বাজেট

চাপের বাজেটে বহু চ্যালেঞ্জ

  • তরিকুল ইসলাম সুমন
  • প্রকাশিত ৭ জুন, ২০২৪

অর্থনীতির জন্য বর্তমান সময়টা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে ধীরগতি, ডলার-সংকটসহ নানা অস্বস্তির মাঝে সরকার সর্বকালের বৃহৎ বাজেট প্রস্তাব পেশ করেছে। চাপের বাজেটে দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার সর্বাত্মক প্রচেষ্টার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া যুগোপযোগী শিক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থানে জোর দেওয়া হয়েছে।

আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা, লাভজনক কৃষির লক্ষ্যে সমন্বিত কৃষিব্যবস্থা, যান্ত্রিকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। তা ছাড়া ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা সুলভ করা, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় সবাইকে যুক্ত করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এগুলো বাস্তবায়ন করতে বহু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে সরকার।

মধ্যবিত্তের বিনিয়োগের অন্যতম নিরাপদ মাধ্যম সঞ্চয়পত্র। অতিরিক্ত সুদ পরিশোধ কমাতে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে এরই মধ্যে জুড়ে দেওয়া হয়েছে নানা শর্ত। এতে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমছে ক্রমাগত। বাজেট ঘাটতি পূরণে সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরতা এবার আরও কমিয়েছে সরকার। ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং চ্যানেলকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের সহায়ক হিসেবে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সব ব্যবসায়িক কার্যক্রম ক্যাশলেস হওয়ার শর্তে তিন বছর করমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডলার খরচ কমাতেও নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।

জাতীয় সংসদে আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। গতকাল বিকাল ৩টায় জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন তিনি। প্রস্তাবিত বাজেটে সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের অঙ্গীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর আগে প্রস্তাবিত বাজেট মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ ভবনের মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। এর আগে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বাজেট পেশের সুপারিশ করেন।

জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী হিসেবে মাহমুদ আলী। এটিই তার প্রথমবারের মতো বাজেট উপস্থাপন। দেশের ইতিহাসে ৫৩তম বাজেট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন টানা চতুর্থ মেয়াদের সরকারের প্রথম বাজেট এটি। আর দেশ পরিচালনায় আওয়ামী লীগ সরকারের ছয় মেয়াদের ২৬তম বাজেট। এবারের বাজেট বক্তব্যের শিরোনাম ‘সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অঙ্গীকার’। আগামী ৩০ জুন বাজেট পাস হওয়ার কথা রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর উত্থাপিত প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। ‘সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অঙ্গীকার’ প্রতিপাদ্যে এই বাজেট বিদায়ী ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি। টাকার অংকে ৩৫ হাজার ২১৫ কোটি টাকা বেশি। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটের আকার ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।

জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৭৫ শতাংশ

অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বাজেট বক্তৃতায়, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের অর্থনীতি বর্তমানে কিছুটা চাপের মুখে থাকলেও প্রাজ্ঞ ও সঠিক নীতিকৌশল বাস্তবায়নের ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত আছে। ২০০৯-১০ অর্থবছর হতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ; এটি ছিল সেই সময় বিশ্বের যে কোনো দেশের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। কোভিড-১৯ মহামারির আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এই তথ্য উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট ও অন্যান্য বৈশ্বিক অস্থিরতাজনিত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭ দশমিক ১০ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ (সাময়িক) প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। প্রবৃদ্ধির এই গতিধারা বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্তর্নিহিত শক্তির পরিচয় দেয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধির এ গতি আগামী দিনে ধরে রাখার লক্ষ্যে কৃষি ও শিল্প খাতের উৎপাদন উৎসাহিত করতে সব ধরনের যৌক্তিক সহায়তা অব্যাহত রাখা হবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব ধরনের নীতি সহায়তা বজায় রাখা হবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার মধ্যমেয়াদে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এডিপির ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব

আগামী অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। এসময়ে তিনি বলেন, আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ৯.৭ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর মাধ্যমে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৬১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব করছি। আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেটের আকার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৪.২ শতাংশ। পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে মোট ৫ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি। নতুন বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরে ছিল ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। নতুন বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে দুই লাখ ৮৩ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৪৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরে ছিল ৫ লাখ কোটি টাকা।

সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করবে : অর্থমন্ত্রী

বাজেট উপস্থাপনের আগে সাংবাদিবদের অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, এবারের বাজেট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করবে। যতটুকু সম্ভব ভালো করার চেষ্টা করছি।

প্রস্তাবিত বাজেটে প্রাধান্য পেয়েছে ১৪ কার্যক্রম

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ১১ বিশেষ অগ্রাধিকারের ওপর নির্ভর করে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ১৪ কার্যক্রমকে প্রাধান্য দিচ্ছে সরকার। অর্থমন্ত্রী বলেন, এবারে আমরা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছি। যার মধ্যে রয়েছে- দ্রব্যমূল্য সকলের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো; কর্মোপযোগী শিক্ষা ও যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা; আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা; লাভজনক কৃষির লক্ষ্যে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা, যান্ত্রিকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ বৃদ্ধি; দৃশ্যমান অবকাঠামোর সুবিধা নিয়ে এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে শিল্পের প্রসার ঘটানো; ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা; নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা সুলভ করা; সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় সকলকে যুক্ত করা; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা; সাম্প্রদায়িকতা এবং সকল ধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ রোধ করা; এবং সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুরক্ষা ও চর্চার প্রসার ঘটানো।

প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এটি জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এ হার গত বাজেটে ছিল ৫ দশমিক ২ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস হতে ও ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস হতে নির্বাহ করার জন্য প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী।

এমপিদের গাড়ি আমদানিতে শুল্ক-ভ্যাট সুবিধা বাতিল

অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান বলেন, বর্তমানে সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ি আমদানি করতে পারেন। বৈষম্য হ্রাসে প্রস্তাবিত বাজেটে এই সুবিধা বাতিল করে শুল্ক ও ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। সংসদ সদস্যদের গাড়ি আমদানিতে সব প্রকার শুল্ক কর অব্যাহতি বিদ্যমান রয়েছে। কর অব্যাহতি সুবিধা কিছুটা হ্রাস করে কেবলমাত্র আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ এবং মূসক (মূল্য সংযোজন কর) ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করে অন্যান্য সব শুল্ক-করাদির অব্যাহতি সুবিধা বহাল রাখার প্রস্তাব করছি। এজন্য বিদ্যমান প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করার সুপারিশ করেন।

১৩ বছরে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বেড়েছে দ্বিগুণ

প্রস্তাবিত বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, প্রবাসী কর্মীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২১.৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। প্রবাসী কর্মীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ছিল ১০.৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দ্বিগুণ হয়ে ২১.৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বিদেশ ফেরত কর্মীদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের অনুকূলে সরকার ৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দেশে নারীবান্ধব কর্মক্ষেত্র সৃষ্টির প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী জানান, কর্মক্ষেত্রে আহত হওয়ার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার জন্য নারীদের জন্য ‘এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি ইনস্যুরেন্স’ স্কিম পাইলট ভিত্তিতে চালু করা হয়েছে। মাহমুদ আলী বলেন, শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাতে ১ হাজার ৫৫০টি কারখানার কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

জিডিপি অনুপাতে এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ছোট বাজেট

আগামী অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে, যা জিডিপির ১৪ দশমিক ২০ শতাংশ। জিডিপির অনুপাতে এটি গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ছোট বাজেট। এছাড়া অন্য বছরগুলোর মতো পাল্লা দিয়ে এবার বাজেটের আকার বাড়ছে না। আগে এক বছর থেকে অন্য বছর বাজেটের আকার বাড়ানো হচ্ছিল ১০ শতাংশের বেশি হারে। তবে এবার বাড়ানো হয়েছে ৫ শতাংশের কম।

চাপের বাজেটে ব্যয় বাড়ল ১২শতাংশ

বৈশ্বিক বাস্তবতা আর নানামুখী চাপের মধ্যে দাঁড়িয়েও টেকসই উন্নয়ন এবং স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে যাত্রার চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট জাতীয় সংসদের সামনে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। প্রস্তাবিত এই ব্যয় বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের (৭ লাখ ১৪ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা) চেয়ে ১১.৫৬ শতাংশ বেশি। টাকার ওই অংক বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১৪.২৪ শতাংশের সমান।

অর্থমন্ত্রী মাহমুদ আলী তার বাজেটে অর্থনীতিকে পথে ফেরানোর ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছেন। বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, স্মার্ট বাংলাদেশ: উন্নয়ন দৃশ্যমান, বাড়বে এবার কর্মসংস্থান- এ দর্শনকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালে পঞ্চমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে। আমাদের সরকারের বিগত মেয়াদসমূহে ডিজিটাল বাংলাদেশের যে শক্ত ভিত রচিত হয়েছে- তার উপর নির্ভর করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্মার্ট, সমৃদ্ধ একটি দেশ গড়া এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে ১১টি বিষয়ে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বাজেট প্রণয়নের সময় আমরা এ বিষয়গুলো বিশেষ বিবেচনায় নিয়েছি।

২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের বাজেটগুলোতে উন্নয়ন খাত বরাবরই বেশি গুরুত্ব পেয়ে আসছিল। আগের অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বাজেটের আকার বাড়িয়ে পরিকল্পনা সাজানোর পুরনো ধারায় যতি দেননি গত অর্থবছর পর্যন্ত। কিন্তু মাহমুদ আলীকে কিছুটা সংযত হতে হচ্ছে। বাজেটে এবার উন্নয়ন ব্যয় ৮.২৫ শতাংশ বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮১ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা, যা ইতোমধ্যে অনুমোদন করা হয়েছে।

এবার পরিচালন ব্যয় (ঋণ, অগ্রিম ও দেনা পরিশোধ, খাদ্য হিসাব ও কাঠামোগত সমন্বয় বাদে) ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত অনুন্নয়ন বাজেটের চেয়ে প্রায় ১১.৮৬ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা যাবে সরকারের দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে, যা মোট অনুন্নয়ন ব্যয়ের ২২.৩৯ শতাংশ। অনুন্নয়ন ব্যয়ের আরও প্রায় ১৬ শতাংশ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় হয়ে, যার পরিমাণ অন্তত ৮১ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।

মহামারীর ধাক্কা সামলে ২০২১ সালে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হতে শুরু করলে বেড়ে যায় আমদানি। তাতে সরকারের জমানো ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়। রপ্তানি বাড়লেও আমদানির মতো অতটা না বাড়ায় এবং রেমিটেন্সের গতি ধীর হয়ে আসায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে। মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় ডলার বাঁচাতে সরকার বিলাস পণ্য আমদানিতে লাগাম দেওয়ার পাশাপাশি কৃচ্ছ্রের পথে হাঁটতে শুরু করে। তাতেও কাজ না হওয়ায় ডলারের যোগান বাড়াতে সরকারকে আইএমএফ এর কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। সেই ঋণের শর্ত হিসেবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর চাপ রয়েছে সরকারের ওপর।

রাজস্ব আহরণে এনবিআর বিদায়ী অর্থবছরের লক্ষ্যের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, নতুন অর্থবছরের সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রায় ৬৮ শতাংশ তিনি রাজস্ব খাত থেকে পাবেন। তার প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। এই অংক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের ১৩.১৮ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসেবে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা আদায় করা যাবে বলে আশা করছেন মাহমুদ আলী। ফলে এনবিআরের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ১৭ শতাংশের বেশি। টাকার ওই অংক মোট বাজেটের ৬০ শতাংশের মতো।

গতবারের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে, ১ লাখ ৮২ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা। এই অংক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৫.৬৩ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা ছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। সংশোধনে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৬ কোটি টাকা করা হয়।

আয়কর ও মুনাফার উপর কর থেকে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬২০ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। বিদায়ী সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা। নতুন বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ৪৯ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৬৪ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক থেকে ৭০ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৫ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে ১ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এছাড়া বিদেশি অনুদান থেকে ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে বাজেট প্রস্তাবে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন। বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৫ লাখ কোটি টাকা, সংশোধনে তা সামান্য কমিয়ে ৪ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়, যদিও মার্চ পর্যন্ত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৭০ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত অপেক্ষাকৃত কম। এ অনুপাত ৮ শতাংশের নিচে রয়েছে। মধ্যমেয়াদে সরকারের ব্যয় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ পূরণ করার জন্য কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করা জরুরি। ২০২২-২৩ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। সংশোধনে তা ৭ লাখ ১৪ হাজার ৪১৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। নতুন অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী যে বাজেট প্রস্তাব সংসদের সামনে তুলে ধরেছেন, তাতে আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৪.৬ শতাংশের সমান।

সাধারণত ঘাটতির পরিমাণ ৫ শতাংশের মধ্যে রেখে বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা হয়। তবে টাকা যোগানোর চাপ থাকায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরের পর থেকে প্রতিবারই ঘাটতি ৪ দশমিক ৯ শতাংশের বেশি ছিল। বিদায়ী অর্থবছরও এর পরিমাণ ছিল ৫.২ শতাংশ। এবার সেই ধারায় যতি টানলেন মাহমুদ আলী। বরাবরের মতোই বাজেট ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রীকে নির্ভর করতে হবে অভ্যন্তরীণ এবং বিদেশি ঋণের ওপর। তিনি আশা করছেন, বিদেশ থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ঋণ করে ওই ঘাটতি তিনি মেটাবেন। অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে রেকর্ড ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে আরও ৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে বাজেটে। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ৭.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। ৬ মাসের প্রাক্কলনের ভিত্তিতে অর্থবছর শেষে তা ৫.৮ শতাংশ হবে বলে সরকার ধারণা করছে। আর মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.৮৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, তার নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারলে মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশের মধ্যে আটকে রেখেই ৬.৭৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads