গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কতদূর...

প্রতীকী ছবি

মুক্তমত

গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কতদূর...

  • প্রকাশিত ২৬ নভেম্বর, ২০১৮

বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ ও নয়াপল্টনে মনোনয়নপত্র কিনতে এসে শোডাউনের নামে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, সড়কে মিছিল ও রাস্তা বন্ধ করে একেক নেতা যে পরিমাণ জনসমাগম করেছেন, তাতে ঢাকা শহরের রাস্তায় সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে যেকোনো ইন্ধন বা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই হোক, পুলিশের যানবাহন পোড়ানো, সহিংসতা ছড়ানো, হামলা চালিয়ে পুলিশকে আহত করা খুবই দুঃখজনক। ঢাকঢোল পিটিয়ে মানুষের মনজয় করা যায় না। জনগণ চিন্তাভাবনায় অনেক এগিয়েছে। অসুস্থ, বয়োবৃদ্ধ ও কর্মব্যস্ত সর্বসাধারণকে অতিষ্ঠ না করে, তাদের পরিবর্তিত মনোভাবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মসূচি ঠিক করতে হবে। কারো কোনো প্রভাব, পেশিশক্তি প্রয়োগ ও কালো টাকার শক্তিমত্তা প্রদর্শন করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যাদের ভোটে দল বা জোট সরকার গঠন করবে, তাদের কষ্ট দেওয়া তো গণতান্ত্রিক আচরণ নয়। কেন্দ্রীয় নেতাদের কথাবার্তা সংযত হতে হবে। উসকানি নয়, উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা ইসিসহ সব দল ও জোটের দায়িত্ব। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে রাজনৈতিক জোট ও দলের কোনো অপশক্তিকে ব্যবহার করা উচিত হবে না।

সারা বছর জনগণের সুখে-দুঃখে, বিপদ-আপদে যাদের খবর ছিল না, তারা যেন এখন পলিটিক্স পাগল হয়ে গেছেন! ৩০০ আসনের বিপরীতে জোট ও দলগুলো থেকে ১০ হাজারের ঊর্ধ্বে মনোনয়ন বিক্রি হয়েছে। বিনোদন তারকা, সংগীতশিল্পী, খেলোয়াড়, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ছাত্র, উকিল, সাংবাদিক, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, চাকরিজীবী, শিল্পপতি, বেকার সবাই নেতা হতে চান, এমপি হতে চান! আর সবখানেই দলের রঙে বিভাজন। চরিত্র-আদর্শের বাইরে ক্ষমতায় যেতে দলতন্ত্র, ক্ষমতায় গেলে দলকানা পৃথিবীর আর কোনো দেশে আছে কি? এভাবে নির্বাচনের পূর্বমুহূর্তে শুধু পদ ও ক্ষমতা পাওয়ার জন্য লম্ফঝম্প দেশের পরিস্থিতিকে অরাজকতা আর বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত করার পাশাপাশি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধা সৃষ্টি হতে পারে বলে রাজনৈতিক বোদ্ধামহল মনে করছেন। নির্বাচনকালে সব রাজনৈতিক দল বা জোটের সত্যিকার গণতন্ত্রচর্চায় মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। অগণতান্ত্রিক আচরণ সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায়।

প্রতিটি দলের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে শীর্ষ নেতৃত্বকে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে। শুধু সব দলের অংশগ্রহণই নয়, নির্বাচনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে। কেউ যদি মনে করে পরীক্ষার্থী, প্রশ্নকর্তা, পরীক্ষার হলের কর্মকর্তা, পরীক্ষক, পরিদর্শকসহ পুরো সিস্টেমই তাদের হাতের মুঠোয় আছে! ফল নিজের মতো করে পেতে কোনো বেগই পেতে হবে না! তবে সেটা কোনো স্বচ্ছ মানসিকতার পরিচয় বহন করবে না। ‘চোরকে বলবে তুমি চুরি কর, পাহারাদারকে বলবে পাহারা দাও’- এ রকম যেন না হয়। নির্বাচনকালে সরকারের ভূমিকা হবে সহায়তামূলক, পক্ষাবলম্বন বা কর্তৃত্বমূলক নয়। এ ছাড়াও পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে রাজনৈতিক দল বা জোটের সম্পর্ক সহায়ক, সম্পূরক ও পরিপূরক হতে হবে। নানা অভিযোগ ও ক্ষমতাসীনদের প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে পুলিশকেও কলঙ্কমুক্ত বাহিনী হতে হবে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া চলবে না।

প্রার্থীদের এমন কোনো সভা-সমাবেশ ও প্রচারণা চালানো উচিত হবে না-যেগুলো জনদুর্ভোগ ডেকে আনে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, সহিংসতা ও সব ধরনের বিশৃঙ্খলাপূর্ণ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থেকে নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার উদ্দেশ্যে সব রাজনৈতিক দল ও জোটকে সর্বদা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং সর্বাবস্থায় রাজনৈতিক আচরণবিধি মেনে চলা জরুরি।

সর্বসাধারণের কাছে একটি গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু, স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের জন্য ‘নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন’ ও সাংবিধানিক কাঠামো অতীতের কোনো সরকারই করেনি। ক্ষমতা দখলের জন্য ‘ঢাল’ হিসেবে নির্বাচনকে না নিয়ে জনগণের সেবক হওয়ার সুযোগ কেউ নেয়নি। প্রার্থী ও কর্মীদের নির্বাচনী প্রচারণায় অন্য দলের বিরুদ্ধে কোনো বানোয়াট, ছলচাতুরী বা প্রতিহিংসামূলক ধারণা জনসমক্ষে প্রচার না করে বরং নিজেদের বাস্তব রূপ ও ভবিষ্যৎ উদ্দেশ্য উপস্থাপন করতে হবে। উসকানিমূলক, অসত্য, অলীক, গুজব ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির প্রবণতা থেকে বিরত থাকতে হবে। গণতন্ত্রে নির্বাচনের মূল চালিকাশক্তি হলো জনগণ। রাজনীতির মারপ্যাঁচ জনগণ বুঝতে চায় না, সর্বসাধারণ নির্বাচনের জন্য মুখিয়ে আছে। তাদের আনন্দঘন পরিবেশ উপহার দেওয়াই রাজনৈতিক দল ও জোটের কৌশল হতে হবে।

রাজনীতিতে মতভেদ থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, বিরোধিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা বা সংঘাত চলতে দেওয়া যাবে না। মিথ্যাচার ও নেতিবাচক রাজনীতির ধারা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে যে জিনিসটি বেশি মাথায় রাখতে হবে- যোগ্য, উপযুক্তদের মনোনয়ন দিতে হবে। অসৎ, আদর্শহীন, নীতিহীন, ঋণখেলাপি, লুটেরা চক্র যাতে নমিনেশন পেতে না পারে, এদিকে প্রতিটি দল ও জোট সচেতন থাকলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করা যায়।

দেশের শান্তিপ্রিয় সর্বসাধারণ আশাবাদী, একাদশ সংসদ নির্বাচনে যোগ্য ব্যক্তিরা ক্ষমতায় আসবে, দেশের সাফল্য ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে। সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে আন্তরিকতা, সচেতনতা ও সহযোগিতার মনোভাব আশা করে সাধারণ মানুষ। সরকার ও বিরোধী দল— সবার রাজনীতি হতে হবে কল্যাণকর ও অর্থনীতিবান্ধব।

মোহাম্মদ আবু নোমান

লেখক : সাংবাদিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads