রাজধানীতে একের পর এক ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে ছিনতাইকারীরা যেন ততই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বেশকিছু ছিনতাইকারী ও বিপুলসংখ্যক অজ্ঞান পার্টির সদস্যকে আটকের পরও থামানো যাচ্ছে না ছিনতাই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও যেন পেরে উঠছে না। একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। ছিনতাই বৃদ্ধির জন্য বেকারত্বকে দায়ী বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। গভীর রাতে ও ভোরে অলিগলিতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের উপস্থিতি বৃদ্ধি ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
একটি ছিনতাইয়ের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ঢাকার একজন সিনিয়র সাংবাদিক নুরুজ্জামান লাবু তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন— ‘চোখের সামনে ছিনতাই... রিকশা আরোহী মহিলার ভ্যানিটি ব্যাগ ছোঁ মেরে নিয়ে গেল চলন্ত প্রাইভেটকার থেকে। সৌভাগ্যক্রমে রিকশা থেকে পড়ে যাননি তিনি। চিৎকার করলেন সজোরে। তাকিয়ে দেখি ব্যাগটি সেই প্রাইভেটকারের জানালায় ঝুলে আছে। ব্যাগ তুলে নিয়ে দ্রুতগতিতে চলে গেল ছিনতাইকারীরা।’ গত ২২ এপ্রিল ভোরে এই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায়। লাবু ও তার সাথীরা ওই প্রাইভেটকারের পিছু নেয়। পরে তারা একটি প্রাইভেটকার আটকে পুলিশকেও খবর দেয়। কিন্তু পুলিশ কোনো পাত্তা দেয়নি। পুলিশ খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেনি কোন গাড়ি দিয়ে কারা এই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটালো।
২৩ এপ্রিল অপর এক সাংবাদিক রুবিনা ইয়াসমিন তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘গতকাল রিকশা করে বাসায় যাচ্ছিলাম। শংকর থেকে ছিনতাইকারী ব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে যায়। এরপর আমার মোবাইল নিয়ে ব্যাগটি ফেলে দেয় ২৭ নম্বর মোড়ে।’
সম্প্রতি মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। ছিনতাইকারীদের বেপরোয়া থাবায় মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ, নগদ টাকা হারিয়েছেন এসএ টিভির সিনিয়র প্রতিবেদক এসকে সৌরভ, মোবাইল হারিয়েছেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের সিনিয়র প্রতিবেদক শাখাওয়াত কাওসার। এর আগে গত ১৭ মার্চ সাংবাদিক কামাল হোসেন তালুকদার গুলিস্তান থেকে আজিমপুর বাসায় যাওয়ার পথে ছিনতাইয়ের কবলে পড়েন। ছিনতাইকারীরা তার সঙ্গে থাকা ব্যাগ ও মোবাইল ফোন নিতে সজোরে ধাক্কা দিয়ে রিকশা থেকে ফেলে দেন। এতে সাংবাদিক কামাল মারাত্মক আহত হন।
শুধু ছিনতাই নয়, বেড়েছে মলম, টানা ও অজ্ঞান পার্টিও তৎপরতাও। সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় ময়মনসিংহগামী চলন্ত একটি বাস থেকে ছোঁ মেরে এক ব্যক্তির মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। রাজধানীর ফুলবাড়িয়া সিটি প্লাজায় যাওয়ার পথে ভিক্টর পরিবহনের একটি বাসে ওঠে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েন এক ব্যবসায়ী। গত রোববার রাতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে অচেতন অবস্থায় ভাগিনা এনামুল ইসলাম শুভ এবং পথচারী ইঞ্জিনিয়ার সাইমুর রহমান অভি তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন। মামা সন্ধ্যা ৭টার দিকে এক পকেটে আড়াই লাখ টাকা, অন্য পকেটে আনুমানিক ৩০ হাজার টাকা নিয়ে ঢাকার ফুলবাড়িয়া সিটি প্লাজায় নিজের দোকানের জন্য জুতা কিনতে আসেন। বাসে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েন।
এদিকে হঠাৎ করে ছিনতাই বেড়ে গেলেও রাত ১০টার পর সড়কে কোনো পুলিশ থাকে না। টহল পুলিশের গাড়িও চোখে পড়ে না বলে অভিযোগ তাদের। ফলে অরক্ষিত সড়কে রিকশা আরোহীসহ চলাচলরত সাধারণ মানুষজন ছিনতাইকারীর কবলে পড়ছেন। এসব ছিনতাই ঘটনার বড় একটি অংশ থানা পুলিশের কাছে যাচ্ছেন না।
জানা যায়,রাজধানীতে রয়েছে শতাধিক ছিনতাই স্পট। প্রায় ৬০০ ছিনতাইকারী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো রাজধানী। এর মধ্যে ভয়ঙ্কর জোন হচ্ছে রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে টিকাটুলি মোড়, গোপীবাগের রাস্তা, মতিঝিল কালভার্ট রোড হয়ে আরামবাগ, মতিঝিল টিঅ্যান্ডটি কলোনির পাশের রাস্তা, পীরজঙ্গির মাজার, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের আশপাশের এলাকা, যাত্রাবাড়ী মোড়, জুরাইন রেলগেট থেকে পোস্তগোলা ব্রিজ, পুরানা পল্টন মোড়, কাকরাইল মোড় থেকে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল মোড়, রাজারবাগ পূর্বপাশের মোড় থেকে শাহজাহানপুর রেললাইন, ফার্মগেট ওভারব্রিজ এলাকা, মৎস্য ভবন থেকে শাহবাগ মোড়, দোয়েল চত্বর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রাস্তা, নিউমার্কেটের দক্ষিণ দিকের রাস্তা, আজিমপুর মোড়, ধানমন্ডি ২ নম্বর রাস্তা এবং নয়াবাজার থেকে গাবতলী বেড়িবাঁধের বেশ কয়েকটি পয়েন্টে নিয়মিত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বলে অনেক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন। তবে পুরো গুলিস্তানই এখন দুর্বৃত্তদের নিয়ন্ত্রণে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, ডিএমপির ৬টি বিভাগের তালিকা অনুযায়ী উত্তরা বিভাগে ৫২ জন, মিরপুর বিভাগে ৫৬ জন, গুলশান বিভাগে ৯৭ জন, রমনা বিভাগের ১১৬ জন, তেজগাঁও বিভাগের ১২২ জন ও ওয়ারী বিভাগে প্রায় দেড় শতাধিক ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ছিনতাইয়ের অনেক ঘটনাই থানা-পুলিশের কাছে যায় না। চুরি ও ছিনতাইয়ের শিকার বেশির ভাগ মানুষই হয়রানি ও ঝামেলার আশঙ্কায় মামলা করেন না। এতে করে চুরি ও ছিনতাইয়ের মামলা হয় কম। মামলা হলেও চুরি ও ছিনতাই করা টাকা উদ্ধার করতে পারে না পুলিশ। আবার কেউ কেউ মামলা করতে গেলেও থানা তা নেয় জিডি হিসেবে। এতে করে প্রকৃত ঘটনা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তিরা বলছেন, পুলিশ জানে কোন কোন এলাকা ছিনতাইপ্রবণ। এরপরও ব্যবস্থা নিতে তাদের অনীহা। ঘটনা জানালেও প্রভাবশালী না হলে প্রতিকার পাওয়া যায় না। নানান ভোগান্তি সইতে হয়। পুলিশ বলছে, ছিনতাইয়ের ঘটনা জানালে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, রাজধানীতে বিভিন্ন ছিনতাই স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্যাট্রোল ডিউটি বৃদ্ধি করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্পটে চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীদের ধরতে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়েছে।
হঠাৎ ছিনতাই বেড়ে যাওয়া এবং ছিনতাইয়ের ঘটনায় প্রাণহানির মতো ঘটনাগুলোর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সম্প্রতি সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। মানুষ কোনোরকম জীবনযাপন করছে বলে অনেক আলোচনা-সমালোচনাও হচ্ছে। ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার পেছনে এটিও কারণ হতে পারে। এক্ষেত্রে দেখতে হবে, যারা ছিনতাই করছে তারা পেশাদার নাকি নতুন কেউ। যদি ছিনতাই চক্রে নতুন নতুন সদস্যের উপস্থিতি বেশি পাওয়া যায়, তাহলে ধরেই নিতে হবে যে এর পেছনে চলমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতির যোগসূত্র রয়েছে। আর পুরনো ছিনতাই চক্রের সদস্যদের এসব অপরাধ সংঘটনে অংশগ্রহণ বেশি থাকলে সেক্ষেত্রে এসব ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
ড. জিয়া আরও বলেন, ছিনতাই বন্ধে টহল পুলিশ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে গভীর রাতে ও ভোরে সড়কে অলিগলিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের উপস্থিতি বাড়াতে হবে। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। ছিনতাই বন্ধ না হলে সমাজে ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সাধারণ মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়বে।





