গ্রাহকের কাঁধেই বিলের বোঝা

প্রতীকী ছবি

জাতীয়

গ্রাহকের কাঁধেই বিলের বোঝা

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ২২ মার্চ, ২০২২

গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো সিস্টেম লসের নামে চুরি হওয়া গ্যাসের বিল গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করছে। অভিযোগ রয়েছে, তিতাসসহ ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতে কর্মরত কিছু কর্মচারী-কর্মকর্তা মিলেমিশে অবৈধ সংযোগ দিয়ে এ সিস্টেম লস তৈরি করেছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের তথ্য মতে গ্যাসের সিস্টেম লস বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা দেখানো হচ্ছে। অথচ সিস্টেম লসের নামে গ্রাহকের কাছ থেকে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা আদায় করছে গ্যাস বিতরণ কর্তৃপক্ষ। এছাড়া গ্যাসের নামে বাতাস দিয়ে বছরে ২,০০০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তিতাস গ্যাসের বিরুদ্ধে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনিতেই বিভিন্ন পন্থায় গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে গ্যাস বিতরণ কর্তৃপক্ষ। এরমধ্যে গ্যাসের বিল বৃদ্ধি করলে বৈধ গ্রাহকরো আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাছাড়া গ্যাসের সিস্টেম লস হিসাবে যে পরিমাণ গ্যাস দেখানো হয়েছে, তা গ্রাহকদের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কোষাগারকেও আঘাত করে।     

বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস্ কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল), বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান। বৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী এ কোম্পানি গ্যাসের গুণগতমান বজায় রেখে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস ট্রান্সমিশন সিস্টেমে উৎপাদিত গ্যাস সরবরাহ করে থাকে। বিজিএফসিএল দেশের মোট প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৩১ শতাংশ গ্যাস উৎপাদন করে। গ্যাসের সাথে উপজাত হিসেবে উৎপাদিত কনডেনসেট প্রক্রিয়াকরণ করে মোটর পেট্রোল (এমএস) এবং ডিজেল (এইচএসডি) উৎপাদন করে দেশের জ্বালানি চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করে।

বর্তমানে বিজিএফসিএল-এর আওতায় ছয়টি গ্যাস ফিল্ড রয়েছে তিতাস, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ, নরসিংদী, মেঘনা ও কামতা। এ ছয়টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে পাঁচটি অর্থাৎ তিতাস, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ, নরসিংদী ও মেঘনা গ্যাসক্ষেত্র বর্তমানে উৎপাদনে আছে। অতিরিক্ত পানি উৎপাদনের জন্য কামতা ফিল্ড হতে গ্যাস উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। সমপ্রতি আন্তর্জাতিক অয়েল কোম্পানি স্যান্টোস পরিচালিত সাঙ্গু গ্যাস ক্ষেত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পেট্রোবাংলার সিদ্ধান্তক্রমে চট্টগ্রামের সিলিমপুর প্লান্ট স্থাপনা বিজিএফসিএল এর অধীন করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পেট্রোবাংলা প্রতি বছর যে বিশাল সিস্টেম লস দেখায় তার বাজারমূল্য প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। অথচ চুরি বন্ধ করে হাজার হাজার কোটি টাকার গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব। কিন্তু চুরি বন্ধে কার্যকর তেমন কোনো উদ্যোগ না নিয়ে ঘাটতি মেটাতে সরকার চড়া দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনছে।

গ্যাস ট্রান্সমিশন এবং ডিস্ট্রিবিউশনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সিস্টেম লস দুই শতাংশের নিচে। কিন্তু বাংলাদেশে এটি বার্ষিক গড়ে ১০ শতাংশ। অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মোটা অঙ্কের গ্যাস লোপাট দেখাচ্ছেন। এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে বৈধগ্রাহকরা পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না পেলেও অনেকেই বিতরণ কোম্পানিকে টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে চড়া দামে কেনা এলএনজি অবৈধ সংযোগে চলে যাওয়ায় জনসাধারণকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, অনেক সময় সিস্টেম লস ১৪-১৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে এই হার ২ শতাংশের বেশি নয়। যে অতিরিক্ত দেখানো হচ্ছে তা অবৈধ সংযোগে যাচ্ছে। কিছু মানুষ এই পন্থায় যে ভাবে গ্যাস পাচ্ছে সেটা বেআইনি। আর অবৈধ পন্থায় বিক্রি গ্যাসের দাম যায় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পকেটে। অন্যদিকে কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লসের কবলে পড়ে গ্রাহককে দিতে হয় হাজার হাজার কোটি টাকা।

দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস সিস্টেমের ক্ষতির বিষয়ে জানতে পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে পেট্রোবাংলা প্রতি বছর বিইআরসিকে গ্যাস সিস্টেম লসের তথ্য পাঠায়। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট গ্যাস সিস্টেম লস ছিল ১০ দশমিক ১০ শতাংশ। ফলে এই সময়ে বাংলাদেশ ১০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস হারিয়েছে। বর্তমানে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ১২ দশমিক ৬০ টাকায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকার প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা লোকসান করেছে। পেট্রোবাংলা ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ সিস্টেম লস দেখিয়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানি ইডিএফ এনার্জির একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইউরোপীয় দেশগুলোতে গ্যাস সিস্টেম লস প্রতি বছর ১ দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশের মধ্যে। একই চিত্র উত্তর আমেরিকার। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) মতে, দেশটির গ্যাস সিস্টেম লস ২ শতাংশের নিচে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান আবদুল জলিল মনে করেন, বাংলাদেশের গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত না হলেও ১০ শতাংশ গ্যাস হারানো সম্ভব নয়। ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন পাইপে যতই ত্রুটি থাকুক না কেন, বাংলাদেশে ৪ শতাংশের বেশি গ্যাস নষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তার মতে, গ্যাসের সিস্টেম লস বছরে অন্তত ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা দেখানো হচ্ছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদনে বাংলাদেশে গ্যাস বিতরণে ব্যাপক দুর্নীতির কথা উঠে এসেছে। ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে, দুদক দেশের বৃহত্তম গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে দুর্নীতির ২২টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মিটার টেম্পারিং, বকেয়া টাকা না দেওয়া, মিটার বাইপাস সংযোগ, অতিরিক্ত গ্যাস বিক্রি করে অর্থ আত্মসাৎ এবং ভুয়া সিগন্যাল দিয়ে অবৈধ গ্রাহকদের কাছ থেকে বিল আদায়ের ক্ষেত্রে তিতাসের কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের মতে, গত বছর তিতাস গ্যাসের সিস্টেম লস ছিল ৫ শতাংশ। মহামূল্যবান গ্যাসের ব্যাপক ক্ষতির বিষয়ে সংসদে এ কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।

আলাপকালে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস খাতে অনিয়ম চলছে। সবকিছু ঠিক করতে সময় লাগে। অবৈধ গ্যাস সংযোগের কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্রাহক পর্যাপ্ত গ্যাসের সরবরাহ পায় না। তবে আমরা অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি। আশাকরি শিগগির পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাবে।

একদিকে দেশের ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে সিস্টেম লস দেখাচ্ছে, অন্যদিকে গ্যাস ছাড়াই বৈধ গ্রাহকদের কাছ থেকে চাঁদা নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তিতাস কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্তমানে তাদের আবাসিক গ্রাহক ২৮ লাখ ৪৬ হাজার ৪১৯ জন। এর মধ্যে প্রিপেইড মিটার পেয়েছেন ২ লাখ ১২ হাজার গ্রাহক।

গবেষণায় দেখা গেছে, একজন প্রিপেইড মিটারসহ গ্রাহক প্রতি মাসে ৪৫দশমিক ৫০ ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করেন। প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১২ দশমিক ৬০ টাকা হলে গ্রাহকের মাসিক বিল ৫৬৭ টাকা। অন্যদিকে পোস্টপেইড গ্রাহকদের দুটি চুলার জন্য ৯৭৫ টাকা দিতে হয়। প্রিপেইড গ্রাহকদের সমতুল্য বিবেচনা করে, প্রতিটি পোস্টপেইড গ্রাহকের প্রতি মাসে ৭৭ দশমিক ৩৬ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করার কথা। কিন্তু বাস্তবে, তারা এর অর্ধেকেরও কম ব্যবহার করে।

বিইআরসি বলছে একটি প্রিপেইড মিটার স্থাপন করলে প্রতি চুলায় ৩৩ ঘনমিটার বা বছরে প্রায় ৫৩ বিসিএফ গ্যাস সাশ্রয় হবে। এর বাজার মূল্য দুই হাজার কোটি টাকার বেশি।

সরকারের জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকার অনেক আগেই প্রিপেইড মিটার বসানোর পরিকল্পনা করলেও বিতরণ কোম্পানিগুলোর দুর্নীতির কারণে তা হচ্ছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিতরণ কোম্পানির কয়েকটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বিভিন্নভাবে প্রিপেইড মিটার বাস্তবায়নে বাধা দেয়। এ বিষয়ে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুনুর রশিদ মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে পেট্রোবাংলা বলছে, প্রতি বছরই দেশে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। আবাসন, বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে বছরে ১ টিসিএফ প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার হয়, যার মূল্য ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই গ্যাসের ৭২ শতাংশ মেটানো হয় নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে। প্রতিদিন ৬০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে, যার মূল্য প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। অন্য কথায়, বিদেশ থেকে খুব কম পরিমাণ গ্যাস আমদানি করা হয় এবং এর দাম দেশের মোট গ্যাসের মূল্যের প্রায় অর্ধেক।

এ বছর স্পট মার্কেটে এলএনজির প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (এমএমবিটিইউ) দাম বেড়েছে ৪০ ডলার। ফলে এলএনজি কিনতে ইতিমধ্যে ৩০ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে পেট্রোবাংলা। অর্থাৎ আমদানিকৃত গ্যাসের ২৮ শতাংশের দাম দেশের ৭২ শতাংশ গ্যাসের দামের চেয়ে বেশি হবে। অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রভাবে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে সরকারে। সামাল দিতে না পেরে সরকার বার বার গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিচ্ছে। তবে দেশে সঞ্চালন ও বিতরণের পর্যায়ে এই মূল্যবান গ্যাসের একটি বড় অংশ চুরি হয়ে যাচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, আমরা বার বার বলেছি আমাদের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়াতে হবে কিন্তু সরকার আমদানির দিকে এগোচ্ছে। তবে ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কর্মকর্তারা অবৈধ সংযোগের টাকা গ্রাহকের কাছ থেকে তুলে নিচ্ছেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads