মো. বাবলুর রহমান, চৌগাছা
যশোরের চৌগাছা উপজেলার হাজরাখানা গ্রামে প্রতি বছর ভাদ্র মাসে বসে পীর বলুহ দেওয়ানের মেলা। মেলা উপলক্ষে চৌগাছা ও যশোরের একটি অংশে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
পীর খানজাহান আলী, গরিব শাহ, বাহরাম শাহ, বুড়ো খাঁ, ফতে খাঁ, পীর খাঁ, মীর খাঁ, চাঁদ খাঁ, এখতিয়ার খাঁ, বখতিয়ার খাঁ, মোখতার খাঁ, আলম খাঁসহ বহু পীর, দরবেশ ও আউলিয়া বুজুর্গ ব্যক্তিদের পদধূলিতে গৌরবান্বিত হয়েছে যশোর। তারা ধর্ম প্রচারের জন্য এই জনপদে আসেন। মহান ইসলামের সাম্যবাদ, বঞ্চনা-বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা, আদর্শ ও সৌভ্রাতিত্বে উদ্বুদ্ধু হয়ে মানুষ দলে দলে ইসলামের পতাকাতলে আশ্রয় নেয়। এসব বুজুর্গ ব্যক্তির মধ্যে পীর বলুহ দেওয়ান অন্যতম।
মহান এই ধর্ম প্রচারকের স্মৃতির স্মারক হিসেবে তার মাজারটি সুরক্ষিত অবস্থায় আছে যশোরের চৌগাছা উপজেলার হাজরাখানা গ্রামে কপোতাক্ষ নদের পশ্চিম তীরে। সারা বছর ধরে ভক্ত-অনুরক্তরা তার মাজার জিয়ারত করতে আসেন। শুধু এলাকাবাসীর কাছে নয়, বাংলাদেশ ও ভারতের ব্যাপক মানুষের কাছে এই মেলা ‘বলুহ দেওয়ানের মেলা’ নামে পরিচিত।
পীর বলুহ দেওয়ান (র.) সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য কারো জানা নেই। যতটুকু জানা যায়, তার সবই অনুমাননির্ভর। তবে বলুহ দেওয়ান বলে যে একজন বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর অনুমাননির্ভর যেসব কথা চালু আছে, তাও অমূলক নয় বলে যুক্তির নিরিখে বলা যায়। যেমন হাজরাখানা গ্রামের নামটি এসেছে ‘হুজরাখানা’ শব্দ থেকে।
হুজরা অর্থ কুঠুরি এবং খানা অর্থ ঘর বা স্থান। বর্তমানে যে জায়গায় তার মাজার, সেখানে তিনি হুজরাখানিটি নির্মাণ করেছিলেন।
বয়ঃপ্রাপ্ত হলে পীর বলুহ দেওয়ান ইসলামী জ্ঞান আহরণে বেরিয়ে পড়েন এবং খ্যাতনামা আলেম-ওলামাদের সান্নিধ্যে আধ্যাত্মিক সাধনার শিক্ষালাভ করেন। পরিপূর্ণ জ্ঞানলাভের পর তিনি মহান আল্লাহর একাত্মবাদ প্রচার শুরু করেন। তার নির্মিত হুজরাখানাটি ছিল তার ইসলাম প্রচারকার্যের কেন্দ্রবিন্দু।
বলুহ দেওয়ানের স্মৃতির উদ্দেশ্যে সুদূর অতীতকাল থেকে হাজরাখানায় প্রতিবছর ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার মেলা বসে আসছে। আগেকার দিনে মেলার সঙ্গে আয়োজন করা হতো ধর্মসভার। এ সভায় ফুরফুরা ও শর্ষিনাসহ বিভিন্ন স্থানের খ্যাতনামা পীর সাহেবরা অংশ নিতেন। কিন্তু ওই ধর্মসভা এখন আর হয় না। তবে মেলার আগে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এসব কথা জানান গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিরা।
তারা জানান, শতাব্দীকালের ঐতিহ্যবাহী বলুহ দেওয়ানের মেলায় কোনো অশালীন কর্মকাণ্ডের প্রশ্রয় দেওয়া হয় না। একজন ধর্মপ্রাণ কামেল ব্যক্তির স্মৃতির উদ্দেশ্যে মেলাটির আয়োজন করা হয় বলে এ মেলায় ইসলামবিরোধী কোনো কিছুর আয়োজন করা হয় না। এখানকার তিন কিলোমিটার রাস্তার পাশে কাঠ-স্টিলের খাট-পালঙ্ক এবং আসবাবপত্র, খেলনা, ক্রোকারিজ, কসমেটিকস, মিষ্টি-মিঠাই, পোশাক, গহনা, ইলেকট্রনিকস দ্রব্যাদি, বইপত্র, বিভিন্ন শৌখিন জিনিসসহ প্রয়োজনীয় সবকিছুর স্টল বসে। আগেকার দিনে তিন থেকে পাঁচ দিনের জন্য মেলার আয়োজন করা হতো। কিন্তু মানুষের আগ্রহের কারণে এখন মেলার দিন বাড়ানো হয়। এখন চলে ১০ দিন।
মেলা পরিচালনার জন্য একটি কমিটি কাজ করে। এবার নারায়ণপুর ইউপি চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন মুকুলকে সভাপতি এবং ইউপি সদস্য মনিরুজ্জামান মিলনকে সাধারণ সম্পাদক করে ২১ সদস্যের মেলা পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। মেলা থেকে উপার্জিত অর্থ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বলুহ দেওয়ানের মাজার উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। বাকি টাকা গ্রামের রাস্তা, মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান, স্কুল, মাদরাসা প্রভৃতির উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। চৌগাছা উপজেলা শহর থেকে মহেশপুর সড়ক ধরে তিন কিলোমিটার গেলে ডান হাতে যে পিচের রাস্তা নেমে গেছে বিদ্যাধরপুর গ্রামের দিকে ওই রাস্তায় সামান্য এগোলে হাজরাখানা গ্রামের অবস্থান। বলুহ দেওয়ানের মৃত্যুর পর তার স্মৃতিরক্ষার জন্য ব্রিটিশ সরকার ৪৭ একর জমি বরাদ্দ করেন। কিন্তু ওই জমির মধ্যে মাত্র ২৪ শতক বাদে বাকিটা বেদখল হয়ে গেছে। বর্তমানে গোলাম রহমান নামে একজন ওই জমিটুকু দেখভাল করেন।
বলুহ দেওয়ানের আধ্যাত্মিক শক্তির বিষয়ে এলাকায় অনেক কিংবদন্তি চালু আছে, যা এলাকার মানুষ মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে। গ্রামের মানুষের কাছ থেকে শোনা যায়, বলুহ দেওয়ান সন্ধ্যায় একটি গাছ উল্টো করে পুঁতে রেখে আসতেন। সকালে দেখা যেত ওই গাছে ফল ধরেছে।
একবার গ্রামের এক লোকের গরুতে প্রতিবেশী আবেদ মুনশীর ধান খেয়েছিল। তিনি রাগে ক্ষোভে ওই গরুগুলো খোঁয়াড়ে দিতে যাচ্ছিলেন। বিষয়টি বলুহ দেওয়ানের নজরে আসে।
গরু মালিকের ক্ষতির কথা চিন্তা করে তিনি গরুগুলো খোঁয়াড়ে না দেওয়ার জন্য আবেদ মুনশীকে অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি অনুরোধ উপেক্ষা করে গরু খোঁয়াড়ে দি্ল্লেত গেলে বলুহ দেওয়ান গরুগুলোকে বক বানিয়ে উঁচু গাছে বসিয়ে দেন। ঘটনার কথা শুনে গরুর মালিক সর্বনাশ ভেবে ছুটে এসে হাউমাউ করে তার সামনে আছাড় খেয়ে পড়েন। বলুহ দেওয়ান তখন কালো গাভি, সাদা গাভি বলে ডাক দিলে বকগুলো আবার গরুতে পরিণত হয়ে মালিকের কাছে ফিরে আসে।





