শীতের ঘন কুয়াশায় লালমনিরহাটের কাটাতারের বেড়াবিহীন জেলার অরক্ষিত সীমান্ত এলাকা হয়ে উঠছে। সীমান্ত এলাকা মাদক, গরু পারাপার ও চোরাচালানকারীদের অভয়ারণ্যতে পরিণত হয়েছে। সীমান্ত ঘেষা নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় দু’দেশের মানুষের চলছে অবাধ যাতায়াত। এতে বছরের অন্য সময়ের তুলনায় শীতে বৃদ্ধি পেয়েছে সীমান্ত অপরাধ প্রবণতা।
সীমান্তবর্তী এ জেলার ২শ ৮৪ কিলোমিটার সীমান্তপথের ৫৪ কিলোমিটার অংশে কাঁটাতারের বেড়া নেই। সীমান্ত অপরাধ ঠেকাতে সীমান্তে বিজিবির তিনটি ব্যাটালিয়ন তথা ১৫, ৫১ ও ৬১ ব্যাটালিয়ন কাজ করছে। এরপরও ঠেকানো যাচ্ছে না চোরাচালানের ঘটনা। গত এক মাসের ব্যবধানে সীমান্তের দুইটি পয়েন্টে দুইজন বাংলাদেশি বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছেন। বছরজুড়ে কাঁটাতারের বেড়াবিহীন সীমান্ত পথে সীমান্তরক্ষীদের নজরদারীকে ফাঁকি দিয়ে চোরাকারবারি হলেও শীতের মৌসুমে তা বেড়ে গেছে বহুগুণে। সীমান্তে লাইটের পর্যাপ্ত থাকলেও ঘন কুয়াশায় তা মিশে যায়। কাছাকাছি কেউ থাকলেও সহজে বোঝা যায় না। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়েছেন চোরাকারবারি সিন্ডিকেট।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সীমান্তের অন্তত ৩০টিরও বেশি পয়েন্ট দিয়ে প্রতিরাতে গরু পারাপার করছে শতাধিক চোরাকারবারি সিন্ডিকেট। আর গরুর সঙ্গে সীমান্ত পেড়িয়ে দেশে আসছে মাদকের বড় বড় চালান। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতার মদদে বিজিবির কতিপয় অসাধু সদস্যদের ম্যানেজ করে এক শ্রেণীর ব্যক্তিদের মাধ্যমে চোরাকারবারিরা সংগঠিত হয়েছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ পথে আসা এসব গরু স্থানীয় বিভিন্ন বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। গরুর করিডোর না হওয়ায় সরকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর মাদকের ভয়াবহতাও বাড়ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাতে এসব গরু পারাপারের ফলে সীমান্ত এলাকার ফলসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু চোরাকারবারিরা এতোটাই প্রভাবশালী যে তাদের ভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা মুখ খুলতে চান না।
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ আরজু সাজ্জাদ হোসেন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আর জেলা ডিবি পুলিশের অফিসার ইনচার্জ ওমর ফারুখ বলেন, গোয়েন্দা পুলিশের কোনো সদস্য ওই এলাকায় যান না। তবে অভিযোগ পেলে তারা অভিযান পরিচালনা করবেন বলেও তিনি জানান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে লোহাকুঁচি এলাকার বাসিন্দারা বলেন, সীমান্তপাড়ের মানুষের কৃষি কাজ ছাড়া অন্য কোন কাজের ব্যবস্থা নেই। তাছাড়া বিএসএফের আতঙ্কে অনেক সময় কৃষি কাজও ভালোভাবে করতে পারেন না তারা। এছাড়া কাজের তেমন কোন সুযোগ না থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা চোরাকারবারির সাথে যুক্ত হয়েছে।
দুলালী সীমান্তের এক শিক্ষিত যুবক বলেন, উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে দীর্ঘ সময় চাকরির বাজার ঘুরে চাকরি না পেয়ে এখন তিনি চোরাকারবারির সাথে যুক্ত হয়েছেন। তবে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হলে আলোর পথে ফিরবেন বলেও দাবি তার।
এদিকে বেশ কয়েকটি সীমান্ত ঘুরে দেখা যায়, দিনের বেলায় কৃষি কাজের নাম করে ভারতীয়রা যেমন বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন তেমন বাংলাদেশীরাও ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছেন। এসব লোকের অনেকের রয়েছে দু’দেশের জাতীয় পরিচয়পত্র। প্রকাশ্যে গাঁজা, ফেন্সিডিলসহ বিভিন্ন প্রকার মাদকদ্রব্য অবাধে পারাপার করছে। আবার কেউ কেউ গরুর ঘাস সংগ্রহের নামে ঘাসের বস্তার ভিতরে এসব নেশা জাতীয় দ্রব্য পারাপার করছে। আর রাতে তো কাঁটাতারের বেড়ার ওপর দিয়ে বাঁশের চরকি দিয়ে গরু পারাপারের ঘটনা অনেক পুরোনো। তবে কোথাও আবার কাঁটাতারের নিচ দিয়ে সুরঙ্গ করাও রয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীরা দুই দেশের জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত হয়ে এসব চোরাই পথ দিয়ে ভারতে গিয়ে অবস্থান করছেন।
সীমান্ত অপরাধ নিয়ে কাজ করেন এমন কয়েকটি সংগঠনের নেতাদের সাথে কথা বলে যায়, সীমান্ত অপরাধ কমাতে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত, জনসচেতনতা সৃষ্টি ও অরক্ষিত সীমান্ত এলাকাগুলোতে বিজিবির নজরদারী বাড়ানোর সুপারিশ তাদের।
এ ব্যাপারে লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল তৌহিদ বলেন, সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিজিবির কঠোর নজরদারী ও জোর তৎপরতা রয়েছে। তবে সব চাইতে জরুরি জনসচেতনতা বৃদ্ধি করে সমন্বিতভাবে কাজ করা। এজন্য তিনি জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ ও স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিদের এগিয়ে আসারও আহ্বান জানিয়েছেন।





