আমদানি-রফতানি

চাল আমদানিতে রেকর্ড

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

বিশ্বের শীর্ষ চাল আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অবস্থান এখন সামনের সারিতে। সাম্প্রতিক সময়ে রেকর্ড পরিমাণ চাল আমদানি করা হয়েছে। তারপরও বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আসন্ন বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে আরো ১৮ লাখ টন ধান ও চাল কেনার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বরে (ছয় মাস) যে পরিমাণ চাল আমদানি হয়েছে, এর আগে কখনও এত চাল আমদানি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চাল আমদানিতে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর এ ছয় মাসে চাল আমদানির এলসি খোলার হার বেড়েছে ৬০৯ শতাংশ। আর এলসি নিষ্পত্তির হার বেড়েছে ১৮ হাজার ৬৬২ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর চাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হযয়েছিল ৪ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের। ২০২১ সালের একই সময়ে এলসি খোলা হয় ৩২ কোটি ১২ লাখ ডলারের। একইভাবে আগের বছরের ছয় মাসে চাল আমদানির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল মাত্র ২৪ লাখ ডলারের। ২০২১ সালের একই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৬ কোটি ১৭ লাখ ডলারের।

চাল উৎপাদনে বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন স্বয়ংসম্পূর্ণ দাবি করে আসছে সরকার। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশ এখন বড় আমদানিকারক। ইউএসডিএর তথ্যানুযায়ী চাল আমদানিতে এখন বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়। এক নম্বরে আছে চীন। এরপর আছে ফিলিপাইন, নাইজেরিয়া ও সৌদি আরব।

তবে চাল আমদানি বাড়লেও বাজারে কোনো প্রভাব নেই দামে। সরকারি তথ্যই বলছে, দেশে মোটা চালের কেজিই এখন ৫০ টাকা। সরু চাল কিনতে গুনতে হচ্ছে ৬৮ টাকার মতো। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির তথ্য বলছে, গত এক বছরে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে।

এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, কিছুদিন কৃষি মন্ত্রণালয় বলেছে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। অথচ চাল আমদানিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বা তৃতীয়। তিনি মনে করেন, বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া দরকার। তিনি উল্লেখ করেন, রেমিট্যান্স আগের চেয়ে কমে গেছে। যে কোনো সময়ের চেয়ে সার্বিক আমদানি বেশি হচ্ছে। এতে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে।

অবশ্য চালের মূল্যবৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরতে গত বছরের শেষের দিকে বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। একইসঙ্গে সরকারি উদ্যোগেও চাল আমদানি অব্যাহত রাখা হয়। কিন্তু প্রথম দিকে ব্যবসায়ীরা চাল আমদানিতে খুব একটা আগ্রহ দেখাননি। ২০২১ সালের শুরু থেকেই চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারি গুদামে মজুত এবং বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় খাদ্য মন্ত্রণালয়। জানা গেছে, সরকারি গুদামগুলোতে চালের মজুত বেড়ে ১৭ লাখ টন ছড়িয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০ ফেব্রুয়ারি  পর্যন্ত খাদ্যশস্যের মজুত ১৯.৮৬ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চালের মজুত ১৭.২১ লাখ মে টন। গমের মজুত ২.৩৫ লাখ মেট্রিক টন। ধান মজুত রয়েছে ০.৪৬ লাখ মেট্রিক টন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী গত ছয় মাসে চাল আমদানি ছাড়াও খাদ্যপণ্যের মধ্যে গম আমদানির এলসি খোলা হয়েছে ১০৯ কোটি ২৫ লাখ ডলারের। চিনির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৪৫ কোটি ৭২ লাখ ডলারের। যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি। পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৯ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। ড্রাগ অ্যান্ড মেডিসিন আমদানি হয়েছে ৫৬ কোটি ৩৩ লাখ ডলারের।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে জানা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে এলসি খুলতে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়েছে তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল ও অন্যান্য পণ্য আমদানিতে। এর মধ্যে ইয়ার্ন (কটন, সিনথেটিক, মিক্সট ) আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ১০৮ কোটি ডলারের এবং টেক্সটাইল ফেব্রিক্স ও গার্মেন্টসের বিভিন্ন এক্সেসরিজ আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৪২৩ কোটি ডলারের। এছাড়া অন্যান্য পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৮৫১ কোটি ডলারের।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রেকর্ড পরিমাণ এলসি খোলার প্রবণতা দেশের অর্থনীতিতে শক্তিশালী ও স্থিতিশীল পুনরুদ্ধার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে (জুলাই- জুন) চাল আমদানির জন্য ৮৭ কোটি ৬২ লাখ ডলারের এলসি (ঋণপত্র) খোলা হয়েছে। আগের অর্থবছরে (২০১৯-২০২০) জুলাই-জুন সময়ে মাত্র ২ লাখ ৫৩ হাজার ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল।

আসন্ন বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ১৮ লাখ টন ধান ও চাল কিনবে সরকার। প্রতি কেজি বোরো ধানের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭ টাকা, সিদ্ধ চাল ৪০ টাকা ও আতপ চাল ৩৯ টাকা। এরই মধ্যে ৬ লাখ ৫০ হাজার টন ধান, ১১ লাখ টন সিদ্ধ চাল ও ৫০ হাজার টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের সভাপতিত্বে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির ভার্চুয়াল সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। পরে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। আগামী ২৮ এপ্রিল থেকে ধান-চাল কেনা শুরু হবে, চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। গত বছরও ধান ও চালের সংগ্রহ মূল্য একই ছিল।

সভায় খাদ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের বাজারে মোটা চালের দাম বাড়েনি। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দাম কমতির দিকে। মোটা চালের অধিকাংশ নন হিউম্যান কনজামশনে চলে যাওয়ায় ও মানুষের খাদ্যাভাস পরিবর্তনের কারণে সরু চালের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এ কারণে সরু চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। এসময় তিনি সরু ধানের উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে কৃষিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে এরই মধ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করা হয়েছে। নতুন উদ্ভাবিত দুটি জাত ব্রি-৮৯ ও ব্রি-৯২ বোরো ধানের উৎপাদন সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এ প্রজাতির উৎপাদন বেশি হবে ও চালও সরু হবে। এছাড়াও খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে উচ্চফলনশীল ধানের চাষ বাড়ানো হচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা ও মূল্য নির্ধারণ যৌক্তিক হয়েছে। এতে কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে।

সভায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার, খাদ্য সচিব মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) মো. সামসুল আরেফিন মতামত তুলে ধরেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads