সারা দেশ

চট্টগ্রামের আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভান্ডাররক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

  • ''
  • প্রকাশিত ১১ জুলাই, ২০২৪

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

চট্টগ্রামের আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টোরকিপার (ভাণ্ডাররক্ষক) এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। গত ২৭ মে চট্টগ্রাম বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (স্বাস্থ্য) বরাবর মনছুরুলের বিস্তর অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয় । যেখানে ভুক্তভোগী ২১ জনের মোবাইল ফোন নম্বরসহ স্বাক্ষর যুক্ত আছে।

জানা যায় ,মো. মনছুরুল ইসলাম আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্টোরকিপার (ভান্ডার রক্ষক) পদে কর্মরত আছেন । তবে দুই-চার বছর নয়,১২ বছরের বেশি সময় একই কর্মস্থলে বহাল তিনি। যদিও নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তিন বছরের বেশি সময় একই কর্মস্থলে থাকতে পারেন না। শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আসা বদলির আদেশ অমান্য করে আনোয়ারাতেই অবস্থান করছেন মনছুরুল। একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন ডালপালা মেলেছে। অনেকেই বলছেন, ভান্ডার রক্ষক পদে কী এত মধু যে, চেয়ার আঁকড়ে রাখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বদলির আদেশকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়!

মনছুরুল ইসলাম স্টোর কিপার পদে প্রথম চাকরিতে যোগদান করেন আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০১২ সালের ৭ নভেম্বর। সেখান থেকে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি হন ২০১৮ সালে। তবে সেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মাত্র ছয় মাস চাকরি করে অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে আবারও বদলি হয়ে আসেন আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এরপর ২০১৯ সালে ভাণ্ডাররক্ষক পদে থাকা মনছুরুল ইসলামকে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলির আদেশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ওই বছরের ২ অক্টোবর মনছুরুলকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) ডা. শহিদ মো. সাদিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত আদেশে কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভাণ্ডাররক্ষক হিসেবে বদলি করা হয়। যার স্মারক নং-স্বা.অধি./প্রশা-৩/বদলি কমিটি-৫৫০/১৯/৭০৮৩/১(৭)। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অদৃশ্য ক্ষমতার প্রভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বদলির আদেশকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই ‘রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন’ মনছুরুল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনছুরুল ইসলাম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘বদলির আদেশটি ১৫ দিন পর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসে। ওই সময় স্টোর কিপার পদের দাায়িত্ব কেউ নিতে চাননি। তাই তখনকার টিএইচও (উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা) স্যার আমাকে ছাড়েননি। এজন্য আমিও যাইনি। বদলির আদেশের মেয়াদ থাকে ছয় মাস, এখন ওই আদেশের পাঁচ বছর পার হয়ে গেছে।’

তবে আনোয়ারার তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু জাহিদ মো. সাইফউদ্দিন জানান, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। আর কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শংকর প্রসাদ অধিকারী বলেন, ‘এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আমি নতুন। ২০১৯ সালের বদলির বিষয়ে জানব না। তবে এখানে ভাণ্ডাররক্ষক পদে একজন কর্মচারী ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।’

মনছুরুলের বদলির আদেশ আমান্যের বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ারার বর্তমান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ বলেন, ‘২০২২ সালে আমি এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করি। তখন থেকে দেখছি তিনি (মনছুর) কর্মরত আছেন, বেতন-ভাতা তুলছেন। এর আগে কী আদেশ হয়েছে, তা আমি অবগত ছিলাম না। এখন যেহেতু বিষয়টি সামনে এসেছে, আমি তদন্ত করে দেখব।’

অভিযোগ সূত্রে জানা যায় , দীর্ঘদিন এক কর্মস্থলে থাকায় মনছুরুল ইসলাম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিজস্ব একটি বলয় গড়ে তুলেছেন। অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করে হাসপাতালের উন্নয়নকাজসহ যাবতীয় কেনাকাটার নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছেন। স্থানীয় অদৃশ্য শক্তির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে গড়ে তুলেছেন ‘একচেটিয়া রাজত্ব’। তাকে ম্যানেজ করা ছাড়া ঠিকাদারির কাজ পাওয়া অসম্ভব। পুরো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স তার কাছে জিম্মি। তাকে কেউ বদলি করানোর ক্ষমতা রাখে না উল্লেখ করে মনছুরুল প্রায়ই দম্ভোক্তি করেন বলে জানিয়েছেন তার একাধিক সহকর্মী। আর এতে করে মনছুরুলের অনিয়মগুলো দেখার পরও সহকর্মীরা চুপ থাকেন।

ওই লিখিত অভিযোগে বলা হয়, সরকারি কর্মচারী হয়েও মনছুরুল ইসলাম বিভিন্ন ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহার করে হাসপাতালে এমএসআর ও পথ্যসামগ্রী সরবরাহের ব্যবসায় সম্পৃক্ত। ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে মোটা অঙ্কের উৎকোচ আদায়, ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে কার্যাদেশের অনেক মালপত্র সরবরাহ না নিয়ে অর্থ ভাগাভাগি, হাসপাতালের ওষুধ ও যন্ত্রপাতি বাইরে বিক্রি করে টাকা আত্মসাৎ এবং বিল-ভাউচার বানিয়ে ভুয়া ভ্রমণ বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া হাসপাতালের জমি ইজারা ও বাসা বরাদ্দের ফাইল নিজ হাতে রেখে যা ইচ্ছা তাই করছেন। হাসপাতালের পুকুর ও বাগান ইজারা না দিয়ে নিজেই ভোগ-দখল করছেন। তাকে ম্যানেজ করা না গেলে হাসপাতালের বাসা বরাদ্দ পাওয়াও মুশকিল।

শুধু তাই নয়, বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারে আউটসোর্সিং ভিত্তিতে নিজের পছন্দের লোক বসিয়ে রোগীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে মনছুরুলের বিরুদ্ধে। নির্ধারিত ফি ৩ টাকার স্থলে ৫ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও নিজ কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) লাগিয়ে সরকারি অর্থের অপচয় করছেন। হাসপাতালের এমটি ইপিআইয়ের জন্য নির্ধারিত মোটরসাইকেল নিজে ব্যবহার করছেন। হাসপাতালের ফ্রিজ ও ল্যাপটপ বাসায় নিয়ে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে মনছুরুলের বিরুদ্ধে।

এদিকে সম্প্রতি আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হিসাবরক্ষক পদে সংযুক্তিতে (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দায়িত্ব পান বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হিসাবরক্ষক মো. সাহেদ মিয়া। তবে মনছুরুল ইসলামের হুমকি-ধমকিতে ওই হিসাবরক্ষক টিকতে পারেননি আনোয়ারায়। এ নিয়ে গত ২ জুন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী ওই হিসাবরক্ষক।

ওই অভিযোগে বলা হয়, চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনের স্মারক নং-সিএসসি/শা-৬/২০২৪/১৬৭৪/১(৯) আদেশমূলে গত ১৮ মে আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হিসাবরক্ষক পদে যোগদান করেন মো. সাহেদ মিয়া। তখন থেকেই স্টোর কিপার মনছুরুল ইসলাম সাহেদ মিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। গত ২১ মে হিসাবরক্ষক সাহেদ মিয়া হাসপাতালের বাইরে একটি রেস্তোরাঁয় নাশতা করতে যান। সেখানে বহিরাগতদের নিয়ে স্টোর কিপার মনছুরুল ইসলাম সাহেদ মিয়াকে উদ্দেশ্য করে বকাবকি করেন। এ সময় উত্তেজিত হয়ে মনছুর বলতে থাকেন ‘আমার বিরুদ্ধে গিয়ে আপন চাচাতো ভাইও হাসপাতালে টিকতে পারেনি। আমার বিষয়ে যদি কেউ নাক গলায় তার চেয়েও খারাপ অবস্থা করব।’ এ ছাড়া গত ১ জুন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সঙ্গে তার কার্যালয়ে দাপ্তরিক বিষয়ে আলোচনা করছিলেন হিসাবরক্ষক সাহেদ মিয়া। সেখানে স্টোর কিপার মনছুর ঢোকার কিছু সময় পর কুমিল্লা থেকে মালপত্র পরিবহনের বিষয়ে কথা হয় তাদের মধ্যে। কথার একপর্যায়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সামনেই রেগে গিয়ে মনছুর হিসাবরক্ষককে গালাগাল করেন। পরে রাজনৈতিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে হিসাবরক্ষককে মনছুর দম্ভোক্তি করে বলেন, ‘বদলি-তদলি আমার জন্য বিষয় নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আমাকে বিভাগীয় বদলির আদেশ দিয়েও যোগদান করাতে পারেনি। কারণ, ক্ষমতা ও টাকার কাছে সবাই হার মানে।’

অভিযোগকারী হিসাবরক্ষক মো. সাহেদ মিয়া বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘স্টোর কিপার মনছুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় উল্টো আমার সংযুক্তির আদেশ বাতিল করা হয়েছে।’

গত ৬ জুন আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খাদ্য ও পথ্যসামগ্রী সরবরাহের দরপত্র জমাদানের শেষ দিন ছিল। এর আগের দিন উপজেলার চাতরী চৌমুহনী বাজারের একটি রেস্তোরাঁয় ঠিকাদারদের নিয়ে সমঝোতা বৈঠকে বসেন মনছুরুল ইসলাম। যার ফল হিসেবে ৩৫টি দরপত্র ফরম বিক্রি হলেও জমা পড়ে মাত্র তিনটি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে খাদ্য ও পথ্যসামগ্রী সরবরাহের বর্তমান ঠিকাদার অসিম কুমারের মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

২০১৪ সালে আনোয়ারার তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বিধুর ভূষণ ভৌমিক এবং ২০১৬ সালে ডা. হুমায়ুন কবিরকে শারীরিক হেনস্তা এবং বিভিন্ন সময় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজনদের পেটানোর অভিযোগ আছে মনছুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গত ২ জুন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন। ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. ওয়াজেদ চৌধুরীকে ওই কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। এই কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে সুস্পষ্ট মতামতসহ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। কিন্তু গত সোমবার পর্যন্ত ১৩ কর্মদিবস পার হলেও তদন্তকাজ শেষ করতে পারেনি কমিটি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সভাপতি ও ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. ওয়াজেদ চৌধুরী অভি বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘তদন্তকাজ এখনো চলমান রয়েছে তবে প্রায় শেষ পর্যায়ে।আমরা অভিযোগ পেয়ে তাৎক্ষণিক তদন্ত কমিটি গঠন করেছি । কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন পেলেই তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।’

তিনি আরো বলেন , আমাদের স্বচ্ছ স্বাস্থ্য খাত এদের মত কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারীর কারণে কলুষিত হচ্ছে।আমার একটাই কথা কোন দুর্নীতিবাজ কাউকে আমি আশ্রয় প্রশ্রয় দিবো না এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যে আপনারা তার প্রমাণ পাবেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads