জাতীয়

বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা

চার হাজার কোটি টাকাই জলে

  • প্রকাশিত ১৪ জুলাই, ২০২৪

এম এ বাবর:

‘পানির নিচে রাস্তা ভালো’ বেশ কয়েক বছর আগে রাজধানীর কয়েকটি সড়কে বৃষ্টির সময় এমন কিছু সাইনবোর্ড লাগিয়ে ছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ। বিশেষ করে ২০১৭ সালে এয়ারপোর্ট রোড ও র‌্যাডিসন হোটেলসংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় ডুবে থাকা সড়কে গাড়ি চলাচলের সুবিধার জন্য চালকদের উদ্দেশে এমন সাইনবোর্ড টানানো হয়েছিল। এরপর অর্ধযুগ অতিবাহিত হলেও বৃষ্টির মৌসুমে রাজধানী জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয় না। সর্বশেষ শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৬ ঘণ্টায় বৃষ্টিতে ডুবে যায় ঢাকা মহানগরীর অনেক এলাকা ও বেশি কিছু প্রধান সড়ক।

প্রকল্পের পর প্রকল্প হয়। শত-শত কোট টাকা ব্যায় হয়। কিন্তু প্রায় দুই কোটি মানুষের এ ঢাকা শহরে নিত্যদিনের যানজট ও বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা সমস্যার নিরসন হচ্ছে না। ঢাকাবাসীর জন্য এ যেন ডাঙ্গায় বাঘ, জলে কুমির। বর্ষা মৌসুমে রাজধানীর জলাবদ্ধতা অনেক পুরোনো। ইতিপূর্বে জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশন গত দুই যুগে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। প্রতিটি প্রকল্পের শুরুতেই বলা হয়, ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আর জলাবদ্ধতা থাকবে না। কিন্তু বাস্তবে তার উল্লেখযোগ্য সুফল মেলে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাবদ্ধতার সমস্যাগুলো সঠিক ভাবে চিহ্নিত না করা এবং সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা, সঠিক পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সর্বোপরি দুর্নীতির কারণে এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তাই প্রকল্প গ্রহণের আগেই জলাদ্ধতার কারণগুলো সঠিক ভাবে চিহ্নিত সে মোতাবেক কাজ করার পরমর্শ তাদের।

গত ২৯ এপ্রিল সাউথ এশিয়ান ক্লাইমেট আউটলুক ফোরামের ২৮তম অধিবেশনে দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়াবিদরা বলেছিলেন এবারের বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাত বেশি হবে। এতে দেশবাসী তীব্র গরমের হাত থেকে রক্ষা পাবে। মিলবে বেশ খানিকটা স্বস্তি। তবে রাজধানীবাসীদের জন্য অপেক্ষা করছে জলাবদ্ধতার সংকট। আবহাওয়াবিদরা পূর্বাভাসের সেই জলাবদ্ধতার পুরানো রূপ দেখা গেছে শুক্রবার।

রাজধানীতে গ্রীষ্মকালে সহ্য করতে হয় অসহ্য গরম, দগ্ধ হতে হয় তীব্র তাপে। আর অন্যদিকে বৃষ্টি হলে তীব্র গরম থেকে রক্ষা পেলেও বর্ষাকালে যানজটের শহর ঢাকায় জলাবদ্ধতার কারণে পড়তে হয় মহাবিপদে।

দীর্ঘ দিন ঢাকার খালগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করত ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। জলাবদ্ধতা নিরসনের অংশ হিসেবে ২০২০ সালে ঢাকা ওয়াসা ২৬টি খাল ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে। তবে সিটি কর্পোরেশন খালগুলো বুঝে নিলেও সেগুলোর এখনও বেহাল দশা। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ঢাকার খালগুলো শুধু হাতবদল হয়েছে। প্রকৃত অর্থে কোনো কাজই হয়নি। মালিকানা পাওয়ার পর প্রথম কাজ ছিল সীমানা নির্ধারণ করা। ডিএসসিসি কিংবা ডিএনসিসি পরিপূর্ণভাবে একটি খালের সীমানা নির্ধারণ করতে পারেনি। দুই সিটি করপোরেশন এখনো এমন একটি আদর্শ খাল তৈরি করতে পারেনি, যেখানে দখল-দূষণের কোনো অস্তিত্ব নেই। বিপরীতে খাল পরিষ্কার ও বিশেষ অভিযানের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়েছে।

দায়িত্ব নেয়ার পর গত চার বছরে ঢাকার দুই সিটি কার্পোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে কমপক্ষে ৭৩০ কোটি টাকা খরচ করেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানায়, সংস্থাটি গত চার বছরে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে খরচ করেছে প্রায় ৩৬০ কোটি টাকা। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রকৌশল বিভাগ জানায়, জলাবদ্ধতা নিরসনে চার বছরে খরচ করা হয়েছে প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা। কিন্তু বিপুল পরিমান টাকা ব্যয় করা হলেও তার সুফল পাচ্ছেনা নগরবাসী।

এর আগে ‘রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প’ নামে ২০০১ সালে ১৪৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নিয়েছিল ঢাকা ওয়াসা। পরে দফায় দফায় ব্যয় বৃদ্ধির ফলে এ প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ২০৩ কোটি টাকায়। ২০১১ সালে প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়। কিন্তু কাজ শেষে বর্ষা মৌসুমে ভারি বর্ষণের সময় জলাবদ্ধতা নিরসনের পরিবর্তে নগরীর জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। পরবর্তীতে পরিকল্পনা কমিশনের ‘বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ’ (আইএমইডি) এ প্রকল্প সম্পর্কে মূল্যায়ন রিপোর্টে তীব্র সমালোচনা করে জানায়, প্রকল্পের আওতায় যেসব কাজ করার কথা ছিল, সে রকম অনেক কাজের কোনো নমুনাই খুঁজে পাওয়া যায়নি। এরপরও প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কাজের জন্য আরও ২৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প-২ বাস্তবায়ন করা হয়। ২০১৩ সালে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। কিন্তু তারপরও রাজধানীর জলাবদ্ধতা দূর হয়নি। ফলে প্রশ্ন ওঠে ওই প্রকল্পের অর্থ ব্যয় নিয়ে।

কেবল এ দুটি প্রকল্পই নয়, ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে আরও চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে ঢাকা ওয়াসা। এ ছাড়া পাইপড্রেন ও বপ-কালভার্ট পরিষ্কারের নামেও প্রতিবছর খরচ করা হয়েছে গড়ে ২০ কোটি টাকা। এ হিসাবে ওই ১০ বছরের ব্যবধানে ঢাকা ওয়াসা রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যয় করেছে অন্তত দুই হাজার ২৩ কোটি টাকা। এক সঙ্গে ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন প্রতিবছর রাস্তা, ফুটপাত ও ড্রেন উন্নয়ন খাতে বরাদ্দের প্রায় ১০ শতাংশ অর্থ খরচ করেছে। সে হিসাবে সিটি করপোরেশন এ খাতে ২০০১-২০২০ মোট ব্যয় করেছে ৫৭৩ কোটি টাকা। তারপরও বর্ষা ঋতু আসার আগেই এক দফা ভারি বর্ষণে রাজধানীতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। নগরীর অনেক স্থানেই নদী-সাগরের চেহারা দেখতে পেয়েছেন নগরবাসী।

ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ বিভাগের তত্ত্বাবধানে গত ২০১৭-২০১৮, ২০১৮-২০১৯ এবং ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ড্রেনেজ, খাল ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে গড়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকা করে তিন অর্থবছরে ৩০০ কোটি টাকা খরচ করেছে।

নগর বিশেষজ্ঞ ইকবাল হাবিব বলেন, ১০০ বছরেরও বেশি আগে ব্রিটিশ নগর পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গেডিস ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে শহরের ভেতরের এবং আশপাশের নদী, খালসহ প্রাকৃতিক জলাধারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব প্রদানের কথা বলেছিলেন। দীর্ঘ সময় পর এখনো অনেক নগর পরিকল্পনাবিদ একই কথা বলছেন। বাস্তবতা হলো, অবৈধ দখলের কারণে রাজধানীর ভেতরের অধিকাংশ খালের অস্তিত্বই এখন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। যে কয়টির অস্তিত্ব এখনো বিদ্যমান, সেগুলো অবৈধ দখলের কারণে পরিণত হয়েছে সরু নালায়। জানা গেছে, সীমানা নির্ধারণজনিত জটিলতার কারণে রাজধানীর খালগুলোর উদ্ধার প্রক্রিয়া আটকে আছে। এ কাজে কাক্সিক্ষত গতি না এলে যত পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করা হোক না কেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে সেসব কতটা ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ও নগর পরিকল্পনাবিদড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, জলাবদ্ধতার ভোগান্তি কমাতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব সুস্পষ্ট, শুক্রবারের জলাবদ্ধতার ঘটনা তা আবারও প্রমাণ করল। দুই সিটি যা করছে, তা সাময়িক ব্যবস্থা। ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে করা মহাপরিকল্পনাকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধু টাকা খরচ করছে তারা। দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ ছাড়া ঢাকার জলাবদ্ধতার সমাধান হবে না।

মোটাদাগে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার কারণগুলো হলো- নগররায়নের ফলে ঢাকায় অনাবৃত মাটি খুব কম। অধিকাংশ জায়গা কংক্রিটের রাস্তা ফলে মাটি পানি শোষণ করতে পারছে না। এছাড়াও ঢাকার বহুসংখ্যক খাল হয় বেদখল হয়েছে অথবা ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে পানি ধারণের অনুপোযোগী হয়ে উঠেছে। ৫২/৫৭ টি খালের মধ্যে এখন ২৬ টি খাল অবশিষ্ট রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমান বলেন, একটি নগরী জলাবদ্ধ হওয়ার সব কারণই এখানে বিদ্যমান। বৃষ্টির পানি ও ময়লা পানি ড্রেনেজ লাইনগুলোর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে খালগুলোয় গিয়ে পড়ার কথা। খালগুলোর মাধ্যমে সেই পানি নদীতে নিষ্কাশন হওয়ার কথা। চারদিকে পাঁচটি নদী দিয়ে ঘেরা ঢাকা শহরের ভেতর দিয়ে একসময় ৫০টির অধিক খাল, বেশ কয়েকটি লেক, পুকুর ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য কিছু নিচু এলাকা ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে খালের জায়গা দখল করে বাড়ি, মার্কেট, রাস্তাসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করায় বেশ কয়েকটি খাল অস্তিত্ব হারিয়েছে, বাকিগুলো সরু নালায় পরিণত হয়েছে। তার ওপর নগরবাসীর ফেলা ময়লা, আবর্জনা, পলিথিন, রাস্তার ওপর নির্মাণ সামগ্রী রাখা ইত্যাদি কারণে নগরের ড্রেন ও খালগুলো আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে। ফলে বাস্তবতা হচ্ছে, ডিজাইন রেইনের প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ বৃষ্টি হলেও ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ও রাস্তায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।

ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত সমস্যাগুলোর একটি জলাবদ্ধতা। বিশেষ করে পরিকল্পিত সড়ক তৈরি না হওয়ায় পানি সরতে পারছে না। তবে আমি দায়িত্বভার গ্রহণের পর হতে জলাবদ্ধতা নিরসনে সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কার, খাল-নালা-নর্দমা হতে বর্জ্য অপসারণসহ ব্যাপক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছি। অনেক জায়গায় এখনো কাজ চলমান রয়েছে এবং নতুন করে অনেক জায়গায় কাজ হবে। কাজগুলো বাস্তবায়ন হলে জলাবদ্ধতা থাকবে না বলে আশা করা যায়।

ডিএনসিসি’র মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়নকাজের কারণে ড্রেনেজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে ড্রেন নির্মাণ করে তার পর রাস্তা নির্মাণ হবে। আগে কখনো পরিকল্পিতভাবে ড্রেন ও রাস্তা নির্মাণ হয়নি। নভেম্বরের মধ্যে নতুন ওয়ার্ডের রাস্তা ও ড্রেনেজের কাজ সম্পন্ন হবে। জলাবদ্ধতার সমস্যা স্থায়ী সমাধান হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads