবে সেটিরও উল্লেখ আছে। কিন্তু এর বিপরীতে সংকটটা কীভাবে সামাল দেব, তা নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। গত এক বছরে পেট্রোবাংলার আওতাধীন কোম্পানিগুলোর গ্যাস উৎপাদন কমেছে অন্তত ৫০ কোটি ঘনফুট। দেশীয় গ্যাসকূপগুলোর সক্ষমতা কমছে বহু আগ থেকে। এটি বাড়ানোর জন্য কম্প্রেসার বসানোর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সে উদ্যোগ আমরা যথাসময়ে নিইনি। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাসের মূল্যে অস্থিরতা চলছে। আগামীতে কী হবে সেটিও বলা মুশকিল। স্থায়ী সমাধানে যেতে হলে দেশীয় অনুসন্ধান-উত্তোলনের পাশাপাশি সরবরাহের সুষ্ঠু একটা চ্যানেল তৈরি করতে হবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সঙ্গে জ্বালানির চাহিদা বেড়ে যাবে এটাই নিয়ম। সেই চাহিদা পূরণে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। যেহেতু আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত, তাই দেশে উত্তোলিত গ্যাসের সঙ্গে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করে চাহিদার জোগান দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে সেই সরবরাহ আরও নির্বিঘ্ন করতে নেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ।

প্রতিমন্ত্রী জানান, ২০২১ সালে, প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানিতে গড়ে ব্যয় হয়েছে ২৫ ডলার করে। যা দেশীয় বাজারে কম দামে বিক্রি করায়, বার্ষিক ৯ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি গিয়ে ঠেকছে ১৮ হাজার কোটিতে।

তিনি বলেন, সরকারের জন্য বর্তমানে আরো দুশ্চিন্তার কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের চড়া দাম। যা নিয়ন্ত্রণে না এলে, অস্বাভাবিক ভর্তুকির ফাঁদে পড়বে জ্বালানি বিভাগ। এই মুহূর্তে দাম বাড়ানোর বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি জানান, এটি যাতে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে না যায়, সেদিকে নজর আছে সরকারের।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads